লেখাটি শুরু করতে চাই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং এককালে ভারতে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জন কেনেথ গলব্রেইথের প্রসঙ্গ দিয়ে। তিনি ভারতে রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন এই বিবেচনায় যে, জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে তার বেশ সখ্য ছিল এবং জন কেনেথ গলব্রেইথ ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে জানতে বেশ আগ্রহী ছিলেন। এটা অবশ্য আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, গলব্রেইথের মতো বিশ্বখ্যাতসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ কেন একজন রাষ্ট্রদূত হলেন এবং তাও আবার সুদূর ভারতে। গলব্রেইথ জীবনে বিস্তর উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী লেখালেখি করেছেন। বইও আছে অনেকগুলো। তার একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম The Nature of Mass Proverty, অর্থাৎ ‘গণদারিদ্র্যের প্রকৃতি’। এখানে বাংলাÑঅর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু মন্তব্য আছে, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের এবং জাতিগোষ্ঠীর গণদারিদ্র্য এবং তাদের জাতিগত বা মানুষের চরিত্র সম্পর্কে। তিনি এই বিষয়গুলো অনুল্লেখ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর একে তিনি বলেছেন, ‘জাতিগত স্বভাব’ হিসেবে। গলব্রেইথ বলছেন, ‘কলকাতার (পশ্চিমবঙ্গ অর্থে) দুঃসহ দারিদ্র্য এবং বাংলাদেশের মানুষদের চিরকালীন বিপজ্জনক অবস্থা কেন ঘটেছে’Ñএর স্বরূপ সন্ধানে তিনি তার বইয়ে বলেছেন, ‘বাঙালিদের নরম মেজাজে সুশৃঙ্খল আইন অমান্য করার প্রবণতা’ রয়েছে। তথ্যসূত্র : জন কেনেথ গলব্রেইথ, The Nature of Mass Proverty; (বাংলা ভাষান্তর), আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা, (সেপ্টেম্বর ১৯৮১, পৃষ্ঠা-৯)
জন কেনেথ গলব্রেইথের বক্তব্য কেন প্রাসঙ্গিক, তা বিচার-বিবেচনার দায়িত্ব পাঠকের। তবে গলব্রেইথ একই বইয়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছদে বলেন, ১৯৪৭ সালের দিকে ধারণা করা হয়েছিল, ‘একবার স্বাধীনতা অর্জিত হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আর চিরকালই দরিদ্র মানুষের কণ্ঠরোধ করতে সাহায্য করা হয়েছে। দরিদ্র আর নিরক্ষর মানুষকে সাধারণত এবং নিজেদের স্বার্থেই নিশ্চুপ থাকতে হয়েছে।’
বাংলাদেশের অধিকাংশ অর্থাৎ সাধারণ জনগোষ্ঠীর এমনই দুর্ভাগ্য যে, বারবার স্বাধীনতা নামক বিষয়টি আমরা শুনেছি, জীবন দিয়েছি, রক্ত ঢেলেছি, কিন্তু বাস্তবে তার স্বাদ কেমন তা ভোগ করার বিষয় তো দূরে থাক, এক বিশাল ‘কথামালার রাজনীতি’র চক্রাবর্তে ঘূর্ণির মধ্যে পড়েছি।
ইতিহাস সরলরৈখিক নয়। কিন্তু এটা যে স্থায়ী বন্দোবস্তে রূপ নেবে, তাও কল্পনার অতীত। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচনের পর গলব্রেইথের ভাষায়, ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’ মনে করা হলেও তা হয়নি। আশা করি যাবে, কারণ আশার ওপর এখনো ‘ট্যাক্স বসেনি’।
খ্রিষ্টজন্মের ১৬০ বছর পর মার্কাস অরেলিয়াস নামে রোমান সম্রাট, যাকে দার্শনিক রাজা (Philosother King) হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত, তিনি রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেন। তার একটি উক্তির জন্য এখনো তিনি ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস বলেছিলেন, A Man's is no greater than the worth of his ambitions (একজন মানুষের মূল্য তার প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা অথবা লক্ষ্য বা ইচ্ছার চাইতে বড় নয়)। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য বা ইচ্ছার অপর নাম ‘স্বপ্ন’ বেঁচে থাকার প্রেরণা। এখানে মহালক্ষ্যমাত্রা অথবা মহাপরিকল্পনা নয়, স্বপ্ন হচ্ছে আসল। মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে বড় নয়। বড় নয় বলেই সে নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের ফারাক হচ্ছে, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির।
এ কারণে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ‘একটি স্বপ্ন’। ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ‘আরেকটি স্বপ্ন’। মুক্তিযুদ্ধ ছিল দেশটি হবে সবার, আলাদা জাতিসত্তার, ন্যায় ও সাম্যের বিপ্লবী স্বপ্ন এবং এ থেকে জন্ম নেওয়া চৈতন্যের জাগরণ বা চেতনা। এই বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়ায় আবার ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব আরেকবার স্বপ্ন দেখা বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে ন্যায়, ন্যায্যতা, ইনসাফের নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের লক্ষ্যে। এখানেও চৈতন্যের জাগরণ বা চেতনা আছে। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন নেই, শুধু শাসক বদল। এ অবস্থায় চৈতন্যের জাগরণ বা চেতনা একটি জাল বা ভুয়া রাজনৈতিক বয়ান। স্বপ্ন বাস্তবায়ন ছাড়া, শাসক বদলের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রপ্রাপ্তি ছাড়া চেতনা থাকতে পারে না তা ১৯৭১ হোক বা ২০২৪-এর জুলাই-ই হোক। আগেই বলেছি, শাসক বদলে জনমানুষের প্রবল আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হলে চেতনা থাকতে পারে না। চেতনার বাস্তবায়নই হচ্ছে স্বপ্নের বাস্তবায়ন। এটা জনমানুষের সম্মিলিত স্বপ্ন।
