বাংলাদেশ সরকারের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা লাভের একমাত্র মাধ্যম নির্বাচন। আর এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন সর্বগ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন, যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ যাতে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না পায়। রাখতে পারে অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস। নির্বাচন কমিশন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই হয়, অত্যন্ত স্পর্শকাতরও বটে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও রাজনীতি ঘিরে সৃষ্টি হয়েছিল নতুন স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষার। রাষ্ট্র সংস্কার হবে। পরিবর্তন হবে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির। নতুন বন্দোবস্তে আবির্ভূত হবে দেশের রাজনীতি। আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ ও গণতন্ত্র দেখবে আলোর মুখ। কায়েম হবে একটি ইনসাফের বাংলাদেশ। যার মধ্য দিয়ে মূল্যায়িত হবে হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগ। তাই মানুষের অধিকার আদায়ের প্রথম ধাপ হিসেবে বেছে নেওয়া হয় নির্বাচন। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে পরপর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের তিনটি নির্বাচনই ছিল প্রহসন ও প্রতারণার। এর আগে এক-এগারো সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটিও ছিল পাতানো। তাই স্বভাবতই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণভোটও হবে একই দিনক্ষণে। জুলাই সনদের ভবিষ্যৎও নির্ভরশীল এই নির্বাচনের ওপর। ফলে এই নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবার জন্য সমতল রাখতে হবে নির্বাচনি খেলার মাঠ। আর এ কাজটি মূলত করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন পরিচালনা একটি টিমওয়ার্ক। যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। নির্বাচনের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।
বিগত দুই দশকে চারটি নির্বাচনের জন্য গঠিত কমিশন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা প্রদর্শনে। প্রশ্ন উঠেছে নাসিরউদ্দিনের বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়েও। ইতোমধ্যেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ। এসব নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজ থেকেই বলছেনÑ‘এবার পাতানো নির্বাচন হবে না’। এ যেন ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না। তবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা নির্বাচন প্রকৌশল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে ব্যাপক। ফ্যাসিস্ট আমলে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করা হয় ১৫৩টি আসনে। বাকি ১৪৭টি কেন্দ্রে সম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন ছিল বলে ফল সাজানো হয় সুপরিকল্পিতভাবে। আওয়ামী লীগের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল। ২০১৮ সালে দিনের ভোট হয় রাতে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় সিল মেরে রাখা হয় ব্যালট পেপারে। অনেক কেন্দ্রে ভোট পড়ে ১০০ শতাংশের বেশি। ২০২৪ সালে ডামি ভোট হয়েছে। ভিন্নমাত্রার নির্বাচন প্রকৌশল ছিল ২০২৪ সালে। বিএনপিসহ বিরোধী দল অংশ নেয়নি এই নির্বাচনে। ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে অপকৌশল গ্রহণ করা হয় নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার।
পরপর তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই অনিয়ম করে অভিনব পরিকল্পনায় জেতানো হয় সরকারি দল আওয়ামী লীগকে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয় প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে। আর এসব কথা বলা হয়েছে ওই বিতর্কিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। নির্বাচনি এই অনিয়মে জড়িত ছিলেন কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ সময় প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আওয়ামী লীগকে জেতাতে। প্রতিবারই পাল্টানো হয়েছে নির্বাচনের ধরন ও কৌশল। প্রতিটি নির্বাচনই ছিল ভিন্ন ধাঁচের। একতরফা এবং অনিয়মের এসব নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হয়েছে যথারীতি। জনগণের ভোটের অধিকার ভীষণভাবে খর্ব করা হয় জনগণের অর্থ অপচয় করে, যা দুর্বল ও কলুষিত করে দেয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অসাংবিধানিক বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে ভিত রচনা করেন কলুষিত তিনটি নির্বাচনের। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মৃত্যুর এটি ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। জাতীয় সংসদের এসব নির্বাচন ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয় দেশে এবং বিদেশে। নির্বাচনের ইতিহাসে রচনা করে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের।
