ইতিহাস কখনো কখনো রক্ত দিয়ে লিখিত হয়; কিন্তু রাষ্ট্র সবসময় সেই রক্ত পড়তে জানে না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রায় দুই হাজার শহীদের আত্মাহুতি ও হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব—বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে একটি নতুন শব্দ যুক্ত করেছিল : নতুন আশা। রাজপথে উচ্চারিত হয়েছিল জবাবদিহির দাবি, ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্প। অথচ কয়েক মাস না যেতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল—রাষ্ট্র বদলায়নি, শুধু মুখ বদলেছে।
এই ব্যর্থতার কেন্দ্রে রয়েছে এক নীরব কিন্তু সুসংগঠিত বাস্তবতা—বাংলাদেশের ডিপ স্টেট।
ডিপ স্টেট কোনো সংবিধানস্বীকৃত প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি স্থিতিশীল ক্ষমতাকাঠামো, যা সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এখানে নির্বাচিত রাজনীতিকরা প্রায়ই অস্থায়ী অতিথি আর প্রকৃত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় নথির নিচে, ফাইলের মার্জিনে অথবা গোপন ব্রিফিং কক্ষে। সেনা-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা সংস্থা, অর্থনৈতিক অলিগার্কি, বিদেশি শক্তির সঙ্গে জড়িত লবি এবং প্রভাবশালী মিডিয়া-নেটওয়ার্ক—এই পাঁচ স্তম্ভের সমন্বয়েই বাংলাদেশের ডিপ স্টেট কার্যকর।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের এই অদৃশ্য কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল—কিন্তু ভাঙতে পারেনি। কারণ আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে পৌঁছালেও, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। ক্ষমতা হস্তান্তরের নাটক মঞ্চস্থ হলো অথচ প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকল। সেই একই সচিবালয়, সেই একই নিরাপত্তা বয়ান, সেই একই ‘স্থিতিশীলতার’ বুলি।
শহীদের রক্ত রাষ্ট্রকে বিব্রত করেছিল, বিপর্যস্ত করেনি। ডিপ স্টেটের প্রথম কৌশল ছিল সময় ক্ষয়। তদন্ত কমিশন গঠন, বিচারিক প্রতিশ্রুতি, পুনর্বাসনের আশ্বাস, জুলাই সনদ, সংস্কারÑসবই প্রায় ঘোষণার স্তরে সীমাবদ্ধ থাকল। দ্বিতীয় কৌশল ছিল বয়ান দখল। গণঅভ্যুত্থানকে ধীরে ধীরে ‘অরাজকতা’, ‘বিদেশি প্ররোচনা’, কিংবা ‘চরমপন্থার ঝুঁকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। বিপ্লবীদের চরিত্র হনন, বিভাজন, সন্দেহ সংশয় ঢুকিয়ে ঐক্য বিনষ্টকরণ। মিডিয়ার একাংশ নীরব রইল, সুযোগের অপেক্ষায় থাকল, আরেকাংশ কোনো কোনো দল ও রাষ্ট্রের ভাষ্যকেই শিরোনাম বানাল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো কাঠামোগত সংস্কার হলো না।
নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি প্রশ্নের বাইরে রইল। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা অক্ষত থাকল।
নির্বাচনব্যবস্থা আগের মতোই অনাস্থার ছায়ায়। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আবার কয়েকটি করপোরেট বলয়ের হাতে বন্দি। রাষ্ট্র যেন বলল : ‘তোমরা মরতে পারো, প্রশ্ন করতে পারো; কিন্তু কাঠামো ছুঁতে পারো না।’
এখানেই বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের প্রকৃত শক্তি। এটি প্রকাশ্যে দমন করে না সবসময়; বরং শোষণ করে প্রত্যাশাকে, ক্লান্ত করে প্রতিরোধকে। বিপ্লবের ভাষাকে রূপান্তর করে প্রশাসনিক গদ্যে। রাজপথের স্লোগান ঢুকে পড়ে মন্ত্রণালয়ের নোটশিটে—নির্বিষ হয়ে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশে জনগণ এখনো ইতিহাসের চালিকাশক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয়েছে—রাষ্ট্রের ভেতরে এমন এক শক্তি রয়েছে, যা গণরায়কে সহনীয় সীমার বাইরে যেতে দেয় না। এই শক্তি কোনো দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; দল আসে যায়, ডিপ স্টেট থেকে যায়।
এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে শহীদদের রক্ত শুধু স্মৃতিস্তম্ভে সীমাবদ্ধ থাকবে। রাষ্ট্র পরিবর্তনের জন্য সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; দরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের পুনর্গঠন—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। নতুবা প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান শেষ হবে একই প্রশ্নে : এত রক্তের পরও কেন কিছুই বদলাল না?
