আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

ইউসুফ কান আয়াজ

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা
ফাইল ছবি

সিরিয়ার কুর্দিদের সশস্ত্র সংগঠন পিপলস প্রটেকশন ইউনিট (ওয়াইপিজি) দীর্ঘদিন মার্কিন ও ইসরায়েলের সহায়তায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিজেদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার ক্ষমতার পালাবদলের ফলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যস্থতায় সিরিয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মনোভাব থেকে সরে আসেন। তিনি প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার নতুন সরকারের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন এবং দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন। একই সঙ্গে কুর্দিদের ওপর থেকে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আমূল পরিবর্তন করে। মার্কিন সমর্থন হারানোর পর শেষ পর্যন্ত ওয়াইপিজি দেশটির নতুন সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এর আগে তুরস্কের কুর্দি বিদ্রোহী সংগঠন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) বিলুপ্তি ঘোষণা ওয়াইপিজির অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছিল। এরপর মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহারের ফলে ওয়াইপিজির অবস্থান সম্পূর্ণভাবে হ্রাস পায়।

চুক্তি অনুযায়ী ওয়াইপিজির সদস্যরা তাদের অস্ত্র ত্যাগ করবে এবং প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার সরকার তাদের সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে সিরিয়ায় কুর্দিদের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র লড়াই সমাপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, এই চুক্তি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকেও নতুন রূপ দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ইরাককে কুর্দি জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে নতুন সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

কারণ সিরিয়ার নতুন সরকার দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তার কর্তৃত্ব সুসংহত করার সঙ্গে সঙ্গে ইরাক তার পশ্চিম সীমান্তে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সিরিয়া সরকার ও ওয়াইপিজির চুক্তি ইরাককে তার সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং রাজনৈতিক কৌশল জোরদার করতে বাধ্য করছে।

সিরিয়ার সঙ্গে ইরাকের প্রায় ৬০০ কিলোমিটার (৩৭৫ মাইল) সীমান্ত রয়েছে। ফলে ইরাক সিরিয়ার কুর্দি জনবসতি অধ্যুষিত অঞ্চলকে দূরবর্তী বা প্রান্তিক হিসাবে বিবেচনা করতে পারে না। বরং কৌশলগত বাস্তবতা অনুযায়ী এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ইরাকে কুর্দিদের একটি বড় জনসংখ্যা রয়েছে এবং তারা ইতোমধ্যেই উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সরকার পরিচালনা করছে। সে ক্ষেত্রে সিরিয়ার কুর্দিরা তাদের নিরাপত্তার জন্য ইরাকের এই অঞ্চলকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে সমস্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে ইরাক নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন সেনারা তাদের কাছে বন্দি থাকা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) শত শত পুরুষ ও নারী সদস্যকেও সেখানে নিয়ে যাচ্ছেন। এই বন্দিদের মধ্যে বিদেশিরা ছাড়াও পিকেকের সঙ্গে যুক্ত কুর্দিরাও রয়েছেন। সিরিয়া থেকে ইতোমধ্যেই ৫ হাজার ৭০০-এর বেশি আইএস বন্দি ইরাকে স্থানান্তর করা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা সাত হাজার অতিক্রম করতে পারে।

এসব ঘটনা বাগদাদকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং সিরিয়ার ব্যাপারে তার কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। কারণ সিরিয়ায় কুর্দি ইস্যুর নিষ্পত্তি নীরবভাবেই ইরাকের হিসাবনিকাশ পরিবর্তন করছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইরাক সরকার বাধ্য হচ্ছে তার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নতুনভাবে সাজাতে।

দামেস্কের ক্ষমতা একত্রীকরণ

সিরিয়ার সরকার এবং ওয়াইপিজির মধ্যে জানুয়ারিতে হওয়া সমঝোতা দেশটিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একত্রীকরণ কাঠামোর অধীনে ওয়াইপিজির সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের মধ্যে একীভূত হবে, যার মধ্যে কুর্দিদের তথাকথিত স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই প্রক্রিয়াটি দেশের সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতি প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা সরকারের দৃঢ় ইচ্ছার প্রতিফলন। এর মূল লক্ষ্য হলো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ওয়াইপিজির স্থানীয় শাসন কাঠামোকে ধীরে ধীরে দুর্বল করা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করা।

