তুরস্ক-মিসর প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় উদ্বিগ্ন ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র

মাহমুদ হাসান

তুরস্ক-মিসর প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় উদ্বিগ্ন ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র

ইরানে আগ্রাসন, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মিসর ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। যৌথ বিমান ও নৌমহড়া, সমরাস্ত্র উৎপাদনে যৌথ প্রকল্প গ্রহণ এবং নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে সমন্বয়ও জোরদার হচ্ছে। তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মিসর তার নতুন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর ‘দ্য অক্টাগন’-এর সক্ষমতাও বহুগুণে বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুরস্ক-মিসরের সম্পর্কের এই অগ্রগতি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি এমন এক কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা আঞ্চলিক জোটগুলোর পুনর্বিন্যাসের পথ প্রশস্ত করবে। পাশাপাশি, এটি দুদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব অথবা এতে অন্যান্য দেশ যুক্ত হলে আরো বৃহত্তর আঞ্চলিক জোট গড়ে ওঠার ইঙ্গিত, যা এ অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রাচ্যে দুই গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতা ও মিসরের যুদ্ধ বিমানসহ আধুনিক সমরাস্ত্রের বিশাল সংগ্রহ ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তুরস্ক ও মিসরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা এবং সামরিক যোগাযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াশিংটন ব্যাখ্যা চেয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

যৌথ বিমান মহড়া

জুন মাসে কায়রো ও আঙ্কারার মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি ছিল ৪ থেকে ১৭ জুনের মধ্যে মিসরের অনুষ্ঠিত যৌথ বিমান মহড়া। দ্বিতীয়টি ছিল মিসরের আলামেইন শহরে মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের চতুর্থ বৈঠক। এই বৈঠকে আঞ্চলিক নানা ইস্যু এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি চারপক্ষীয় কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। মিসরের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রের বিবৃতি অনুযায়ী, দেশটির কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে এই মহড়া পরিচালিত হয়।

১৩ বছরের বিরতির পর গত বছর মিসর ও তুরস্ক পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ‘সি অব ফ্রেন্ডশিপ’ বা ‘বন্ধুত্বের সাগর’ মহড়ার মাধ্যমে যৌথ নৌ-অনুশীলন আবার শুরু করে। এছাড়া দেশ দুটি ড্রোন ও চালকবিহীন স্থলযান যৌথভাবে তৈরি এবং দূরপাল্লার কামানের গোলা উৎপাদনের বিষয়েও চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল তুরস্কের ‘কান’ (Kaan) স্টিলথ ফাইটার কর্মসূচিতে মিসরের উন্নয়ন ও উৎপাদন সহযোগী হিসেবে যুক্ত হওয়া। বিমানটি ২০৩০ সালে বিমানবাহিনীতে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের ক্রমবর্ধমান পরিধি এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে।

এই প্রথম দুই দেশ উন্নত প্রযুক্তির ‘স্টেলথ’ যুদ্ধবিমান (যা রাডারে সহজে ধরা পড়ে না) তৈরিতে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি বিমানবাহিনীর দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সহায়তা করবে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তুরস্কের ‘আসেলসান’ (Aselsan) সম্প্রতি মিসরে ‘আসেলসান ইজিপ্ট’ নামে একটি আঞ্চলিক প্রতিনিধি কার্যালয় চালু করেছে। মিসরের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা জোরদার করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।

উল্লেখযোগ্য অর্জন

মিসর ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তুর্কি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত সমরাস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা। এর মাধ্যমে মিসরের অস্ত্র সংগ্রহের উৎস বহুমুখী করা, অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা উৎপাদন জোরদার করার পাশাপাশি মিসরে তুর্কি সামরিক প্রযুক্তির স্থানীয়করণ সম্ভব হবে।

দুই দেশের জন্যই এই উদ্যোগের সুফল অনেক, বিশেষ করে মিসরের জন্য। তুরস্কের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার ফলে মিসরে পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটি উপকৃত হতে পারে। আফ্রিকায় তুরস্কের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার মিসর। উভয় দেশই ২০২৮ সালের মধ্যে তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৯ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায় ।

তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে এ বিষয়টি অর্থনৈতিক বিবেচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। তুরস্কের লক্ষ্য মিসরের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এই অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্রকে বিশেষ করে, সৌদি আরবকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে উৎসাহিত করা। রাজনৈতিক গবেষক মোহাম্মদ আবেদের মতে, এমন উদ্যোগ প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা ও আর্থিক সম্পদের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে, যা এই প্রচেষ্টাকে আরো শক্তিশালী এবং টেকসই করবে।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত জটিল আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কায়রো ও আঙ্কারার মধ্যে সামরিক অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো এমন সব বহুমুখী ও পারস্পরিক নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে, যা নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে সহায়ক হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ জামালের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সুন্নিপ্রধান চার দেশ মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন বোঝাপড়াকে কৌশলগতভাবে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এমন একসময়ে এই গুরুত্ব বাড়ছে, যখন আঞ্চলিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সক্ষম ‘আরব-ইসলামিক জোট’ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

মোহাম্মদ জামাল বলেন, মিসর ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমনে এবং জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে। এটি লিবিয়ায় রাজনৈতিক ঐকমত্যের সম্ভাবনা বাড়াতে, প্রক্সি সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে এবং লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা জোরদার করতেও ভূমিকা রাখতে পারে। আরো বৃহত্তর পরিসরে বলতে গেলে, এর ফলে কায়রো ও আঙ্কারা এমন এক সুসংহত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করবে, যা তাদের বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে।

উদ্বেগ বাড়ছে ইসরাইলের

ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলোর মতে, মিসর ও তুরস্কের মধ্যে দ্রুত গড়ে ওঠা সামরিক সম্পর্ক ইসরাইলের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে, যখন একটি যৌথ আরব-ইসলামিক সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মিসর ও তুরস্কের বর্তমান সম্পর্ককে প্রথাগত অর্থে কোনো ‘সামরিক জোট’ না বলে বরং একটি ‘উদীয়মান প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। একটি আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের জন্য পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, সামরিক সমন্বয় ব্যবস্থা, যৌথ কার্যক্রম কেন্দ্র এবং উভয় পক্ষের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি। তবে সেই শর্তগুলো এখনো পূরণ হয়নি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও তুরস্ক-মিসরের ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে, যদি এটিকে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এ কারণে দুই দেশের সহযোগিতার গতি নানা বাধার মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করছে না, বরং একটি প্রকৃত সামরিক জোট গঠনের পথে কায়রো ও আঙ্কারার আন্তরিকতার ওপরও নির্ভর করছে। এই অংশীদারত্বের সাফল্য তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—মিসরের সঙ্গে তুরস্কের ‘শূন্য সমস্যা’ বা জিরো প্রবলেম নীতি, কায়রোর রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান পরিবর্তনের কৌশল এবং ইসরাইলের আঞ্চলিক প্রভাবের অব্যাহত বিস্তার।

মিসর ও তুরস্কের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদেশের গঠিত ‘উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সহযোগিতা কাউন্সিলের আওতায় কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের আলোচনায় অর্জিত অগ্রগতি এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তন ইরানকেন্দ্রিক সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ফাটলগুলো সারাতে এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ নতুন করে সাজাতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রভাব বিস্তার সীমিত করতে সক্ষম এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বৃহত্তর কাঠামো তৈরি এবং ভবিষ্যতে আরো ব্যাপক ও শক্তিশালী কৌশলগত জোট গঠনের পথও প্রশস্ত করতে পারে।

মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...