২০২৪ আমাদের শিখিয়েছে—স্বপ্ন দেখানো যায়, কিন্তু কাঠামো না ভাঙলে স্বপ্ন রাষ্ট্রে রূপ নেয় না। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে আবেগের বিস্ফোরণ বা স্লোগান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার ও রাজনৈতিক সংযমের সাহস। ডিপ স্টেট ভাঙার অর্থ রাষ্ট্রকে দুর্বল করা নয়; বরং রাষ্ট্রকে তার মালিকের কাছে—জনগণের কাছে—ফিরিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতার পালাবদল যতই নাটকীয় হোক না কেন, কাঠামো অক্ষত থাকলে রাষ্ট্র বদলায় না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই নির্মম সত্য আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, জনমনে নতুন প্রত্যাশা জন্মেছে, অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় নির্বিকার থেকেছে। কারণ ডিপ স্টেট বিপ্লবকে সহ্য করতে জানে, কিন্তু সংস্কারকে ভয় পায়।
এই অদৃশ্য শক্তির প্রধান অস্ত্র হলো নিরাপত্তা বয়ান। ‘জাতীয় স্বার্থ’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দ দুটি বহুদিন ধরেই নাগরিক অধিকার খর্ব করার বৈধ ভাষা হয়ে উঠেছে। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে প্রথমেই এই একচ্ছত্র বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে হবে। নিরাপত্তা রাষ্ট্রের ধারণা থেকে নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণায় উত্তরণ ঘটানো ছাড়া কোনো টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তখনই টেকসই হয়, যখন নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে—এই মৌলিক সত্যকে নীতিগতভাবে স্বীকার করতে হবে।
বাংলাদেশে ডিপ স্টেটের আরেকটি গভীর শেকড় আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার ধারাবাহিকতা। সরকার আসে-যায়; কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে ফাইল ও নোটশিট যখন চূড়ান্ত সত্য হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। এই বাস্তবতাকে ভাঙতে হলে আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রশাসন হবে নীতির বাস্তবায়নকারী, নীতির মালিক নয়—এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে ডিপ স্টেট শুধু রূপ বদলাবে, বিলুপ্ত হবে না।
নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রশ্ন এড়িয়ে ডিপ স্টেট ভাঙার আলোচনা অসম্পূর্ণ। দুর্বল, প্রশ্নবিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ডিপ স্টেটের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। যখন জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না, তখন অদৃশ্য শক্তির জন্য বৈধতার সংকট তৈরি হয় না। তাই নির্বাচন প্রশাসনিক প্রকল্প নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে পুনরুদ্ধার করাই ডিপ স্টেট ভাঙার অন্যতম পূর্বশর্ত।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ডিপ স্টেটের প্রভাব সুস্পষ্ট। কয়েকটি করপোরেট ও আর্থিক বলয় যখন রাষ্ট্রনীতির নেপথ্য প্রণেতা হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি জনস্বার্থ থেকে সরে গিয়ে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং বাজেট প্রণয়নে সংসদের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কার শুধু শব্দের খেলাই থেকে যাবে।
ডিপ স্টেটের আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী অস্ত্র হলো বয়ান নিয়ন্ত্রণ। কোনটি দেশপ্রেম, কোনটি রাষ্ট্রবিরোধিতা—এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা যার হাতে থাকে, রাষ্ট্র কার্যত তারই দখলে যায়। মিডিয়াকে আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপে রেখে, সমালোচনাকে সন্দেহের চোখে দেখে যে রাষ্ট্র চলে, সে রাষ্ট্র নিজেই নিজের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করে। ডিপ স্টেট ভাঙতে হলে প্রশ্ন করার অধিকারকে রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে মেনে নিতে হবে, দুর্বলতা হিসেবে নয়।
সবশেষে আসে বিচার বিভাগের প্রশ্ন। বিচার বিভাগ যদি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন থাকে, বাস্তবে নয়, তবে ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধও ভেঙে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ডিপ স্টেটের জন্য অক্সিজেনের মতো কাজ করে। স্বচ্ছ নিয়োগ, রাজনৈতিক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকাণ্ডে বিচারিক নজরদারি ছাড়া এই অক্সিজেন বন্ধ করা যাবে না।
বাংলাদেশে ডিপ স্টেট ভাঙা সম্ভব, তবে তা কোনো একদিনের ঘটনায় নয়। এটি একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর কিন্তু অপরিহার্য প্রক্রিয়া। সরকার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না; রাষ্ট্র বদলাতে হলে ক্ষমতার অভ্যাস বদলাতে হয়। যদি আমরা সেই অভ্যাস বদলাতে সাহস না করি, তবে প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে। আর যদি সাহস করি, তবে ডিপ স্টেট একদিন আর ছায়া হয়ে থাকবে না—সে শুধু অতীতের ভারী স্মৃতি হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে।
লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক
dr.enam14@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

