আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জুলাই বিপ্লব : রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অঙ্গীকার

মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)

জুলাই বিপ্লব : রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অঙ্গীকার
ব্রি. জে. (অব.) রোকন উদ্দিন

বাংলাদেশ আবারও ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই রাষ্ট্রকে বারবার স্বাধীনতার অর্থ রক্ষা করতে হয়েছে—কখনো বহিঃচাপের বিরুদ্ধে, কখনো অভ্যন্তরীণ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, যার পরিণতিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার প্রস্থান, কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ভয়ভিত্তিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দখলদারিত্ব এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচনের বিরুদ্ধে এক জাতীয় রায়। অনেকের কাছে এটি যেন দ্বিতীয় মুক্তি—এক ঘোষণা যে সার্বভৌমত্ব কেবল স্লোগান নয়, বরং নাগরিকের মর্যাদা ও জবাবদিহিমূলক শাসনের মধ্যেই তার প্রকৃত অর্থ।

দীর্ঘ সময়ের শাসনে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছিল। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উঠে আসে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী মত দমন, প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের অভিযোগ। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ রক্ষকের বদলে দলীয় হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন জনআস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সমাজে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি জন্ম নেয়। ২০২৪ সালের আন্দোলন সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই ছিল এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। নতুন প্রজন্ম জানিয়ে দিয়েছে—উন্নয়ন যদি অধিকারহীন হয়, তবে তা টেকসই নয়; স্থিতিশীলতা যদি বৈধতাহীন হয়, তবে তা ভঙ্গুর; আর ক্ষমতা যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তবে তা অবশেষে জাতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি বর্তমান সরকার জুলাই বিপ্লবের চেতনা খর্ব করতে চায়, তাকে অস্বীকার বা ছোট করে দেখতে চায়, তবে সেটি হবে একটি গুরুতর রাজনৈতিক ও নৈতিক ভুল। ইতিহাস সাক্ষী—জনতার আত্মত্যাগের ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসে পরে সেই আত্মত্যাগকে অস্বীকার করার চেষ্টা করলে তার পরিণতি শুভ হয় না।

বিজ্ঞাপন

একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন হঠাৎ করে হয়নি। এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং জনগণের সাহসী অবস্থানের ফল। বহু নেতা-কর্মী কারাবন্দি ছিলেন, অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন, কেউ কেউ নির্বাসনে। আজ যদি নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়, যদি রাজনৈতিক দলগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারে, তবে তা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি সংগ্রামের অর্জন। এই অর্জনকে খাটো করা, অথবা আগের দমনমূলক কাঠামোকে নতুন রূপে পুনর্বাসিত করা আত্মঘাতী হবে। বিশেষত, যদি পূর্বতন স্বৈরশাসনের অংশীদার বা সুবিধাভোগীদের প্রশাসন, নিরাপত্তা বা নীতিনির্ধারণী পদে নীরবে পুনর্বাসন করা হয়, তবে তা জনমনে ভয়াবহ বার্তা দেবে—যে পরিবর্তন ছিল কেবল ক্ষমতার পালাবদল, চরিত্রের নয়। জনগণের আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পররাষ্ট্রনীতি। কোনো একক রাষ্ট্রের সঙ্গে অতিমাত্রায় ‘সুইট হার্ট’ সম্পর্ক বা একতরফা নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর। যদি সরকার এমন বার্তা দেয় যে তারা একপক্ষীয়ভাবে কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে, তবে তা দেশের অভ্যন্তরে সন্দেহ ও বিভাজন তৈরি করবে। আরো একটি বড় সমস্যা হলো ‘আমাদের লোক’ সংস্কৃতি। বিপ্লব কখনোই একটি পক্ষপাতমূলক পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক নেটওয়ার্ককে আরেকটি নেটওয়ার্ক দিয়ে প্রতিস্থাপনের জন্য হয় না। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ যদি মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে না হয়ে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়, তবে প্রতিষ্ঠান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। যদি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপস করা হয়, তবে নৈতিক ভিত্তি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।

আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো নতুন প্রজন্ম। জুলাই আন্দোলন তরুণ সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করেছে। তারা তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ, দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম এবং ভণ্ডামি সহজে মেনে নেয় না। তারা যদি বিশ্বাস করে, তাদের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তবে অসন্তোষ দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। একটি বিচক্ষণ সরকার বিজয়কে সুসংহত করে সংস্কারের মাধ্যমে—স্বস্তি ও আত্মতুষ্টির মাধ্যমে নয়। অতএব সরকারের জন্য প্রয়োজন—১. রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা; ২. অতীতের দমনমূলক চর্চা থেকে সুস্পষ্ট দূরত্ব; ৩. গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও নিরপেক্ষ যাচাই; ৪. ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বভৌমত্বনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি; ৫. দল-নির্বিশেষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

ইতিহাস সরলরৈখিক নয়। গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ অনেক সময় নীরবে শুরু হয়—যুক্তির মোড়কে আপস, সুবিধাবাদ এবং ধীরে ধীরে স্মৃতিভ্রংশের মাধ্যমে। জুলাইবিপ্লব ছিল মর্যাদা, জবাবদিহি ও সার্বভৌমত্বের দাবি। তাকে খর্ব করা মানে কেবল সরকারকে নয়, রাষ্ট্রকেই দুর্বল করা। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে আবার আলোচনায় আসে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রশ্ন। ইতিহাস, ভূগোল ও অর্থনীতির বাস্তবতা দুই দেশকে সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে। ১৯৭১ সালে ভারতের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমনে ধারণা জন্ম নেয় যে সম্পর্কটি ভারসাম্যপূর্ণ নয়—ঢাকার নীতিনির্ধারণ প্রায়ই দিল্লির কৌশলগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ট্রানজিট, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত নানা চুক্তি অনেকের কাছে একতরফা মনে হয়েছে; অথচ পানিবণ্টনের মতো স্পর্শকাতর বিষয় দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থেকেছে। গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হলে পররাষ্ট্রনীতি জনসমর্থনের বদলে সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে—এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ দেখেছে।

ফলে ভারতবিরোধী মনোভাব কেবল আবেগ নয়, বরং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এক রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। এই বাস্তবতায় বিএনপি সরকারকে সামনে রেখে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট—পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি। তবে এই নীতির অর্থ শত্রুতা নয়; বরং মর্যাদা, ভারসাম্য ও স্বার্থরক্ষার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রথমত, দেশের ভেতরে প্রজাতন্ত্রকে পুনর্গঠন করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ তুলতে হলে অভ্যন্তরীণ বৈধতা অপরিহার্য। সুষ্ঠু নির্বাচন, নিরপেক্ষ প্রশাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব কেবল গণতান্ত্রিক আদর্শ নয়, রাষ্ট্রের শক্তির ভিত্তি। কোনো অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্র বা ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া যেন আর কখনো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রাধান্য না পায়—এই প্রত্যাশাই এখন জনগণের।

দ্বিতীয়ত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সমতার ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ‘বাংলাদেশ প্রথম’ মানে ‘ভারত শেষ’ নয়; বরং প্রতিটি চুক্তি ও সমঝোতা জাতীয় স্বার্থের আলোকে যাচাই করা। বাণিজ্যে ন্যায্যতা, শিল্প খাত সুরক্ষা, ট্রানজিটের স্বচ্ছ শর্ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মর্যাদা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতায় পারস্পরিকতা—এসব প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান জরুরি। পানিবণ্টন, বিশেষত তিস্তা ইস্যুতে বৈজ্ঞানিক ও বাধ্যতামূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা জনগণের দীর্ঘদিনের।

তৃতীয়ত, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনতে হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা বাংলাদেশের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াবে। বৈচিত্র্য মানে কারো বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং কারো ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে মুক্ত থাকা।

চতুর্থত, নন-অ্যালাইনমেন্ট বা অ-জোট নীতিকে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। তথ্যযুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে পেশাদার কূটনৈতিক দক্ষতা, কৌশলগত যোগাযোগ এবং সুসমন্বিত নীতিনির্ধারণ অপরিহার্য। শক্তিশালী পররাষ্ট্রসেবা ও সাংবিধানিক জবাবদিহিমূলক নিরাপত্তা কাঠামোই পারে রাষ্ট্রকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে নিতে।

পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কৌশলগত স্বার্থের অংশ। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র বাইরের চাপ ও অজুহাতকে দুর্বল করে। সব নাগরিকের সমান মর্যাদা রক্ষা করা শুধু নৈতিক দায় নয়; এটি জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি।

ষষ্ঠত, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা জোরদার করতে হবে। উৎপাদনশীল খাত শক্তিশালী করা, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও যুব কর্মসংস্থান—এসবই পররাষ্ট্রনীতিকে শক্ত ভিত দেয়। অর্থনৈতিক দুর্বলতা কূটনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হয়—এ সত্য অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের শেখায়—যখন ক্ষমতা জবাবদিহিহীন হয়, তখন সার্বভৌমত্ব ক্ষীণ হয়। স্বৈরতন্ত্র শুধু মানবাধিকার নয়, রাষ্ট্রের কূটনৈতিক শক্তিকেও দুর্বল করে। ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল এক সতর্কবার্তা এবং এক অঙ্গীকার—চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক জনগণই। একটি সম্ভাব্য বিএনপি সরকার যদি এই বার্তাকে ম্যানডেট হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ কেবল স্লোগান নয়, নীতিগত অঙ্গীকার।

জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট—না অভ্যন্তরীণ স্বৈরশাসন, না বহির্নির্ভরতা; চাই মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতি, জবাবদিহিমূলক শাসন এবং সার্বভৌম জাতীয় স্বার্থরক্ষা। নাগরিকের ভোট, অধিকার ও ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়াই প্রকৃত ‘বাংলাদেশ প্রথম’। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়ালে ২০২৪-পরবর্তী অধ্যায় সত্যিই হতে পারে এক নতুন ভোর—একটি আত্মমর্যাদাশীল, গণতান্ত্রিক ও দৃঢ় বাংলাদেশ, যে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে; কারণ সে নিজের ঘরকে আগে শক্ত করেছে।

লেখক : সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক

hrmrokan@hotmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন