চব্বিশের বিপ্লব-পরবর্তী দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন আলোচনায় আসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক দাবির প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অচল ছাত্র সংসদগুলো চালুর উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে গত বছর পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয় পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এর চারটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। আরেকটি শেষ হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে।
দীর্ঘদিন পর ফ্যাসিবাদমুক্ত ক্যাম্পাসে নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তবে এসব ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষে যথাসময়ে পরবর্তী নির্বাচন হওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে দাবি ও আলোচনা শুরু করেছেন ছাত্রনেতারা। তাছাড়া নানা অজুহাতে আটকে থাকা চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
এদিকে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নেতারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্যাম্পাসের সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ সাড়াও ফেলেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বাধা ও অসহযোগিতার কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছাত্রসংসদগুলো জটিলতার মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত ও নেতৃত্ব তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ছাত্র সংসদ’ থাকা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে যায়। ঢাবিসহ দেশের ৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিধান চালু আছে। তবে ক্ষমতাসীনদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশের অঘোষিত কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল এই নির্বাচন।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রায় সব ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে এসব ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দাবি বেশ জোরদার হয়। তারই প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন। এতে কয়েকটি পদ ছাড়া সবটাতেই ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিতরা নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। মেয়াদ শেষে এগুলোর পরবর্তী নির্বাচনকেও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংগঠনটি। তবে এই নির্বাচন নিয়ে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। যদিও সংগঠনটি নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পক্ষে কথা বলার পাশাপাশি আগামীতে জয়লাভের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান আমার দেশকে বলেন, ছাত্রদল একটি গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠন। এর উত্থানই হয়েছে ডাকসুসহ সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদে বিপুল বিজয়ের মধ্যে দিয়ে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে সেখানে কৌশল-অপকৌশলের খেলায় আমরা পরাজিত হয়েছি। তারপরও ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল সবসময়ই নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পক্ষে। আগামীর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল নব্বইয়ের মতো নিরঙ্কুশ বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ।
ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জোরদার
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। এতে ভিপি ও জিএসসহ নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। সাদিক কায়েম ও এসএম ফরহাদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিতরা ডাকসুর দায়িত্ব নেন ১৪ সেপ্টেম্বর। নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারা এখন মেয়াদের শেষ পর্যায়ে। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কাজ করেছেন বলে দাবি সাদিক কায়েমের। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর তফসিল ঘোষণার দাবিসহ সমাপনী বক্তব্য দেবেন ডাকসুর নেতারা। তবে পরবর্তী নির্বাচনের বিষয়ে প্রশাসনের তেমন তৎপরতা না থাকায় অনিশ্চয়তা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রমতে, ডাকসু নির্বাচনের তফসিল অবিলম্বে ঘোষণাসহ চার দফা দাবি জানিয়ে গত ১২ আগস্ট উপাচার্যের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেয় ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সংগঠনটির ঢাবি সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মুহিউদ্দিন খানের নেতৃত্বে এ স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
পরে মুহিউদ্দিন খান প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ডাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বাভাবিক ও চিরাচরিত প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি।
তিনি আরো বলেন, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো ইউজিসিকে চিঠি পাঠানো হয়নি এবং ডাকসুর জন্য বাজেটও বরাদ্দ করা হয়নি। তাই দ্রুত বাজেট ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
এদিকে গত ২০ আগস্ট ডাকসুর পঞ্চম কার্যনির্বাহী সভায় পরবর্তী নির্বাচনের দাবি ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসু সভাপতি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ অন্য নেতারা।
সভায় আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য উপাচার্যের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। এ সময় উপাচার্য জানান, এ বিষয়ে প্রাথমিক সেল গঠন করা হয়েছে। দ্রুত তফসিল ঘোষণা করা হবে।
সম্প্রতি ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১১ মাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষার্থীরাই মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে এ সময়ে এমন কিছু কাজ হয়েছে, যা আগে হয়নি। আমরা প্রমাণ করেছি, শিক্ষার্থী ও ডাকসুর কাজকে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা অসহযোগিতা করে আমাদের থামিয়ে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীরা আমাদের পক্ষে যে জনরায় দিয়েছেন, আমরা তা বাস্তবায়ন করে যাব।
জাকসুর মেয়াদ শেষ ১৭ সেপ্টেম্বর
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতেও জিএসসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে জয়ী হয় ছাত্রশিবির সমর্থিতরা। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর জাকসুর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে কোনো তৎপরতা নেই। এই ছাত্রসংসদের নেতারাও প্রশাসনিক নানা জটিলতা মোকাবেলা করে দীর্ঘ ১১ মাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আমরা পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে প্রশাসনকে আহবান জানিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তাই যথাসময়ে নির্বাচন নিয়ে আমরা আশঙ্কায় আছি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দলীয় সরকার সব সময় ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করে। সর্বশেষ ছাত্রসংসদ নির্বাচনটির অবস্থাও ভালা ছিল না। আবার এ ধরনের কিছু করলে শিক্ষার্থীদের মাঝে খারাপ ম্যাসেজ যাবে। শিগগিরই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাকসু নির্বাচনের দাবি-দাওয়া উত্থাপন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে গত ১১ মাসে জাকসুর কার্যক্রমে নানা বাধা-বিঘ্নের অভিযোগ তুলে মাজহারুল ইসলাম বলেন, আমরা দুটি সরকারের প্রশাসন দেখেছি। আগের প্রশাসনের সময়ে কিছু সহযোগিতা ও কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। বর্তমান প্রশাসনেরও একই ধরনের ভূমিকা দেখছি। যে কারণে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কাজ যত দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে করা যেত, তা সম্ভব হয়নি।
২৬ অক্টোবর শেষ চাকসুর মেয়াদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সর্বশেষ নির্বাচন হয় গত বছরের ১৫ অক্টোবর। ১০ মাস পার করেছে সংসদটি। আগামী ২৩ অক্টোবর এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে চাকসু জিএস সাঈদ বিন হাবিব আমার দেশকে বলেন, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও চাকসুর সভাপতি প্রফেসর ড. আল-ফোরকানের সভাপতিত্বে পঞ্চম কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমরা পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ ও ক্যালেন্ডারে সংযুক্তির দাবি জানিয়েছি। এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে (১ সেপ্টেম্বর) সিদ্ধান্ত হতে পারে।
গত ১০ মাসে চাকসুর কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করা, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির উন্নয়নসহ নানা কাজ সফলভাবে করেছি। এছাড়া আবাসন সংকট কাটাতে দুটি হল সম্প্রসারণ, আরো দুটিতে কাজ চলছে। যাতায়াতব্যবস্থার জন্য বাস, শাটল ট্রেন সংস্কার কাজ চলছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আমরা চাকসুর ৩৫ বছরের হিসাব চেয়েও পাইনি। সিনেট মিটিংয়ে আগামী বাজেট পাসের দাবি জানিয়েছি, কিন্তু সেটাও করেনি তারা।
পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তায় রাকসু
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৬ অক্টোবর। তবে এখন পর্যন্ত পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে কোনো তৎপরতা দেখছে না সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ আমার দেশকে বলেন, আমরা পরবর্তী নির্বাচনের বিষয়ে ভিসিকে কয়েকবার বলেছি, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। শিক্ষার্থীরা চাইলে নির্বাচন দেওয়া হবে বলে ভিসি তাদের জানিয়েছেন।
ভিপি জাহিদ বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগেই পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। তাই আমরা অনিশ্চয়তায় আছি। তবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমরা এই নির্বাচনের জন্য ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করব।
এদিকে বর্তমান মেয়াদে নানা বাধা-বিঘ্ন উপেক্ষা করে কাজ চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা রাকসুর ৩৫ বছরের হিসাব চেয়ে ২০ বছরের পেয়েছি, বাকি ১৫ বছরের হিসাব এখনো পাইনি। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে এখন অনেক কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে জানিয়ে ভিপি জাহিদ আরো বলেন, রাকসুকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
যথাসময়ে নির্বাচন চান জকসু নেতারা
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন। এতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। ইতোমধ্যে সাত মাস পার করেছে বর্তমান নেতৃত্ব। সময় শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন তারা।
এ বিষয়ে জকসু জিএস আব্দুল আলিম আরিফ আমার দেশকে বলেন, আমরা দ্বিতীয় জকসু নির্বাচনের তফসিল যথাসময়ে ঘোষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দাবি জানাব। আমরা চাই, নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরবর্তী নির্বাচন হোক। তবে নানা কারণে এটা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। জকসুর কাজে প্রশাসনের অসহযোগিতা ও ছাত্রদলের অপতৎপরতার কারণে এই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুল আলিম আরিফ আরো বলেন, জকসুর কাজের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কিছু দপ্তরের চরম অসহযোগিতা পাচ্ছি। এছাড়া নির্বাচিত-অনির্বাচিত কিছু প্রতিনিধি কোনো কাজ করতেও দেয় না, সহযোগিতাও করে না। তারপরও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে মেডিকেল আধুনিকায়ন, মেডিকেল ক্যাম্প ও উচ্চ শিক্ষা ক্যাম্পসহ নানা কাজ করা হয়েছে। টার্গেট অনুযায়ী সব কাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
জবি উপাচার্য ও জকসু সভাপতি অধ্যাপক রইছ উদ্দীন জানান, জকসুর কার্যক্রমে তিনি সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছেন। পরবর্তী নির্বাচনও যথাসময়ে হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আদালতে ঝুলে আছে শাকসু নির্বাচন
দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে অচল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু)। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে সেখানে নির্বাচন হয়। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী শাকসু নির্বাচনের দাবি জোরদার হয়। সে অনুযায়ী চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় প্রশাসন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন বন্ধে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা এবং পরে আদালতে রিটের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। ইসির ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে স্বতন্ত্র এক প্রার্থী ১৮ জানুয়ারি শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট করেন। ১৯ জানুয়ারি শুনানি শেষে নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ওই দিনই আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আবেদনে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চাওয়া হয়। তবে ওই আপিলের আর শুনানি না হওয়ায় এখনো ঝুলে আছে নির্বাচনটি।
শাকসু নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে বসতে চেয়েছেন। বিষয়টি পুরোপুরি জেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা বলে পজিটিভ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করব।
ইউকসু নির্বাচনের কোনো খবর নেই
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইউকসু) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালে। সেখানে ২০০১ সালে সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মোট ২১টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ছাত্রসংসদটি অচল হয়ে আছে। ছাত্ররাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে ছাত্রসংসদ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝেও মিশ্র অবস্থান রয়েছে। যে কারণে ইউকসু নির্বাচন নিয়ে বুয়েট প্রশাসনের এখনো কোনো তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি।
২৮ বছর ধরে বন্ধ বাউকসু নির্বাচন
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ-বাকসু প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বাকসু নির্বাচন হয়েছে। এর পরে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। এখনো এই নির্বাচনের জোরদার কোনো দাবি বা তৎপরতা নেই বলে জানা গেছে।
বাকৃবি ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম সরদার বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম উন্মুক্ত নয়। সিন্ডিকেটের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটিও এখনো বহাল আছে। ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। সুযোগ তৈরি হলে বাকসু নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে না কেন? তবে এ মুহূর্তে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
গঠনতন্ত্র বিতর্কে থমকে ব্রাকসু নির্বাচন
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের তফসিল বারবার স্থগিত, পরিবর্তন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও ছাত্রদলের ব্রাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনের দাবির কারণে ছাত্রসংসদটির নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চব্বিশের ২৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শিক্ষার্থী সংসদ যুক্ত হয়। পরে নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টদের একের পর এক পদত্যাগে চারবার তফসিল দিয়েও তা হয়নি। ইতোমধ্যে নির্বাচনের জন্য শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবি জোরদার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ব্রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাসুদ রানা বলেন, জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী ব্রাকসুর তফসিল পুনরায় সচল করার জন্য গত ১৩ এপ্রিল আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। সেখানে একাংশ শিক্ষার্থী ব্রাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনের দাবি তুলেছেন। কিন্তু গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের না থাকায় আমরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি। বিদ্যমান গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে নাকি সংশোধনের পর নির্বাচন হবে শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ে একমত হতে না পারার কারণে আমরা এখনো তফসিল সচল করতে পারিনি।
ছাত্রসংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম আমার দেশকে বলেন, যেসব ছাত্রসংসদের মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছি। ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকসু নির্বাচনের জন্য শিবির প্রেস ব্রিফিং ও ভিসির সঙ্গে দেখা করেছে। তারা যথাসময়ে নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছেন। এরপরও না হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেভাবে আন্দোলন করতে হয়, আমরা সেদিকেই যাব।
তিনি আরো বলেন, সব ক্যাম্পাসেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। যেগুলো বন্ধ করা হয়েছে, সেগুলোও দিতে হবে। তবে সবটাতেই সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক ধরনের না দেওয়ার মানসিকতা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে আবার রাজপথে অথবা ক্যাম্পাসে আন্দোলন করতে হলে আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে সেটা করব ইনশাআল্লাহ।
(রিপোর্টটিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন- শাবি, বাকৃবি ও বেরোবি প্রতিনিধি)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