এর আগে ২০০৮ সালে এক-এগারোর মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন গংয়ের আমলে নবম সংসদ নির্বাচনের প্রকৌশল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারচুপির। এই নির্বাচনে তৎকালীন সরকার কৌশলে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করে আওয়ামী লীগকে। নির্বাচনের আগেই কৌশলীরা এক-তৃতীয়াংশ আসনের ফল নিশ্চিত করে শিকেয় তুলে রাখে দলটির জন্য। বাকি আসনগুলোয় পছন্দমতো প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করে। এই নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসন দেওয়া হয় বিএনপিকে। আওয়ামী লীগকে জয়ী করার একমাত্র এবং প্রধান কারণ ছিল মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনদের দায়মুক্তি এবং ভারতীয় আধিপত্যের প্রতি নতজানুতা প্রদর্শন। বাংলাদেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ভিত তৈরি হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সেভাবেই তারা কৌশল ও ছক আঁটে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে। বিনিময়ে শেখ হাসিনার কাছ থেকে গ্যারান্টি আদায় করে নেন নিরাপদ প্রস্থানের। প্রহসন ও কারচুপির নির্বাচন নিয়ে দেশে এক ধরনের বয়ান চালু আছে। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সহি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে নবম সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নবম সংসদ নির্বাচন ছিল পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, সাজানো ও প্রহসনের। এক-এগারো সরকার এজন্য কাজে লাগায় সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে। বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী মোটেও আঁচ করতে পারেনি বিষয়টি। এরপর থেকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির কবল থেকে নিজেদের আর মুক্ত করতে পারেনি বিএনপি। সে সময় দলটির বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া। তা না হলে ভিন্ন হতো রাজনীতির চিত্র।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশন কতটা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারবে?
এক-এগারোতে নাকি নির্বাচনের ফল নির্ভরশীল ছিল মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনদের দায়মুক্তির ওপর। একই কায়দায় ইতোমধ্যে নাকি অনেকটা ফয়সালাও হয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে। ফ্যাসিস্ট আমলে গুম, খুন, অপহরণ, হত্যা, নির্যাতনকারীদের ওপর ঝুলছে বিচারের খড়গ। সামরিক, বেসামরিক আমলা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরাসহ বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকায় উঠে আসছে আরো অনেকের নাম। পর্যায়ক্রমে তারা অন্তর্ভুক্ত হবেন আসামি হিসেবে। এসব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপেক্ষা করছে গুরুদণ্ড। যেকোনো মূল্যে এসব থেকে দায়মুক্তি চান তারা। এ জন্য নির্বাচন হচ্ছে উত্তম সুযোগ। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোনো রাজনৈতিক দল যদি ভবিষ্যতে সরকার গঠন করে এবং দায়মুক্তির বিষয়টিই সুনিশ্চিত করে, তাহলে তাদেরই জয়। ফলে যারা দায়মুক্তি চান, তারা নির্বাচনে কাজ করবে দলটির জন্য। এমনটি হলে পুরো বিষয়টিই হবে আত্মঘাতী, যা ধ্বংস করে দেবে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে। দায়মুক্তি নয় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাই হলো নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের একমাত্র অঙ্গীকার। কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রতি অনুরাগ বা আনুগত্য প্রকাশের দায় বর্তায় না সরকারের ওপর। ইতিহাস বড় নির্মম। অতীতে দায়মুক্তি পেয়েও স্বদেশ ও স্বজনের কাছে ফিরতে পারছেন না মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন গং। এছাড়া অবৈধ নির্বাচনে সহায়তাদানকারী নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই করুণ এবং কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে পরে।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিচারপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি নূরুল ইসলাম। ৮৬ সালের ৫ মে তৃতীয় সংসদ এবং ৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে বিচারপতি এ টি এম মাসউদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। ৯১-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিচারপতি আবদুর রউফ, ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি এ কে এম সাদেক। ৯৬-এর ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন মো. আবু হেনা। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন আবু সাঈদ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিচারপতি এমএ আজিজকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পর দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এমনটি অতীতে দেখা যায়নি। সিইসি হিসেবে ড. হুদার দায়িত্ব অতীতের যেকোনো সিইসির চেয়ে অনেক বেশি। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন রকিবুদ্দিন, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন নূরুল হুদা এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কমিশনার ছিলেন হাবিবুল আওয়াল। নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত প্রহসনের চারটি নির্বাচনের মূল কারিগর ছিলেন এসব নির্বাচন কমিশনার ও তাদের সহযোগীরা। জনগণের ভোটাধিকার হরণের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না তারা।
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