বর্তমান বাস্তবতা
রাজনীতিবিজ্ঞানে একটি তত্ত্ব আছে। আর সেটি হচ্ছে Political Land scape অথবা রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল, কখনো দ্রুত এবং কখনো স্বাভাবিক নিয়মে। তবে বাস্তবতার সঙ্গে অতীত জড়িত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন পাল্টেছে এবং ২০২৬-এর নির্বাচন কেন্দ্র করে এই বাস্তবতা পাল্টেছে।
নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা, কে কতটা করবে জনগণের জন্য, তার প্লাবনে ভাসছিল দেশ। নির্বাচনি ফলের বিশ্লেষণে যাব না। তবে দু-একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করব প্রতিশ্রুতির প্লাবন থেকে। সবাই তাকিয়ে ছিল ভিন্ন এক বাস্তবতার বাস্তবায়ন কীভাবে হয় তা দেখার জন্য। এবারই প্রথম একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়া সাধারণ বা সংসদ নির্বাচনের এবং গণভোটের ফলাফলের দিকে। কিন্তু বিপত্তিটা সেখানেই।
নির্বাচনের দ্রুত গেজেট প্রকাশ, কারচুপি হয়েছে বলে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তার নিষ্পত্তিকরণ বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় এটা দেখা গেছে, কারচুপির বা ভোট-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর সুরাহার আগে গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। সরাসরি ভোটের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এসব না থাকায় এতে কিছুটা ‘খটকা’ বা প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক।
গণভোটের ফল নিয়েও কেউ কোনো আপত্তি করেনি। অর্থাৎ প্রাপ্ত ফলের ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশ হ্যাঁÑঅর্থাৎ জুলাই সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নÑঅর্থাৎ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আর না ভোট দিয়েছেন ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। এখানে দেখা যায়, মোট ভোটারের ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার হ্যাঁ-এর পক্ষে। আর ‘না’ ভোটের সংখ্যা ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার জন। ভোটদানের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিক দিয়ে বা প্রেক্ষাপটে দেখলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন বিএনপি এককভাবে ভোট পেয়েছে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ হ্যাঁ ভোটের চেয়ে এককভাবে বিএনপি ভোট পেয়েছে ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ কম।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে, বিজয়ী দলের চেয়েও হ্যাঁ ভোটের সংখ্যা বেশি। এসব সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব। অর্থাৎ নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি এবং ছোট ছোট শরিক দল নিয়ে বিএনপি সুপার মেজরিটির সরকার গঠন করেছে। অতীতেও সুপার মেজরিটির নির্বাচন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
তবে এবার এ নিয়ে সংকট বা বিপত্তি হচ্ছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে। ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়েছিল, ‘হায়ারে’ সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। এসব সত্ত্বেও নানা বিপত্তি পেরিয়ে প্রথমে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের সাত দফা অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫-এর ১৭ অক্টোবর। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রতিনিধিরা এতে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করেন। এই অঙ্গীকারনামা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেই লক্ষ্যে খুঁটিনাটিসহ বিস্তারিত রাষ্ট্রপতির সংস্কার আদেশ-২০২৫-এর গেজেট আকারে জারি হয় এবং এতেও সব দল অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দল সম্মতি দেয়। আর এরই ধারাবাহিকতায় একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট হয়। জামায়াত, এনসিপিসহ অনেক দল আলাদা আলাদা দিনে গণভোট চাইলেও মূলত বিএনপির আপত্তিতেই একই দিনে দুই ধরনেরÑঅর্থাৎ জাতীয় সংসদ এবং গণভোট হয়।
বিপত্তি এবং সংকটের শুরু ১৭ ফেব্রুয়ারি, যখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা (এমপি) শপথগ্রহণ করেন। তখন বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়Ñগণভোটের বিধান সংবিধানে নেই। এটি আগে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং এরপরে তারা সংবিধান মোতাবেক শপথ নেবেন। এ কারণে তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের সদস্যপদে শপথ নেননি। তবে জামায়াত, এনসিপি দুটোইÑঅর্থাৎ সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের এবং জাতীয় সংসদের সদস্যপদে শপথ নেয়।
বিএনপির চিন্তার এবং কার্যক্রমের আমূল এবং মৌলিক পরিবর্তন যাকে Paradime Shift বলা হয়, তা ঘটে যায়। সোজা কথায় বিপরীতমুখী যাত্রা এবং গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ-সূচক যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজারÑঅর্থাৎ ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোটারকে না বলে দিয়েছে। সুপার মেজরিটির এটাই সংকট।
এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তবে প্রশ্নটি শুধু হ্যাঁ বা ‘না’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। আইন-আদালত পর্যন্ত বিষয়টি গড়াবে কি নাÑতা ভবিষ্যতের ব্যাপার।
তবে বিষয়টি যে পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল বা অস্ত্র হয়ে গেল, পূর্ণমাত্রায় দলীয় রাজনীতিকীকরণ করা হলোÑপ্রশ্নটি সেখানে। এই রাজনীতিকীকরণ শুধু স্বল্পপরিসরের নয়। প্রশ্নটি আবার মহাবিভাজনের।
আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা বা থিংকট্যাংক Chatham House-এর গবেষণায় গত ২০ নভেম্বরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরে এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র গবেষক ড. নাজাম লায়লা ওই নিবন্ধে বলেন, ‘এটা এই বিপ্লব শুধু শেখ হাসিনারই পতন ঘটায়নি; বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার দল আওয়ামী লীগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি যে কয়েক দশকের পুরোনো দ্বিদলীয় আধিপত্য ছিল, সেটাও ভেঙে দিয়েছে। এ পরিবর্তন ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক কুশীলবদের জন্য জায়গা তৈরি করেছে।
জুলাই সনদ গণভোট সম্পর্কে ড. নাজাম লায়লা বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটটি বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গণভোটবিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে অভূতপূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একত্র করেছে। সনদে দ্বিকক্ষের সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর জন্য মেয়াদসীমা, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এতে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর আরো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সংসদীয় প্রভাব বা একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে। গণভোটে জয়লাভে এসব পরিবর্তন দশকের পর দশকের বংশানুক্রমিক আধিপত্য ভেঙে দিয়ে বহুত্ববাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। (তথ্য সূত্র : Dr. Nazm Laila, Chatham House; Sheikh Hasina's verdict and Bangaladesh's upcoming referendum singnal a transitional moment for South Asia)।
এ তো গেল চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণের কথা। কিন্তু ২০২৫-এর ১৭ অক্টোবর যে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামায় বিএনপি, জামায়াতসহ অপরাপর দল যে সাত দফা স্বাক্ষর করেছিল এবং এটা হয়েছিল প্রকাশ্যে, সঙ্গে টেলিভিশনেও সম্প্রসারিত হয়েছিল, তার কী হবে? জুলাই জাতীয় সনদে প্রথম দফায়ই বলা হয়েছিল, ‘জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়া এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্তদান এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তৎপরিপ্রেক্ষিতে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই সনদ-২০২৫-এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব। (২) যেহেতু জনগণ এই রাষ্ট্রের মালিক, তাদের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে, সেহেতু রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো সম্মিলিতভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে জনগণের অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ গ্রহণ করেছি বিধায় এই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানের তফসিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে সংযুক্ত করব।
এই জুলাই সনদের বিস্তারিত এবং বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ জারি হয়। এর আগে এতে সবাই অর্থাৎ দল স্বাক্ষর করে এই বলে যে, এতে যা যা থাকবে তা তারা মেনে নেবে।
বিএনপির অবস্থান
বিএনপি নির্বাচনে গণভোটের মাধ্যমে হ্যাঁ বা ‘না’-এর পক্ষে ছিল। সে বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে চাই না। তবে বিএনপি এখন বলছে, এমন বিধান সংবিধানে নেই। সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসার পরে দেখা যাবে। বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অনেকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলছেন, ‘কীসের গণভোট?’
