জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে গণভোট সামনে রেখে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র ও ক্রিকেটে দাদাগিরির অভিযোগে ‘ভারত আউট’-এর ডাক দিয়েছে জুলাই ঐক্য। সম্মুখ সারির জুলাইযোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির খুনিদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে দিল্লির প্রভাব বিস্তার এবং বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে এ আহ্বান জানানো হয়।
গতকাল শনিবার বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘র্যালি ফর বাংলাদেশ’ সমাবেশ থেকে ‘ভারত আউট’-এর ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সমাবেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র-জনতা অংশ নেয়। তাদের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিক থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারাও ছিলেন। এছাড়া জুলাই ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। সমাবেশ শেষে শহীদ মিনার থেকে শহীদ ওসমান হাদি চত্বর (শাহবাগ) পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে জড়িত গণহত্যাকারী ও শহীদ ওসমান হাদির খুনিদের ভারত আশ্রয় দিচ্ছে। একই সঙ্গে গত চারটি সংসদ নির্বাচন এবং ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপ চলছে।
বক্তারা বলেন, গত ৫৪ বছর ধরে ভারত সরাসরি যুদ্ধ নয়; বরং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দুর্বল করার চেষ্টা করে আসছে। পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ, সীমান্তে নদীর বাঁধ খুলে বন্যা সৃষ্টি এবং পানিবণ্টনে চুক্তি না করার বিষয়গুলো তুলে ধরে তারা বলেন, ভারত কখনোই প্রকৃত বন্ধু হিসেবে আচরণ করেনি।
সমাবেশ থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ‘ইন্ডিয়া বয়কট’-এর ডাক দেওয়া হয় এবং দেশবাসীকে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তাদের অভিযোগ, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গভীর চক্রান্ত চলছে। নির্বাচনব্যবস্থাকে ‘সিলেকশন’ প্রক্রিয়া উল্লেখ করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনার আয়োজন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। সমাবেশ থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-কে সমর্থন দেওয়া এবং সৎ ও যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করার আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশে যোগ দিয়ে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে দমনপীড়ন চালানো হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার লোক দেখানো সহানুভূতি দেখালেও এখনো শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
তিনি বলেন, আমরা দেশীয় তদন্ত সংস্থার ওপর আস্থা রাখছি না। আন্তর্জাতিক তদন্ত ছাড়া এ ঘটনায় ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।
ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন বলেন, ভারতের প্রভাবে বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি আইসিসিকে ব্যঙ্গ করে ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শিলংয়ে বাংলাদেশ ফুটবল দলের অনুশীলনের সময় লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপের প্রমাণ। তিনি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। নির্বাচনি শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনসিসি ক্যাডেটদের না রাখার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনতা আর নতুন করে কোনো সাজানো বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদের সুযোগ দেবে না। তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুসংগঠিত চক্রান্ত দৃশ্যমান, যার উদ্দেশ্য জুলাইয়ের গণজাগরণকে দমন করা এবং জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেঙে দেওয়া। তবে ছাত্র-জনতা এখন আর বিভ্রান্ত নয়। তারা এ চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন এবং প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত।
আইসিসি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত তার প্রভাব ও আধিপত্য ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করেছে। ফলে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্টে খেলতে দেওয়া হয়নি। জনমনে একটি ধারণা ছড়ানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ নিজেই খেলতে অনিচ্ছুক ছিল। বাস্তবে বাংলাদেশকে খেলার সুযোগই দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশকে বারবার শুধুমাত্র ভারতেই খেলতে চাপ দেওয়া হয় এবং ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন বারবার অগ্রাহ্য করা হয়। এটি ক্রীড়াঙ্গনে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের স্পষ্ট উদাহরণ।
তিনি বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের এ লড়াই চলমান থাকবে। এ সংগ্রামের ‘সিপাহসালার’ ছিলেন শহীদ ওসমান হাদি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও ভারত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, যা আধিপত্যবাদী রাজনীতিরই একটি অংশ।
সাম্প্রতিক পুলিশি হামলার বর্ণনা দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য রিয়াদুল ইসলাম যুবা বলেন, গতকাল (শুক্রবার) জুলাইয়ের কায়দায় সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। আটকে রাখা পাঁচ সহযোদ্ধার খোঁজ নিতে গেলে যৌথবাহিনীর বাধার মুখে পড়েন তারা। এ সময় তাকে এবং অন্যদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, এ হামলায় জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে। সেসব হামলাকারীকে দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
তিনি জানান, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু বরখাস্ত নয়, হামলার নির্দেশদাতা ও জড়িত সবাইকে কঠোর রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় আনতে হবে।
জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের দাবি
সমাবেশে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দেশীয় তদন্ত সংস্থার ওপর তারা আস্থা হারিয়েছেন। এজন্য জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা বলেন, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ঘটনার তদন্ত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানেই করতে হবে। কেননা, দেশীয় তদন্ত প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক তদন্তই একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য পথ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ওপর আর কোনো দেশের হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। ১৮ কোটি মানুষের শক্তি এবং তরুণ সমাজের ঐক্যের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, প্রয়োজনে রাজপথেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
এ সময় ‘ভারত আউট’, ‘ইন্ডিয়া বয়কট’ এবং ‘শহীদ ওসমান হাদির বিচার চাই’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। সমাবেশ শেষে শহীদ মিনার থেকে ‘র্যালি ফর বাংলাদেশ’ মিছিল নিয়ে শাহবাগের শহীদ ওসমান হাদি চত্বরে গিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