ইরাকের দুর্বলতা

এসব ঘটনা ইরাকের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইরান-মার্কিন উত্তেজনা এখনো তুঙ্গে এবং ইরাকে নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার গঠন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে পরিস্থিতি এখনো ঘোলাটে। চলমান এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কুর্দি ইস্যুতে বাগদাদের সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতাকের সীমিত করে রেখেছে। এছাড়া ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়ারাও দেশটিতে উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো সময়।

২০২৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার কথা রয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে আনার প্রদেশের আইন আল-আসাদ বিমান ঘাঁটি ইরাকিদের কাছে হস্তান্তর করেছে, যা ১৭ জানুয়ারিতে সম্পন্ন হয়। এটি ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করলেও, নতুন সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতাও তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সিরিয়া থেকে উদ্ভূত নতুন নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য ইরাক সরকারের প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি।

মুক্তাদা আল-সদর বলেছেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের শক্তিগুলোকে এমন কোনোভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে ইরাক করেছেন।

ইরাকি কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (কেডিপি) নেতা মাসুদ বারজানিসহ অন্য রাজনৈতিক নেতারা ওয়াইপিজির মাধ্যমে কুর্দি প্রভাব জোরদার করতে এই ইস্যুটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে সিরিয়ার সরকার ও কুর্দিদের মধ্যে সমঝোতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই ইস্যুর প্রভাব সীমিত থাকবে।

তারপরও ইরাক সরকারের কাছে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। সিরিয়া সরকার তার সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে ইরাককে আশ্বস্ত করেছে। ফলে সিরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বৃদ্ধি করা ইরাকের জন্য আবশ্যিক কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে। ইরাক যে শুধু আইএসের দিক থেকেই হুমকির সম্মুখীন হবে, তা নয়, ওয়াইপিজি সন্ত্রাসীদের হুমকিও মোকাবিলা করতে হবে।

কারণ, ওয়াইপিজির সন্ত্রাসীরা এখন সিরিয়া থেকে ইরাকের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে ইরাকের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কর্মকাণ্ডও দেশটিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। সব মিলিয়ে ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে, যা মোকাবিলার জন্য সিরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নানা পক্ষ ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

অবশ্য ওয়াইপিজি-দামেস্ক চুক্তির পর সীমান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে ইরাক। ইরাকি গোয়েন্দা প্রধান হামিদ আল-শাত্রি বলেছেন, গত বছর সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের সংখ্যা ২,০০০ থেকে বেড়ে ১০,০০০ হয়েছে, যদিও এই পরিসংখ্যান যাচাই করা কঠিন। তবে, এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে, ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী প্রদেশ এবং নগর কেন্দ্রগুলোয়, যা জঙ্গিদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

আইএস বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তর দেশটিতে অতিরিক্ত আইনি এবং পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। সিরিয়া থেকে যেসব বন্দিকে ইরাক গ্রহণ করেছে, তাদের নিজ দেশে পাঠানোর কাজটি খুব সহজ হবে না। ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বন্দিদের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ এসব বন্দির মধ্যে ৬১টি দেশের নাগরিক রয়েছে।

সিরিয়া সরকারের সারা দেশে কর্তৃত্ব সংহত করা এবং ওয়াইপিজির সঙ্গে চুক্তির বাস্তবায়ন যে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তা ইরাক এককভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বন্দি স্থানান্তর এবং বিদেশি জঙ্গিদের, বিশেষ করে পিকেকে এর সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে কী করা হবে, তার সমাধানে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এসব চ্যালেঞ্জকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য ইরাককে কূটনীতি, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং আইনি কাঠামোকে সমন্বিত করতে হবে।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে ইরাকের সামনে এখন যে বিকল্প রয়েছে, তা হলোÑনিজেদের সীমান্ত অঞ্চল স্থিতিশীল করা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সিরিয়াকে একটি ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে পাশে নেওয়া। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকির এ সময় সিরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ইরাকের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য।

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন