আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ও বাহিনী মোতায়েন কার্যক্রম সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিখুঁত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘টু মেক ইট পারফেক্ট‒ভোটটা যেন একেবারে নিখুঁত হয়, সেটাই এখন আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।
শনিবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নির্বাচন প্রস্তুতি সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠক শেষে যমুনার সামনে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ সময় তিনি বলেন, আগামী এক সপ্তাহ নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেস সচিব বলেন, বৈঠকে নির্বাচন প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাহিনী মোতায়েন এবং সামনের চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া কাজগুলোর একটি হালনাগাদ চিত্রও উপস্থাপন করা হয়।
তিনি বলেন, বৈঠকের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টা চলমান নির্বাচনি প্রচারণা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, সারা দেশে অত্যন্ত উদ্দীপনা, শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনি প্রচার চলছে। কেউ কারও বিরুদ্ধে কটু কথা বলছে না, কোনো অভদ্র আচরণও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখন পর্যন্ত প্রস্তুতি পর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং সরকার এতে সন্তুষ্ট। তবে সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে নিখুঁত করা। টু মেক ইট পারফেক্ট‒ভোটটা যেন একেবারে নিখুঁত হয়, সেটাই এখন আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, ভোট হবে উৎসবমুখর ও নিরাপদ। নারী ভোটাররা আনন্দের সঙ্গে ভোট দেবেন এবং পরিবারসহ সবাই অংশ নেবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার মতে, এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শফিকুল আলম বলেন, সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০ কেন্দ্রে পুলিশের জন্য বডি অন ক্যামেরা সরবরাহ করা হয়েছে। বৈঠকে এসব ক্যামেরার কার্যক্রমের একটি সরাসরি প্রদর্শনীও দেখানো হয়।
তিনি জানান, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা র্যান্ডমভাবে নির্বাচিত পাঁচটি এলাকার বডি অন ক্যামেরা বহনকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এর মধ্যে ছিল তেঁতুলিয়া, মাটিরাঙ্গা, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল। এসব স্থান আগে থেকে নির্ধারিত ছিল না।
এছাড়া ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ এখন পুরোপুরি চালু হয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, এই অ্যাপটি কেবল নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করবেন। কোনো ভোটকেন্দ্রে বা আশপাশে সহিংসতা বা গোলযোগ হলে অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বাহিনী, রিটার্নিং অফিসার এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে বার্তা পৌঁছে যাবে। এতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।
নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখের কাছাকাছি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার। ইতোমধ্যে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ১ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ জন সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন সদস্য ১ হাজার ২১০টি প্লাটুনে মোতায়েন করা হয়েছে। কোস্টগার্ড ১০টি জেলার ১৭টি আসনের ২০টি উপজেলায় ৬৯টি ইউনিয়নে দায়িত্ব পালন করছে। পুলিশের ১ লাখ ৫৭ হাজার সদস্য ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে মোতায়েন হবে। আনসারের ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৬ জন সদস্যের মোতায়েন শনিবার থেকেই শুরু হয়ে রোববারের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে জানান আনসার প্রধান। র্যাবের মোতায়েনও সময়মতো শুরু হবে এবং তারা ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২৯৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে সেখানে ভোট স্থগিত রয়েছে। মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ২ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৯টি।
প্রেস সচিব জানান, বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের জন্য পাঠানো ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি পোস্টাল ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার ৩৮টি ব্যালট গ্রহণ করা হয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন প্রায় ৪০০ জন এবং দেশি পর্যবেক্ষক প্রায় ৫০০ জন। বিদেশি সাংবাদিকের সংখ্যা আনুমানিক ১২০ জন।
তিনি জানান, আউট অব দ্য কান্ট্রি পোস্টাল ভোটের জন্য ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি ব্যালট ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৭ হাজার ৩৮টি ব্যালট গ্রহণ করেছেন। পোস্টাল ভোটারদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৬ শতাংশ নারী।
শফিকুল আলম জানান, নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগ, তথ্য বা সহায়তার জন্য ‘নির্বাচন বন্ধু ভোটার’ হটলাইন চালু করা হয়েছে। ৩৩৩ এই নম্বরে ফোন করে ভোটাররা অভিযোগ জানাতে বা প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, ৮০ শতাংশ সিসিটিভি ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে এবং বডি অন ক্যামেরা স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, নির্বাচনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি নেই।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক 'পাশা' নিয়ে ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আজাদ মজুমদার বলেন, বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সচিব এ বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে ‘পাশা’ নামে একটি এনজিও দাবি করেছে যে তারা ১০ হাজার নির্বাচনি পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেবে। বিষয়টি জানার পর নির্বাচন কমিশন তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। যাচাই-বাছাই করে তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপাতত তাদের পর্যবেক্ষক কার্ড বিতরণ স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই এনজিওটির কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

