আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সার্ক গঠন জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা

সৈয়দ আবদাল আহমদ

সার্ক গঠন জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা
সৈয়দ আবদাল আহমদ

আজ ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৬ সালের এই দিনে তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ এবং মাতা জাহানারা খাতুন (ডাক নাম রানী) গৃহিণী এবং রেডিওতে নজরুল সংগীতের শিল্পী। জিয়াউর রহমানের ডাকনাম কমল। জিয়াউর রহমান ছিলেন পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। বড়ভাই রেজাউর রহমান ছিলেন একজন নেভাল ইঞ্জিনিয়ার, ডাক নাম বকুল। অন্য ভাইয়েরা হলেন খলিলুর রহমান, মিজানুর রহমান এবং আহমেদ কামাল। তারা কেউই এখন বেঁচে নেই।

ইঞ্জিনিয়ার রেজাউর রহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। তিনি আমাকে জিয়াউর রহমানের ছোটবেলা নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। বয়সে জিয়াউর রহমানের চেয়ে তিনি দুবছরের বড় ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতার হেয়ার রোডে তাদের শৈশবের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে। রেজাউর রহমান তার ভাইয়ের ছোট বেলার স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘কমল শৈশব থেকেই ছিল অত্যন্ত শান্ত, লাজুক, অন্তর্মুখী এবং নিয়মানুবর্তী। সে ছিল স্বল্প আহারী। আমরা দুই ভাই একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম। গান্ধী-জিন্নাহ-নেহরুর মতো রাজনীতির বড় বড় নেতারা কলকাতায় এলে কমল তাদের বক্তব্য শুনতে যেত। ১৯৪০ সালে জাপানি বিমান হামলার আশঙ্কায় বাবা আমাদের গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় পাঠিয়ে দেন। ফলে শৈশবের একটি বড় অংশ বগুড়ার বাগবাড়িতে গ্রামীণ পরিবেশে কেটেছে যা আমাদের বিশেষ করে কমলের পরবর্তী জীবনের সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসার ভিত্তি তৈরি করেছিল। কমল আর আমি গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম, কৃষক কীভাবে ক্ষেতে ধান বুনে, চারা লাগায় সেসব আমরা দেখতাম। বন্যা হলে আমরা সেই পানিতে মাছ ধরতাম। পুঁটি মাছের লাফালাফি কমলকে খুব আনন্দ দিত। রেজাউর রহমান আরো বলেন, ছোটবেলা থেকেই কমলকে দেখেছি দেশমাতৃকার প্রতি গভীর টান। দেশকে নিয়ে কারো তুচ্ছতাচ্ছিল্য সে সহ্য করতে পারত না। পাকিস্তানের কাকুলের মিলিটারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে এক ক্যাডেট বাংলাদেশ সম্পর্কে কটু মন্তব্য করায় কমল তাকে ঘুষি মেরেছিল। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে যুদ্ধের নেতৃত্বদান, সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন এবং দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাকে জনগণ দেখেছে কতটা দেশপ্রেমিক সে। তার কাছে দেশের স্বার্থ ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। দেশের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে সে কখনো আপস করেনি। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, তদবির ও বিলাসিতাকে কমল খুব অপছন্দ করত। এজন্য আমরাও পারিবারিক সম্পর্কের বাইরে রাষ্ট্রীয় বা রাজনীতির বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো কথা বলতাম না এবং তাকে তার মতো করে দেশসেবা করার সহযোগিতা করেছি। বিদেশ থেকে ঢাকায় এলে তার সঙ্গে কখনো দেখা হতো, কখনো হতো না। সেই দেখা-সাক্ষাৎ থাকত একান্তই ঘরোয়া পরিবেশে বাসায়, তার অফিসে আমরা যেতাম না।’

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক। তিনি যখন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছিলেন তখন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দিশিবিরে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে উল্লেখ আছে, ১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট জিয়াউর রহমান রণাঙ্গন থেকে পাকিস্তানি মেজর জেনারেল জামশেদকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি তার বন্দি স্ত্রী খালেদা জিয়াকে সসম্মানে রাখার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার স্ত্রী খালেদা জিয়া আপনার হেফাজতে আছে। তার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ করবেন, নতুবা মনে রাখবেন একদিন আমি আপনার জন্য আসব এবং আপনাকে হত্যা করব।’ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন খালেদা জিয়াকে রাজনীতির বাইরে রাখতে পছন্দ করতেন জিয়া। তিনি তার স্ত্রীকে একজন আদর্শ গৃহবধূ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন এবং খালেদা জিয়াও তখন কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হননি। তিনি জিয়ার ইচ্ছাকেই গুরুত্ব দিতেন এবং তার সংসারে একজন সরল গৃহবধূর জীবন-যাপন করেছেন। খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণেও এসব কথা উঠে এসেছে। জিয়াউর রহমান চাইতেন তার ছেলেরা সুশিক্ষিত এবং দেশপ্রেমিক হয়ে গড়ে উঠুক। নিজের পুরোনো প্যান্ট বা শার্ট কেটে ছোট করে তাদের পরতে দিতেন। মাসিক বেতনের টাকাটা স্ত্রী খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দিতেন সংসার চালানোর জন্য। জিয়ার মৃত্যুর পর টিভি ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, খালেদা জিয়া বলছেন, ‘আমাকে প্রেসিডেন্ট সাহেব তার মাইনা থেকে ২ হাজার ২শ টাকা দিতেন। এ দিয়েই আমি সংসার চালাতাম।’ খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে অন্তত ১৫ হাজার জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন। সেই জনসভাগুলো ছিল আন্দোলনের সময়, নির্বাচনের সময় এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সারা দেশে সফরকে ঘিরে। জনসভায় জিয়াউর রহমানের আদর্শের কথা বলতে গিয়ে তিনি তার একটি উক্তি মনে করিয়ে দিতেনÑ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’

তারেক রহমানের চোখে জিয়াউর রহমান

বাবা জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। প্রথম জীবনীগ্রন্থ ‘নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া’ বইটি লিখতে গিয়ে কয়েকবার বিভিন্ন বিষয়ে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার আমার সুযোগ হয়েছে। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি দল চালাতে গিয়ে তারেক রহমান তার পিতা এবং নেতা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তারেক রহমান মনে করেন, জিয়াউর রহমান কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘গণতন্ত্রের প্রতীক।’ তিনি বিশ্বাস করেন, তার পিতা দেশে গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এবং দেশের জন্য কাজ করতে গিয়েই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার মতে জিয়াউর রহমান শখের বসে নয়, বরং দেশের প্রয়োজনে এবং বিরাজমান পরিস্থিতির দাবিতেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি তার পিতা জিয়াউর রহমানকে তিনটি প্রধান ভূমিকায় মূল্যায়ন করেনÑএকজন দেশপ্রেমিক সৈনিক, স্বাধীনতার ঘোষক এবং একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিনি মনে করেন, জিয়াউর রহমান কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতি করেননি, বরং তিনি তৃণমূলের মানুষের কাছে গিয়েছেন, তাদের সমস্যা শুনেছেন এবং তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে আধুনিক বাংলাদেশের অগ্রদূত এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে বিবেচনা করেন। ১৭ বছর লন্ডনের নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে তারেক রহমান পরদিন বাবার মাজার জিয়ারত করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

জিয়াউর রহমান ছিলেন এ দেশের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। দেশ ও মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের জন্য ইতিহাসের পাতায় তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান, পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া, কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাতে দেশব্যাপী ‘খাল খনন’ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠন, গার্মেন্ট শিল্প গড়ে তোলা এবং বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ, গ্রাম সরকার এবং তৃণমূল উন্নয়ন, বাংলাদেশের স্বার্থকে তুলে ধরতে দেশের পরিচয় সুনির্দিষ্ট করতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা প্রবর্তন এবং গণমুখী রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠা ছিল জিয়াউর রহমানের সেরা কাজ।

সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি জিয়াউর রহমান

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বা সার্ক (SAARC)-এর মূল ধারণাটি ছিল জিয়াউর রহমানের। বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে তার দূরদর্শী কূটনৈতিক চিন্তার ফসলই হলো সার্ক। এজন্য তিনি সার্কের মূল ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ বা ‘স্থপতি।’

আশিয়ান (ASEAN) জোটের আদলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি জোট গড়ার প্রয়োজনীয়তা জিয়াউর রহমান প্রথম অনুভব করেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তিনি ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল সফর করে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৯৮০ সালের ২ মে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ তথা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কাছে একটি ঐতিহাসিক চিঠি পাঠান। এই চিঠিতে তিনি এই অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করেন। দেশগুলোতে তিনি তার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল হককে পাঠান। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এবং নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রমের সঙ্গে সার্ক নিয়ে তার নিবিড় আলোচনা হয় যা জোট গঠনের পথ প্রশস্ত করে। শুরুতে ভারত ও পাকিস্তান কিছুটা সংশয়ে ছিল। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সার্ক গঠনে সন্দিহান ছিলেন। তিনি এটাকে ভারতের উপর ছোট দেশগুলোর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে মনে করেছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান তার দৃঢ় কূটনীতির মাধ্যমে তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সামগ্রিক স্বার্থেই গঠিত হচ্ছে সার্ক। শেষ পর্যন্ত সার্ক গঠনের উদ্যোগে তারা সবাই রাজি হন। সার্কের কর্মসূচি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে সহযোগিতা। জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে শাহাদত বরণ করার কারণে সার্কের গঠন দেখে যেতে পারেননি। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

আজ যখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে, তখন তার এই দূরদর্শী উদ্যোগের কথা বার বার মনে হচ্ছে। সার্কের বয়স আজ ৪০ বছর হয়েছে। ১৯৮৫ সালের ৭-৮ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হয়। এ সম্মেলন ঢাকায় তিনবার হয়েছে। ২০১৪ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের পর আর কোনো নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন হয়নি। সে অনুযায়ী ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে না। ২০১৬ সালে পাকিস্তানে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার কারণে সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায় এবং এখন পর্যন্ত সম্মেলনটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সার্ক পুনরুজ্জীবনের জন্য বিশ্বমঞ্চে সার্কের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। কিন্তু ভারতের তীব্র অনীহার কারণে তার উদ্যোগটি সফল হচ্ছে না।

আগেই বলেছি, সার্কের স্থবিরতার প্রধান কারণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বৈরিতা। ২০১৬ সালে উরি হামলার পর ভারত পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত।

ভারত বর্তমানে সার্কের চেয়ে বিমসটেক বা বিবিআইএন-এর মতো জোটগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে পাকিস্তান নেই। অথচ দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল। এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। যৌথভাবে কাজ করলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দারিদ্র্য বিমোচন সহজ হতো। সাপটা পুরোপুরি কার্যকর হলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা পাওয়া যেত যা নিত্যপণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করত। রেল, সড়ক ও নৌপথে আঞ্চলিক, যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটত। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ এবং ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাস বা গ্রিড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সংকট দূর হতো।

সার্ক নেতাদের মূল্যায়নে জিয়া

ভারতের মনোভাব ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে কোনো বিরোধ থাকলে তা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। সার্কের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো চলে আসার সম্ভাবনা নিয়ে তাই ইন্দিরা গান্ধীর একটি উদ্বেগ ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধীকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর ইন্দিরা গান্ধী যে শোকবার্তা দেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেন যে, সার্ক গঠনের ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের প্রস্তাব তার ‘দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি’ ছিল যা প্রশংসাযোগ্য। শেষ পর্যন্ত ভারতের সম্মতিতে ১৯৮৫ সালের ৭-৮ ডিসেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে সার্কের যাত্রা শুরু হয়। সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে চার্টার স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারত সার্ক গঠনের চূড়ান্ত সম্মতি দেয়। এর আগে অবশ্য ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের প্রথম বৈঠকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণে রাজি হয়।

১৯৮৫ সালে সার্কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সার্ককে ‘একটি বিশ্বাসের কাজ’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি ‘আঞ্চলিক পরিচয়’ তৈরি করবে। ইন্দিরা গান্ধীর আগের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী রাজীব গান্ধী দ্বিপক্ষীয় বিরোধগুলো সার্কের মূল আলোচনার বাইরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাধা না হয়।

১৯৮৫ সালে সার্কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজীব গান্ধী সার্ক প্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমানের অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে তার মায়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান এক্ষেত্রে ‘একজন দূরদর্শী’ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি সহযোগিতামূলক ফোরাম তৈরির স্বপ্নের জন্য জিয়াউর রহমানের অবদান প্রশংসাযোগ্য।

সার্কের উদ্বোধনী শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ জুলিয়াস আর জয়বর্ধনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘জিয়াউর রহমান সার্কের প্রধান স্বপ্নদ্রষ্টা’ বা মূল স্থপতি। তিনি উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার যে বীজ জিয়াউর রহমান বপন করেছিলেন, এই শীর্ষ সম্মেলন তারই ফসল। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যখন প্রথম আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে চিঠি পাঠান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালই সবার আগে জিয়াউর রহমানকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিলেন। সার্কের প্রথম সম্মেলনে জয়বর্ধনে সেই সাহসিকতা ও দূরদর্শী চিন্তার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে সেদিন স্মরণ করেছিলেন। জয়বর্ধনে মনে করতেন, জিয়াউর রহমানের সার্ক গঠনের উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার ছোট-বড় দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। জে আর জয়বর্ধনে সেদিন জিয়াউর রহমানকে এমন একজন নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন, যিনি দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কল্যাণে আঞ্চলিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সবার আগে অনুভব করেছিলেন।

প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের সার্ক সনদ (ঘোষণাপত্র) বা ‘ঢাকা ডিক্লারেশন’ জিয়াউর রহমান সূচিত প্রক্রিয়াকে ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করা হয়। এতে বলা হয়, জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও অগ্রগতির জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ধারণা দিয়ে গেছেন, সেটা সার্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক সার্কের মতো সংস্থা গঠনের জন্য জিয়াউর রহমানের উদ্যোগকে ‘দূরদর্শী’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তার এই উদ্যোগ একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কাঠামো গঠনে সাহায্য করেছিল।

১৯৯৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সার্কের প্রথম নারী চেয়ারপারসন হন। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সার্ক নেতারা জিয়াউর রহমানকে এই আঞ্চলিক জোটের ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ এবং ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, আশির দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার যে বীজ জিয়াউর রহমান বপন করেছিলেন, ১৯৯৩ সালের এ সম্মেলন সেই উদ্যোগের সফল ধারাবাহিকতা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ তাদের বক্তব্যে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও উন্নয়নের জন্য জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তার প্রশংসা করেন। এই অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৪ সালের সার্ক সম্মেলনে জিয়াউর রহমানকে মরণোত্তর ‘সার্ক অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনেই দক্ষিণ এশীয় মুক্ত-বাণিজ্য এলাকা বা সাপটা চুক্তির ভিত্তি রচিত হয়েছিল, যাকে নেতারা জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো সার্ক চেয়ারপারসন হন। এই সম্মেলনে সার্কের বিদায়ী চেয়ারপারসন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ জিয়াউর রহমানকে সার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিয়াউর রহমানকে মরণোত্তর প্রথম সার্ক পদক প্রদান করেন। ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে তারেক রহমান এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। এর মূল্যমান ছিল ২৫ হাজার মার্কিন ডলার, মানপত্র ও স্বর্ণপদক। এই শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংহ বলেন, জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা সার্কের ধারণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। প্রথম সার্ক পুরস্কারের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে সম্মান জানানো অত্যন্ত যথাযথ হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন