প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক সাধারণত জটিল হয়। ভারত আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কথাটা খুবই সত্যি। দুদেশের অনেক কিছুই অভিন্ন। দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে দুদেশের। রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন। ইতিহাস আর ভাষারও মিল রয়েছে তাদের। তারপরও দুদেশের সম্পর্কটা এখন একটা সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বাদানুবাদ হিসেবে যেটা শুরু হয়েছিল, সেটা এখন বড় ধরনের কূটনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। এই লড়াইটা এমনকি খেলার মাঠ পর্যন্ত গড়িয়েছে এখন।
সমস্যার শুরু বছরখানেক আগে। বাংলাদেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন শেখ হাসিনা। নয়াদিল্লির সরকারের সঙ্গে তার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভারত তাকে জোরালো সমর্থন দিয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভ আন্দোলন দানা বাঁধে। বাংলাদেশের জনগণ তার শাসনকে স্বৈরাচারী আখ্যা দেয়। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয় শিক্ষার্থীরা, তরুণরা। এই আন্দোলনকারীরাই একপর্যায়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। দেশ ছেড়ে পালান শেখ হাসিনা। নিরাপত্তার জন্য ভারতে আশ্রয় নেন তিনি।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক উত্তেজনা পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ফেরত নিতে চায়। কৃতকর্মের জন্য দেশে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় তারা। ভারত তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে। ভারতের এই অস্বীকৃতি বাংলাদেশের বহু মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাদের মনে হয়েছে, বাংলাদেশ যাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভ থেকে প্রকাশ্যে ভারতের সমালোচনা করা হয়েছে।
পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন উভয় পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। নয়াদিল্লি অভিযোগ করে ঢাকা কড়া বিবৃতি দিচ্ছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগও জানিয়েছে ভারত। এসব উত্তেজনার কারণে চট্টগ্রামে ভিসা ইস্যু করাও বন্ধ করেছে ভারত। তারা বলেছে, তাদের মিশনকে হামলার টার্গেট করা হয়েছে। বাংলাদেশ জবাব দিতে সময় নেয়নি। তারাও ভারতীয়দের ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছে। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের সামনে হিন্দু ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিক্ষোভের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঢাকা।
এখন সংঘাতটা খেলার মাঠেও গড়িয়েছে। দুদেশের জন্য বিষয়টা যথেষ্ট স্পর্শকাতর। দক্ষিণ এশিয়া ক্রিকেট অনেকটা ধর্মের মতো। ভারতে ডানপন্থি গ্রুপগুলো বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। সেই সূত্রে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই লিগ বেশ বিখ্যাত এবং টাকাপয়সার ছড়াছড়িও রয়েছে এখানে বেশি। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। তারা ঘোষণা দিয়েছে আগামী মাসে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশের জাতীয় দল। তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আবেদনও করেছে, যাতে তাদের ম্যাচগুলো অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া হয়। এটাকে এক হিসাবে খেলা বয়কটও বলা চলে।
এই সম্পর্ক মেরামত করা একটি কঠিন হয়ে উঠেছে কেন? উত্তরটা রয়ে গেছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে। দুদেশেই নির্বাচন আসছে সামনে। ভারতে সরকার দেখাতে চায়, তারা শক্তিধর বৈশ্বিক শক্তি। প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেক পরিবর্তনকেই ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে ভারত। শ্রীলঙ্কা আর নেপালেও রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন। আঞ্চলিক পরিসরে প্রভাব বিস্তারের জন্য তাদের আবার চীনের বিরুদ্ধেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি খানিকটা বিশৃঙ্খল। শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। ক্ষমতার শূন্যতার কারণে ঘটছে এটা। চরমপন্থি শক্তিগুলো আরো সক্রিয় হয়ে উঠছে। দেশ খানিকটা পরিচয় সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতকে সন্দেহজনক বন্ধু হিসেবে দেখেছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের ব্যাপারে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল ভারত। অনেক বছর ধরে দুদেশের মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। পণ্য পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ ভারতের বন্দর ব্যবহার করেছে। কিন্তু ভারত সম্প্রতি এই চুক্তি বন্ধ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের মতো নয়। ভারত নিয়ে তারা ভিন্নভাবে চিন্তা করে। শেখ হাসিনাকে তারা স্বৈরশাসক হিসেবে দেখেছে। তারা বিশ্বাস করে তাকে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করেছে ভারত। হাসিনার শাসনামলে যারা তার সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছিল, তাদের অনেককেই জেলে যেতে হয়েছে। অনেককে গুম করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যখন চূড়ান্ত বিক্ষোভ হচ্ছিল, তখনো প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত সহায়তা দিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতকে দায়ী করেছে তরুণ জনতা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ রকম অজনপ্রিয় একজন নেতার অতি ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে ভারত বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস হারিয়েছে।
