জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অপরিহার্যতা

ড. আব্দুল লতিফ মাসুম

জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অপরিহার্যতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান নিছক একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না—এটি ছিল দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সঞ্চিত ক্ষোভ, বঞ্চনা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জাতির সম্মিলিত বিস্ফোরণ। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার হরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ভিন্নমত দমনের রাজনীতি একটি জাতিকে এমন পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিল, যেখানে পরিবর্তন আর কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না—হয়ে উঠেছিল সামগ্রিক জাতীয় দাবি। আর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল একটি বিষয়—জাতীয় ঐক্য।

ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা শ্রেণিগত পরিচয়ের ভেদ ভুলে মানুষ একই কাতারে দাঁড়িয়েছিল একটিমাত্র লক্ষ্যে—কর্তৃত্ববাদের অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পথে এবং জাতীয় নির্বাচন-উত্তর বাস্তবতায় আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে—সেই ঐতিহাসিক ঐক্য কি আজও অক্ষত আছে, নাকি তা ধীরে ধীরে ক্ষয়ের পথে হাঁটছে?

বিজ্ঞাপন

এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা দরকার—নির্বাচন একটি দলকে সরকার পরিচালনার ম্যানডেট দিতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব কখনোই একটিমাত্র দলের কাঁধে ন্যস্ত থাকে না। দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়, রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজন অতিক্রম করতে প্রয়োজন ব্যাপকভাবে জাতীয় সমঝোতা। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে ব্যালট বাক্সে নয়, বরং পারস্পরিক আস্থা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক লক্ষণ হলো, রাজনৈতিক মিত্রশক্তিগুলোর মধ্যেও আস্থাহীনতার ছায়া দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের সহযোগী শক্তিগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ ও অসন্তোষ নতুন করে অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে। গণতন্ত্রে মতভেদ স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু যখন পারস্পরিক সন্দেহই রাজনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য বিপদসংকেত বহন করে।

একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাও এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা প্রায়ই স্থানীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং আধিপত্যবাদী প্রবণতা তৈরি করে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ দিয়েছে—জনগণ কখনোই ক্ষমতার অপব্যবহার দীর্ঘ মেয়াদে সহ্য করে না। তাই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুরোনো ক্ষমতা-সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে চলা অপরিহার্য।

তবে আশাবাদী হওয়ার কারণও আছে। জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব বারবার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা এবং জনমুখী রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া যায়, তাহলে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি আরো মজবুত হবে।

অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী তরুণ প্রজন্ম এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার আলামত স্পষ্ট হচ্ছে। তরুণদের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল নয়, তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল রূপান্তর। তারা এমন একটি রাষ্ট্র প্রত্যাশা করেছিল, যেখানে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে। যদি তারা অনুভব করে যে, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই নতুন মোড়কে ফিরে আসছে, তাহলে তাদের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। আর তরুণ সমাজের আস্থাহীনতা মানেই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া; কারণ ইতিহাসের প্রতিটি রূপান্তরের পেছনে তরুণদের অংশগ্রহণই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুই দশকের অপকর্মের বিচারপ্রক্রিয়া আজ জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাস্থল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে। আন্দোলন দমনে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে দেশের নাগরিককে পাখির মতো হত্যার অকাট্য প্রমাণ সবার সামনে। এই খুনিদের ও তাদের দোসরদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জাতি গঠনের অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু একই সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলের বহুমুখী অবস্থান প্রমাণ করে, এই স্পর্শকাতর বিষয়ে আমাদের জাতীয় ঐকমত্য এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

সাংবিধানিক সংস্কার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নেও ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব থাকলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর করে তুলতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ইতিবাচক দৃষ্টান্তও কম নেই, যেখানে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছে। এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই গণতন্ত্রকে সামনে এগিয়ে নেয়। ঐক্যের অর্থ এই নয় যে, সবাইকে একমত হতে হবে; প্রকৃত ঐক্য হলো ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে অভিন্ন জাতীয় স্বার্থে একযোগে কাজ করার সংস্কৃতি। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই নিহিত থাকে বহুমতের বিভিন্নতাকে ধারণ করার সক্ষমতায়।

প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। বিনিয়োগকারীরা এমন পরিবেশ খোঁজেন, যেখানে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত, সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগ হ্রাস পায়, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যাহত হয় এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে; ফলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি থেকে বঞ্চিত থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলও বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল ধরন সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে। রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ছাপ স্পষ্ট। এমন সময়ে একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংহতি। দেশের ভেতরে স্থায়ী বিভাজন ও সংঘাত বিরাজ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দর-কষাকষির সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির পূর্বশর্তই হলো শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ঐক্য।

একই যুক্তি প্রযোজ্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতির আমূল পরিবর্তন ঘটলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য পূর্বশর্ত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাই দিতে হবে যে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে সক্ষম।

বর্তমান সময়ের বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানসহ একাধিক জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দল-মত বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে আঘাত হানে না; এমন সংকটকালে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সমন্বিত জাতীয় প্রয়াস ও রাজনৈতিক সংহতি। সরকার, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক শক্তিসমূহ যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তবেই ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে সীমিত রাখা সম্ভব।

জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা। যারা জীবন ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে পরিবর্তনের সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল, তারা কেবল ক্ষমতার হাতবদল চায়নি; তারা চেয়েছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। পুরোনো সমস্যা নতুন রূপে ফিরে আসছে—এমন উপলব্ধি তাদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো বাস্তব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।

এই প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিসীম। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর ও সহনশীল জনপরিসর গড়ে তোলা। ভিন্নমতাবলম্বীদের শত্রু নয়, অথচ একই রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো জাতীয় বিভাজনে রূপান্তরিত না হয়।

একটি জাতির ইতিহাসে কালেভদ্রে এমন মুহূর্ত আসে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জন্য তেমনই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ ছিল। সেই আন্দোলনের চেতনা যদি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ, অহংকার কিংবা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার কাছে পরাভূত হয়ে যায়, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

রাষ্ট্র নির্মাণ কোনো একক দল বা ব্যক্তির কর্ম নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার ভিত্তি পারস্পরিক আস্থা, ন্যায়বিচার এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ। যে ঐক্যের শক্তি একদিন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছিল, সেই একই ঐক্যের শক্তিই আজ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা সফলভাবে এই জাতীয় ঐক্যকে সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ করতে পারি, তার ওপর। কারণ ঐক্যবদ্ধ জাতি কখনো পরাজিত হয় না; বিভক্ত জাতির সামনে অগ্রগতির পথ চিরকালই দুর্গম হয়ে ওঠে। তাই সময়ের একটিই দাবি—মতভেদ থাকুক, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের সবাইকে এক কাতারেই দাঁড়াতে হবে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন