বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বিপ্লব তথা বর্ষাবিপ্লবের আলোকে এর দাবি অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের জনমালিকানা প্রতিষ্ঠা না করা মানে হচ্ছে ছাত্র-জনতার এত বিশাল ত্যাগ এবং জীবনদানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। জনগণ মরণপণ করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এরপরই পুরোনো বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রকে আগের অবস্থায় রেখে দিতেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের অজুহাতে রাজনৈতিক, সুশীল ও শৃঙ্খলার মাতব্বর-মোড়লরা কাজে নেমে পড়েন। স্বত্বাধিকার-তাড়না ও শরমহীন তাড়াহুড়া, মূর্খতা ও মধুলোভ, অজ্ঞতা ও অসূয়া, ধামাকা নাটক ও ধান্ধা নিয়ত বর্ণচোরা দলান্ধ মোড়লদের মাঝে এক ধরনের নেতিবাচক ঐক্য তৈরি করেছে। আবার এই মোড়লচক্রই নানাভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করা এবং বিভেদ সৃষ্টির মতলবে খুবই ক্রিয়াশীল। আত্মস্বীকৃত অসম্পৃক্ততা এখন মহানায়কীয় মিথে পৌঁছেছে। এদিকে পলাতক ফ্যাসিবাদী খুনি-লুটেরাশক্তি সীমান্তপারে হিন্দুস্তানি হিন্দু আধিপত্যবাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বাড়বাড়ন্ত। কি পলাতকগোষ্ঠী, কি তাদের ঠাকুর, আর কি ফ্যাসিবাদ-আধিপত্যবাদের ভালোবাসায় বিভোর মোড়লবৃত্ত—সবাই একাট্টা হয়ে চেতনার পুরোনো মাদকের মৌতাতে জমে আছে। আগে কোরাসে কী বলেছেন আর এখন খেই হারিয়ে কী বলছেন, তাদের হুঁশ নেই। পরস্পরবিরোধিতা ও হুংকার সীমা ছাড়িয়েছে। তাই জনগণকে সচেতন হয়ে, পুনঃসক্রিয় হয়ে সম্মিলিতভাবে নিজেদের কাজ নিজেই করতে হবে। তা যদি এ পর্যায়ে খুব কমও পারা যায়, তবু অন্তত জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিকে নয়া বন্দোবস্তের প্রকৃত ঠিকানায় পৌঁছাতে হবে। সর্বনিম্ন করণীয় হচ্ছে, আসন্ন গণভোটে ‘হাঁ’ ভোট দেওয়া এবং নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সঠিক লক্ষ্য অর্জনের ন্যূনতম অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া।
আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, বর্ষাবিপ্লবের নয়া বন্দোবস্ত হাসিলের লক্ষ্যে প্রথম কাজ তথা বাংলাদেশে জনমালিকানাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এক্ষেত্রে পথ ও করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলেই জনমানুষের সুদৃঢ় ঐক্য ও যৌথ কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছা ও রহমতে সমষ্টিগত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই মাথায় রাখতে হবে—চেঞ্জ উইদিন দি এক্সিসটিং সিস্টেম বা বিদ্যমান বন্দোবস্তের মাঝে পরিবর্তন হচ্ছে, এখানে-ওখানে ছিটেফোঁটা সংস্কারধর্মী পরিবর্তন। প্রচলিত ব্যবস্থা রেখে, সাততলা ও গাছতলা রেখে, হ্যাভস ও হ্যাভন্টস রেখে, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ ও ক্ষমতাহীনতা রেখে যতটুকু অদল-বদল সম্ভব, সেটাই এক্ষেত্রে লক্ষ্য ও কর্মপরিধি। অপরদিকে চেঞ্জ অব দি এক্সিসটিং সিস্টেম বা বিদ্যমান বন্দোবস্তের পরিবর্তন খোদ বিদ্যমান ব্যবস্থাটিকেই বদলে দেওয়ার এবং খোল-নলচে পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতবহ। একটি স্থবির, জঙ্গম, অচলায়তন এবং কেবল সংরক্ষণেই আগ্রহী; আরেকটি ভেঙে দেওয়া ও নয়া বন্দোবস্তের নতুন গঠনের প্রবলতম তাগিদযুক্ত। প্রথমটিতে কায়েমি স্বার্থই থেকে যায়; আর দ্বিতীয়টিতে কায়েমি স্বার্থ উৎখাতই করণীয় হয়ে পড়ে। একটি পরিমাণগত এবং আরেকটি গুণগত পরিবর্তনে ক্রিয়াশীল থাকে। একটি ঊনজন বা এলিট সংখ্যালঘুদের কারবার; আরেকটি অধিজনের জীবন-মরণ। রাষ্ট্র ও সমাজচুক্তির মূলসত্তা