আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ঘিরে রিফাইন্ড লীগের বুলবুলি আখড়াই

মাসকাওয়াথ আহসান

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ঘিরে রিফাইন্ড লীগের বুলবুলি আখড়াই

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিলের পর শিল্প-সাহিত্যের ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বৃত্তটি তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে ফেলেছেন। সুযোগ বুঝে যথারীতি প্রথম আলো সমর্থিত কোমল আওয়ামীঘন বামরা সমস্বরে উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে লেগেছেন। জুলাই গণহত্যা নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ ও জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কারণে ফারুকী চক্ষুশূল এটা জুলাই বিপ্লবে মুক্ত নাগরিকরা জানে। গত ১৬ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের ছিদ্রান্বেষণের একটি সুযোগও হাতছাড়া করেননি এই সংস্কৃতি মামা ও খালারা। শিল্প-সংস্কৃতির এই সীমাবদ্ধ বুদবুদে ‘আফসানার জন্য কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ থিয়েটারে প্রভোকিত হয়ে আফসানা বেগমও তার নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রেখেছেন। কিছু সংবাদমাধ্যম তার বক্তব্য প্রচার করেছে। এই সংবাদ মাধ্যমগুলো সতেরো মাস আওয়ামী লীগকে দুই নয়নের জলে ভিজিয়ে রাখাতে তাদের পাঠকরা এখন তাদের কাজেই চেনেন।

লক্ষ করলাম আফসানা ও কোমল আওয়ামীঘন বাম সংস্কৃতি মামা-খালারা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বেশ ক্ষ্যাপে গিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এখন প্রশ্ন হলোÑতাদের এত ক্ষ্যাপাটে হওয়ার কারণ কী? সরকারি পদে তো নিয়োগ ও নিয়োগ বাতিল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া; এ তো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়।

নিতান্ত ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে আঘাত না লাগলে এ রকম লোকরা অনুশীলিত নির্লিপ্ততা পালন করেন; বড়জোর কুসুম কুসুম সমালোচনা করেন; এ তো আমরা দেড় দশকের ফ্যাসিস্টকালে দেখেছি।

আফসানা ওই পদে থাকা অবস্থায় বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর কোনো সুবিধা না থাকলে তারা এতটা রেগে কাঁই হওয়ার লোক নন।

খোঁজ নিতে গিয়ে শুধু অবাক হইনি, আহতও হয়েছি।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সারা দেশে বইপাঠের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। সরকার নিজ উদ্যোগে বই কিনে বিভিন্ন বেসরকারি লাইব্রেরিতে পাঠায় অনুদান হিসেবে। এ কাজ সমন্বয় করা হয় একটি কমিটির মাধ্যমে। এটি ‘বই নির্বাচন কমিটি’ নামে পরিচিত।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদানের জন্য বই নির্বাচন কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত চূড়ান্ত গ্রন্থ তালিকা দেখলে একটি সিন্ডিকেটের হদিস পাওয়া যাবে।

এ কমিটিতে আছেন মোশাহিদা সুলতানা (ঋতু) এবং আহমাদ মোস্তফা কামাল। যতটা খুঁজে পেয়েছি, মোশাহিদার একটি এবং কামালের তিনটি বই ক্রয় তালিকায় রয়েছে। কমিটির সদস্য হয়ে নিজের বই নিজে তালিকাভুক্ত করা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। সততা ও নীতিনৈতিকতা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন আহমাদ মোস্তফা কামাল। এ ব্যাপারে ওনার সচেতনতা কাঙ্ক্ষিত ছিল।

বইয়ের তালিকায় চোখ বুলিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি।

সেই পুরাতন আওয়ামী বাঙালি জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভ উৎপাদনকারী বই রাখা হয়েছে। ফ্যাসিজমের টুল হিসেবে যে জাতীয়তাবাদ ভারত সমর্থিত আওয়ামী লীগের একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনকে টিকিয়ে রেখেছিল; অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই একই মগজ ধোলাই প্রকল্প বহাল থাকা; জুলাই বিপ্লবে শহীদদের প্রতি সমানুভূতিহীনতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বই তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমনকি যারা ১৭ বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বৃক্ষের পরিচর্যা করেছেন, সেই নির্মলেন্দু গুণ, সেলিনা হোসেন থেকে শুরু করে ইমতিয়ার শামীম, অদিতি ফালগুনী, কুমার চক্রবর্তী, স্বকৃত নোমান, মোজাফফর হোসেনদের একাধিক বই রাখা হয়েছে। এদের কারো কারো চার-পাঁচটি বই রাখা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে সহস্র শিশু-কিশোর-তরুণ হত্যাকাণ্ডের পরও যাদের অনুশোচনাহীন ‘আগেই ভালো ছিলাম’ নাটকের সক্রিয় কলাকুশলী ও অনুশীলিত নির্লিপ্ততায় নীরব কবি হিসেবে সবাই দেখেছেন। এ যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ফ্যাসিজমের পক্ষে সক্রিয় এজরা পাউন্ডের বই; যুদ্ধ পরবর্তী ইতালি ও জার্মানিতে সরকারি টাকায় কেনা!

অথচ বাংলাদেশে নতুন চিন্তা-তৎপরতায় যারা যুক্ত, যেমন মাহমুদুর রহমান, ব্রাত্য রাইসু, রিফাত হাসান, পিনাকী ভট্টাচার্য, ফারুক ওয়াসিফ, রক মনু, মাহবুব মোর্শেদ, গাজী তানজিয়া, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, হাসান রোবায়েত, ইমরুল হাসান, সুমন রহমান, মাশরুর আরেফিন, এহসান মাহমুদ, তুহিন খান, মীর হুজাইফা মাহমুদ, মৃদুল মাহবুব, ফারুক ওয়াসিফ, রেজাউল করিম রনিÑজুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে সক্রিয় থাকা এমন অনেকের বই বাদ পড়েছে।

প্রেস ইনস্টিটিউটের ‘তারিখে জুলাই’সহ জুলাই গ্রন্থমালা অনুরোধ সত্ত্বেও নেওয়া হয়নি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে।

শাপলা ট্র্যাজেডি নিয়ে কোনো বই নেই। অথচ এক শাপলা নিয়ে অন্তত দশটা বই বের হয়েছে। পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়ে বই বের হয়েছে। অথচ গ্রন্থকেন্দ্রের এই রিফাইন্ড লীগ সিন্ডিকেটের কাছে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। যেমন প্রথম আলোর কাছে ছিল না শাপলার শহীদদের কোনো অস্তিত্ব।

বইয়ের তালিকা দেখলে বোঝা যায় যে, একটি সিন্ডিকেট পুরো তালিকাটি প্রস্তুত করেছে। যেমন প্রথম আলো সংশ্লিষ্ট লেখকদের অনেক বই কেনা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, আফসানা বেগমের নিয়োগ হয়েছে প্রথম আলোর সেকেন্ড ইন কমান্ড সাজ্জাদ শরিফের সুপারিশে। কৃতী সাহিত্য সমালোচক সাজ্জাদ শরিফ সরকারি খরচে গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের সমভিব্যাহারে ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় যান। এরপর গ্রন্থকেন্দ্র শরিফের লেখা ছাপানো থেকে শুরু করে আরো নানাভাবে তাকে গুড উইল জেশ্চার দেখায়।

এবার গ্রন্থকেন্দ্রের ‘এসথেটিকস’ সিন্ডিকেট যে বইয়ের তালিকা করে, এর মধ্যে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের স্ত্রী মালেকা বেগম আছেন, সাজ্জাদ শরিফ রয়েছেন, দন্তস্য রওশন, জাহিদ রেজা নূরের একাধিক বই রয়েছে। অথচ ফরহাদ মজহারের বই আছে মাত্র একটি। বদরুদ্দীন উমর, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, ফাহাম আব্দুস সালামের বই সংস্কৃতি উপদেষ্টার বিশেষ অনুরোধে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আনু মুহাম্মদের বই রয়েছে অন্তত চারটি, আজফার হোসেনের বই রয়েছে একাধিক। ওই ঘরানার কল্লোল মোস্তফার বই রয়েছে একাধিক। এই এসথেটিকস সিন্ডিকেটের পছন্দ না, এমন কারো বই রাখা হয়নি।

তাদের পছন্দের কিছু প্রকাশককে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ওইসব প্রকাশকের যে রাজনৈতিক বয়ান, সে অনুযায়ী বই নির্বাচন করা হয়েছে। সেই কবেকার ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’র মতো পুরোনো বই রাখা হয়েছে তালিকায়। মানে আপনাকে ঘুরে-ফিরে সাম্প্রদায়িক বেঙ্গল রেনেসাঁর সিলেবাসে সারাজীবন একই ধরনের বই পড়তে হবে।

মজার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার বিগত ১৫ বছরের সমালোচনা করে লেখা কোনো বই যেমন তালিকায় নেই, তেমনি বাহাত্তর-পঁচাত্তর পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনামলের সমালোচনা করা বইও রাখা হয়নি। প্রহসনের নির্বাচন নিয়ে মাহবুব তালুকদারের বইটা অন্তত রাখা যেত, সেটাও রাখা হয়নি। খালেদা জিয়াকে নিয়ে কোনো বই নেই। মাহফুজুল্লাহ ও মাহবুবুল্লাহর কোনো বই নেই। জিয়াউর রহমানের ওপর লেখা বইও কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক লেখক, অনেক বই, সব লেখক পরিচিত নয়। জীবনে নাম শোনা যায়নি এমন লেখকও আছেন।

অথচ এসব বই কেনা হবে জনগণের টাকায়, যার দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের। এখন একজন পরিচালক তার পছন্দের বুদবুদের লোকদের নিয়ে কমিটি তৈরি করে বন্ধুকৃত্য করবেন, আর এর দায় মন্ত্রণালয়কে বহন করতে হবে, এটা বেশ পরাবাস্তব প্রত্যাশা। আফসানা বেগম তার নিয়োগ বাতিলের প্রতিবাদে লেখা ভাষ্যে শতভাগ স্ব-নিয়ন্ত্রণ চেয়েছেন। কিন্তু তার গ্রন্থ বাছাইয়ে নৈর্ব্যক্তিকতা ও জুলাই বিপ্লবের প্রতি সমানুভূতি লক্ষ করা যায়নি; যা ওনার কাছ থেকে খুবই প্রত্যাশিত ছিল।

আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি লোকরা ‘আমাদের লোক’ আর ‘ওদের লোক’ বলে বাংলাদেশের মানুষকে ভাগ করে থাকে। মন্ত্রণালয়ের চাপে পড়ে ভবিষ্যতে যেন (ওদের লোক) বদরুদ্দীন উমর, সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহারের বই কিনতে না হয়, শুধু আমাদের লোকের বই কেনা যায়; সে জন্য মন্ত্রণালয়ের ২০ শতাংশ বই কেনার নিয়মও আফসানা বাতিল চাইলেন।

বইয়ের এ তালিকা দেখে আশাহত হলাম। মনে হলো, স্বজনপ্রীতি ও আবদ্ধ রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে দেশের পাঠকের মধ্যে সার্বভৌম বাংলাদেশ চিন্তার উন্মেষ ঘটানোর ঔদার্য শিল্প-সাহিত্যের লোকদের অধিকাংশের মধ্যেই অনুপস্থিত।

এ প্রসঙ্গে অবশ্য আমি প্রায়ই লিখি যে, মানুষের অধিকারের পক্ষে যারা উচ্চকিত থাকেন, আলোকিত মানুষ হিসেবে যারা তারুণ্যের আইকন হয়ে ওঠেন; তারা দায়িত্ব পেলে জনগণের স্বার্থভুলে নিজস্ব গোষ্ঠীস্বার্থ চিন্তার প্রতিফলন ঘটান তাদের কাজকর্মে।

আফসানা বেগম জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে দায়িত্ব পাওয়ার পর; ঘুরে-ফিরে সেই তামাদি চিন্তার অচলায়তনটি এসে সেখানে বুলবুলি আখড়াই জমিয়ে তুলল; কেন শিল্প-সাহিত্যের ‘বাবু-কালচার’ সুড়ুত করে ঢুকে পড়ে প্রতিষ্ঠানে; তারপর ফেরি করতে থাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সংস্কৃতি; এই কি তবে আমাদের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি? এই বেঙ্গল রেনেসাঁর অচল পুঁথি পোড়োর দল থেকে কি আমাদের সৃজনশীল চিন্তা ও স্বকীয় সংস্কৃতির মুক্তি নেই।

সতেরো মাস জুলাই বিপ্লবের সমালোচনা ও বিপ্লবীদের ছিদ্রান্বেষণ করে এই গোষ্ঠীটি এখন সুশীল সেজে ‘আফসানা’র পক্ষে মাঠে নেমেছে। ওপরে বামের সাদা প্রলেপ আর ভেতরে আওয়ামী লীগের কোমল কুসুম। স্বাধীনতার পর চুয়ান্ন বছরের রাজনৈতিক মানচিত্রে ছলে-বলে কৌশলে এরা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তার ছিদ্রান্বেষণ করে এক বছরে তাকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করেছে। গত সতেরো মাসে তাদের একই ছিদ্রান্বেষণের কলাকৈবল্য লক্ষ করা গেছে। এরাই এসথেটিকস আড্ডায় হাসিনার বিকল্প নেই কথাটাতে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছে। বড় বিচিত্র এই বুবুশীলতা।

লেখক: সাংবাদিক প্রতিষ্ঠাতা, ই-সাউথ এশিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...