বাংলাদেশে নির্বাচন হবে ফেব্রুয়ারিতে। শেখ হাসিনার দলকে কার্যত এই ভোট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন অনেক প্রার্থীই ভোট পাওয়ার জন্য ভারতবিরোধী মনোভাবকে ব্যবহার করছে। ভারত কীভাবে তাদের দেশে হস্তক্ষেপ করেছে, সেটি নিয়ে কথা বলছে তারা। এই মনোভাবের সঙ্গে কখনো কখনো ধর্মীয় চরমপন্থাও মিশে থাকে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী নেতা হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি একজন বিখ্যাত মানুষ। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। একটা কঠিন পরিস্থিতিতে আছেন তিনি। যে বিক্ষোভকারীরা তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তাদের অবশ্যই খুশি রাখতে হয় তাকে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে একটা কাজের সম্পর্কও বজায় রাখতে হয়। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে বলেছিলেন তিনি। ভারতকে এটাও বলেছিলেন, যাতে হাসিনার দলের সদস্যরা ভারত থেকে রাজনীতি করতে না পারে। এসব অনুরোধের কোনোটাই রাখেনি ভারত।
ভারতে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাপারে খুবই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাকে চরমপন্থিদের অনুরাগী হিসেবে উল্লেখ করছে তারা। তাদের দাবি, হিন্দুদের সুরক্ষায় তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না। বাংলাদেশের নেতারা এসব দাবি অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, সহিংসতা সবাইকেই আক্রান্ত করেছে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে করেনি। তারা পাল্টা অভিযোগ করেছেন, ভারত রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য এই ঘটনাগুলো ব্যবহার করে। তারা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভারতেও হামলার শিকার হচ্ছেন। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারকে খারাপ হিসেবে তুলে ধরতেই ভারতীয় মিডিয়া মিথ্যা ছড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের হিন্দুদের ইস্যুটি ভারতের নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের দুটো রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ আর আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে। এই রাজ্যগুলোর জনসংখ্যা ১৪০ মিলিয়নের মতো। এই দুই রাজ্যের নির্বাচনও শিগগির হবে। সেখানকার রাজনীতিকরা সমর্থন আদায়ের জন্য এই সংঘাতকে ব্যবহার করছেন। এক নেতা এমনকি এটাও বলেছেন, ভারতের উচিত বাংলাদেশকে একটা শিক্ষা দেওয়া। এটাকে তারা গাজাযুদ্ধের সঙ্গেও তুলনা করেছে। নেতাদের এ ধরনের কথাবার্তা কূটনীতিকে আরো কঠিন করে তুলছে।
এসব শোরগোলের মধ্যেও কিছু মানুষ সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত অপেক্ষা করছে কখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হবে। ভারত এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ভালো করবে বলে অনেকের ধারণা। অতীতে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো যায়নি। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ঢাকা গিয়েছিলেন। বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতা খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে অংশ নিতে গিয়েছিলেন তিনি। তার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গেও দেখা করেছেন জয়শঙ্কর। মজার ব্যাপার হলো, এই সফরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেননি তিনি।
বাংলাদেশে আরেকটি গ্রুপ হলো জামায়াতে ইসলামী। তারা একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় দল। তারা আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এই গ্রুপের ব্যাপারে ভারত খুবই উদ্বিগ্ন। একসময় ভারতীয় মিডিয়া বিএনপি আর জামায়াত উভয়কেই চরমপন্থি বলেছে। সম্প্রতি, তাদের ক্ষোভের একক লক্ষ্য হয়ে উঠেছে জামায়াত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পরিবর্তনটা অনেক গভীর এবং পুরো নতুন প্রজন্ম এর সঙ্গে জড়িত। মাত্র আগামী কয়েক মাসের দিকে তাকিয়ে থাকলে ভারতের হবে না। আগামী কয়েক বছরের কথা তাদের ভাবতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন, ধর্মীয় দলগুলোও একসময় সরকার গঠন করতে পারে। যে প্রতিবেশী তাদের পরিবর্তন বদলে ফেলছে, তাদের সঙ্গে কীভাবে লেনদেন করতে হবে, ভারতকে সেটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সামনের পথটা সহজ নয়। বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য দুদেশেরই একে অন্যকে প্রয়োজন। তবে এই মুহূর্তে ক্ষোভ আর রাজনীতি পথ আটকে রেখেছে। আসন্ন নির্বাচনে অনেক কিছু নির্ধারিত হবে। ততদিন পর্যন্ত সম্পর্কটা নড়বড়ে আর উত্তেজনাপূর্ণই থাকবে। বিশ্ব নজর রাখছে এই দুই পুরোনো বন্ধু আবার শান্তি ফিরে পায় কি না এবং দুইয়ের বিভেদ আরো বড় হয়ে ওঠে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