এবং সৃজনকর্তা জনগণকে প্রচলিত ব্যবস্থাধীনে কেবল নামমাত্র ভোটার এবং বাস্তবে প্রজা থাকা ও দাসত্ব বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে হলে নয়া বন্দোবস্তের দিকে যেতে হবে। দাসত্ব শৃঙ্খল ভেঙে প্রজার জীবন পেছনে ফেলে রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তাসত্তা হিসেবে এবং এর প্রকৃত কার্যকর মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে স্বীয় সমষ্টিগত সচেতন আত্মা হিসেবে স্বাধীনভাবে নতুন করে আবিষ্কার, উদ্ধার ও পূর্ণ কার্যকারিতাসহ নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ঊনজন ক্ষমতা-উন্মাদ রাজনৈতিক মোড়লচক্রকে জোর করে তাদের তরফ থেকে দখল রাখতে অভ্যস্ত মালিকের অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জনকৃত্যক হিসেবে সাময়িক প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত অবস্থানে পাঠাতে হবে। আর অধিজন গণসত্তাকে দাসত্ব পরিত্যাগ করে প্রজার অপমানকর জীবন অস্বীকার করতে হবে। এলিট-সামরিক-আমলাতান্ত্রিক-ফড়িয়া ব্যবসায়ীভিত্তিক রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অচলায়তনসম কাঠামো ভেঙে দিয়ে নতুন ধরনের রাষ্ট্রের আসল মালিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিতকরণ ও প্রকৃত ক্ষমতায়নকে সম্ভব করতে হবে। অস্বীকৃত উপস্থিতি, প্রান্তিকতা ও অস্পৃশ্যতার মাঝে থেকে দলদাস হওয়া, অন্ধ স্লোগানধারী হওয়া, ব্যক্তি-নেতা-পরিবার-ছবি-কবরপূজক হওয়ার মাঝে মুক্তি নেই। জনমালিকানাধীন রাষ্ট্রে জনসত্তার জন্য সবচেয়ে মর্যাদাকর হতে পারে সাধারণ ইচ্ছার অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশক সমষ্টিকে দলবিহীন সমাজসত্তা হিসেবে সামনে ও কেন্দ্রে আনা। খাড়া শিরদাঁড়া নিয়ে চলা সমষ্টি গণসত্তার এটাই প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। তাই তাদের জন্য ভাঙন আর গঠনই বিকল্পহীন একমাত্র পথ। এরই নাম নয়া বন্দোবস্ত, যার স্বপ্ন দেখিয়েছে বর্ষাবিপ্লব।
আদতে ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সৃষ্ট ও প্রচলিত অচলায়তনমুখী চিন্তা, বিশ্বাস, মনোভঙ্গি, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ধাঁচ, স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্ব ও অগণতান্ত্রিক দলকাঠামো, নীতিকৌশল ও কর্মপ্রচেষ্টা থেকে সরে এসে খোদ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং চলতি স্রোতের একেবারে বিপরীতে চলার সুচিন্তিত বিবেচনাই নতুন বন্দোবস্তের দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম। চলতি ব্যবস্থার মধ্যে থাকার বাস্তবতা ও চলতি ব্যবস্থা পরিবর্তনের কাম্য সূত্র এমনটি হতে পারে, যেখানে জনগণ, রাষ্ট্র, প্রতিনিধি, সরকার, শাসক, আমলাতন্ত্র, শৃঙ্খলাবাহিনী ও ক্ষমতাধারীদের প্রত্যেকের বিদ্যমান ও পরিবর্তিত অবস্থা ও অবস্থান বোধগম্য হবে।
প্রথম বিবেচনা এই যে, জনমালিকানাধীন রাষ্ট্রে ইনসাফের দাবি হচ্ছে—এখানে সমষ্টি মানুষ সর্বাধিক মর্যাদাবান কর্তাসত্তা। তারা ব্যক্তিসচেতনতা থেকে সমষ্টি সচেতনতায় পৌঁছে সাধারণ ইচ্ছা অনুযায়ী সমাজচুক্তি মোতাবেক রাষ্ট্র গঠন করবে। এখানে জনগণ মৌল অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রের নিয়ামক শক্তি। তারা বৃহত্তম সমাজসমষ্টি, কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত, মর্যাদাবান নাগরিক সাধারণ, রাষ্ট্রের মালিক, অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগকারী, দায়দায়িত্ব পালনকারী এবং ভোটার হিসেবে সরকার গঠনে একমাত্র নিয়ন্ত্রক। তারা শেষ কথা বলার অধিকারী এবং সম্মতি ও বৈধতা প্রদানকারী। একযোগে তারা কার্যকর অংশগ্রহণকারী ও মৌল সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। প্রবেশগম্যতা ও প্রাপ্যতার সর্বোচ্চ হকদার তারা। একইসঙ্গে তারা সরকার প্রতিষ্ঠাতা ও সরকার উৎপাটনকারী।
দ্বিতীয় বিবেচনা এই যে, রাষ্ট্র কৃত্রিম ও প্রয়োজনীয় সত্তা। এর প্রতিষ্ঠানাদি, গঠনতন্ত্র, আইনবিধান, ক্ষমতাকাঠামো, ক্ষমতা-সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ও চূড়ান্ত বিচারে জন-ইচ্ছাধীন। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব, দলকাঠামো, প্রতিনিধি, সরকার, শাসক, আমলাতন্ত্র ও শৃঙ্খলাবাহিনীগুলো বেতন ও সুবিধাভোগী পাবলিক সার্ভেন্ট বা জনকৃত্যক। সবাই সাময়িক ও নির্দিষ্টকালের জন্য এবং পুরোপুরি জননিয়ন্ত্রণাধীন ও অধস্তন। তারা জন-আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য, জন-ইচ্ছায় প্রত্যাহারযোগ্য এবং জন-ইচ্ছায় পদচ্যুত হতে পারে। তারা জনগণের পক্ষে কৃত্রিম সত্তা তথা রাষ্ট্রের কাজকারবার পরিচালনাকারী। কেবল জন-ইচ্ছা ও পাবলিক পলিসি বাস্তবায়নকারী তারা, এর বেশি নয়।
তৃতীয় বিবেচনা এই যে, যদি বিদ্যমান বন্দোবস্ত টিকিয়ে রেখে রাষ্ট্রকে দেখতে চাওয়া হয় বা কূটকৌশলে জনগণকে আঁধিতে ফেলে চলতি গঠনতন্ত্র, ক্ষমতাকাঠামো ও ক্ষমতাসম্পর্ক বজায় রাখা হয়, তাহলে জনগণ যেভাবে এযাবৎ ক্ষমতাহীনদের দাস ও প্রজা থেকে গেছে, তেমনটিই রয়ে যাবে। আর রাজনৈতিক মাতব্বর-মোড়লচক্র যেমন জনকৃত্যক হয়েও মালিক সেজেছে, তেমনি শাসক ও ক্ষমতাবলে স্বেচ্ছাচারী থেকে যাবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নৈতিকতা ও সব করণীয় জন-ইচ্ছার বাইরে সংকীর্ণ স্বার্থাধীন হয়ে রইবে। সেক্ষেত্রে ক্ষমতায় আসা-যাওয়া, উৎপাদন-বাজার-বণ্টন, বরাদ্দব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানাদি ও সরকার পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি-কৌশল-করণীয়, আয়-রুজি, নিরাপত্তা, প্রাধিকার, প্রটোকল, সিদ্ধান্তগ্রহণ, ব্যবস্থাপনা, বাস্তবায়ন, অধিকার-স্বাধীনতা, নৈকট্য ও সংহতি, জাতীয় স্বার্থ ও ভূ-রাজনীতি—সবকিছুই জন-ইচ্ছাকে পদদলিত করে ক্ষমতার দাবিদার-দখলদারদের ইচ্ছায় গণবিরোধী পথে সম্পাদিত হবে। এজন্যই নতুন বন্দোবস্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রে জনগণের কর্তাসত্তার মৌল অবস্থান এবং প্রকৃত ও কার্যকর মালিকানা নিশ্চিত করাটাই সর্বাধিক জরুরি।
চতুর্থ বিবেচনা এই যে, বর্ষাবিপ্লবের মাধ্যমে প্রকাশিত গণআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশকে দেখতে হলে বিদ্যমান বন্দোবস্তের খোল-নলচের ভাঙন ও নয়া গঠন দরকার। এতে জনগণ পরনিয়ন্ত্রিত ও দাসের অবস্থান থেকে স্বাধীন স্বনিয়ন্ত্রিত হবে। ক্ষমতাহীন বিচ্ছিন্নতায় নিরর্থক সহযোগী না হয়ে অনিবার্য ও ক্ষমতাবান হবে। প্রজা থেকে তারা স্বাধীন মর্যাদাবান নাগরিক কর্তাসত্তা হয়ে উঠবে। এদিকে ময়ূরপুচ্ছধারী রাজনৈতিক মোড়ল-মাতব্বরগোষ্ঠী, নেতৃত্ব ও দলকাঠামো তখন পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে ন্যায়ানুগভাবে জনসেবকরূপে নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে অবস্থান করবে। গণভোটের রায়ের অনুগত হয়ে গঠন ও বিধান মোতাবেক সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সরকার, শাসন, সংসদ, প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য কাজকর্ম চালাতে বাধ্য ও অভ্যস্ত হবে। রাষ্ট্র কারো বাপের নয়, রাষ্ট্র জনগণের জনমালিকানাধীন। ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী বৈষম্যহীন মানবসাম্য ও মানবমর্যাদার দ্বীনি ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার রাস্তা এটাই।
লেখক : অধ্যাপক (অব.), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