তাহলে অতীতে সামান্য হলেও যেতে হয়। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) জেনারেল জিয়াউর রহমান গণভোট অনুষ্ঠান করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বৈধতা অর্জন করেন। গণভোটে ৯৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে ভোট দেন। এছাড়া ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারী শাসক জেনারেল এরশাদ ১৯৮৫ সালে গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের বৈধতা হাসিল করেন। ১৯৯১ সালের গণভোট ছিল রাষ্ট্রপতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতির শাসনে যাওয়ার গণভোট। যারা ভুলে গেছেন, তারা নিরেট বোকা অথবা কুবুদ্ধিতে মাথাটা খোয়া গেছে।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। ১৯৭৫ সালের পরে জেনারেল জিয়া বহুদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা, জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান, সংবাদপত্রের কালাকানুন, দালাল আইন বাতিলসহ এক ব্যান্ডেল নয়া আইনি ব্যবস্থা চালু করলেন এবং এ জন্য তাকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলা হয়, তা কোন সংবিধান বলে করেছিলেন? পরে ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ এর সবগুলোর বৈধতা দেয়। স্বৈরশাসক এরশাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেয় পরবর্তী সংসদে।
তৃতীয় প্রসঙ্গে আসা যাক। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারত যাওয়ার পর আগের সংবিধান অকার্যকর হয়। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথের আগ পর্যন্ত কোথায় ছিল সংবিধান, কে ছিলেন সরকারপ্রধান? বিষয়গুলো চিন্তা করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিধান আগের সংবিধানে ছিল না। কাজেই রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তিত অবস্থায়, জনগণই সংবিধান তৈরি করে। কখনো কখনো আগের সংবিধান ও আইন জনবিপ্লবের প্লাবনে ভেসে যায়। আগে বলা হতো হাইকোর্ট দেখাও? এখন কী বলব?
আসলে আইনপ্রণয়ন কী
খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, আইনপ্রণয়ন বা সংবিধানÑএগুলো জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১-এ একটি জাতি রাষ্ট্র দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ নামের রক্তাক্ত এক যুদ্ধ এবং যুদ্ধের মাধ্যমে বিপ্লব চেয়েছে, রাষ্ট্র পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ কি পাকিস্তানের সংবিধানের দিকে তাকিয়ে ছিল বা তোয়াক্কা করেছিল?
বিশ্বখ্যাত ফরাসি দার্শনিক জ্য দেরিদা তার বই Force of law : The Mystical Foundation of Authority তে বলেছেন, আইন মূলত একটি অভ্যুত্থান শক্তির (Coup of force) ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি কার্যকর, সহিংস কর্মকাণ্ড। তবে তার উৎসে বা উৎপত্তিস্থলে বৈধ বা অবৈধ বিচারের বিষয় নয়। দেরিদা বলেন, এ কারণে আইনপ্রণয়ন এক রহস্যময় কর্মকাণ্ড। কারণ আইনের উৎপত্তি নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলা হয় না। আইন নিজেকে ন্যায্যতা দিতে পারে না, কারণ এই ব্যবস্থা কর্তৃত্ব তৈরির জন্য একটি মৌলিক, হিংসাত্মক এবং কার্যকর আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আর এটিই পরে আইনি ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য ও বিবেচিত হয়। দ্য দেরিদার যুক্তি হচ্ছে এবং বলছেন, আইনপ্রণয়ন কোনো ধ্বংসাত্মক (Destructive) কাজ নয়। কারণ আইনের মাধ্যমে বিনির্মাণ ব্যবস্থা, যা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বিনির্মাণ যোগ্যতা বা ব্যবস্থাই ন্যায়সংগত এবং এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। জ্য দেরিদার অন্যতম যুক্তি হচ্ছে, অভ্যুত্থান বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে হলেও এতে সবার অংশীদারত্ব এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। আর অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, নতুন ব্যবস্থার জন্ম দেয় এবং নতুন আইন পুরোনো আইনের দৃষ্টিতে ন্যায্যতা পায় না।
আইন সম্পর্কে আরেকজন বিখ্যাত রাজনীতিবিজ্ঞানী হান্না আর্বেন্ট তার ‘On Revolotion’ বইয়ে বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী লিখিত সংবিধান শুধু একটি লিখিত দলিলই নয়। বরং নতুন বাস্তবতার কাঠামো। আর গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের লক্ষ্য হলো স্বাধীন এবং স্বাধীনতার সংবিধান, যেখানে জনসাধারণের স্বাধীনতা, অধিকার, বাকস্বাধীনতাসহ সামগ্রিক অধিকার নিশ্চিত করে। আর্বেন্ট মনে করেন, এটা নিছক মুক্তি নামক ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থাকে আলাদা করে।
এ বিষয়গুলো বুঝতে হবে আইন ও সংবিধান কোনো অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। আইন এবং সংবিধান জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন। আর এটা নির্ভর করে রাজনৈতিক মতলবের ওপর। কুমতলবি কাজ জনআকাঙ্ক্ষার কাছে তুচ্ছ। ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করে দেখিয়েছে। ইতিহাস নিজেই সংশোধন করে। ইতিহাস হচ্ছে ঐতিহাসিক সংশোধক।
লেখক : গবেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

