ময়মনসিংহে সিটিজেন চার্টার নেই সরকারি দপ্তরে, সেবায় ভোগান্তি

ময়মনসিংহে সিটিজেন চার্টার নেই সরকারি দপ্তরে, সেবায় ভোগান্তি

জনগণের সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি দপ্তরে সিটিজেন চার্টার থাকার কথা থাকলেও ময়মনসিংহের অনেক অফিসে এর অস্তিত্ব নেই। এতে করে সেবা পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নির্ধারিত ফি, সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে—এসব তথ্য জানতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। হয়রানির পাশাপাশি বাড়ছে দালালনির্ভরতা। আবার কোথাও চার্টার থাকলেও তা নাগরিকের চোখে পড়ার মতো স্থানে নেই। ফলে নাগরিকের এই মৌলিক তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার বরাবরের মতো উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, কাস্টমস-এক্সাইজ-ভ্যাট বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস, হাসপাতালসহ অন্তত ৪০টি অফিস রয়েছে। গত কয়েকদিনে সরেজমিন ঘুরে এসব অফিসের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে সিটিজেন চার্টার পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণ মানুষের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বেশির ভাগ অফিসে চার্টার রাখা হয়নি। আবার কোথাও থাকলেও তা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিগোচর নয়। কোথাও আবার চার্টারের ওপর পড়ে আছে ধুলোবালি। যেসব দপ্তরে চার্টার রয়েছে, সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে তথ্য অসম্পূর্ণ, হালনাগাদ নয় কিংবা অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার তথ্য অনুপস্থিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিটিজেন চার্টার শুধু একটি তথ্যবোর্ড নয়, এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যকার সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতির লিখিত প্রকাশ। এই চার্টারের মাধ্যমে নাগরিক জানতে পারেন তার অধিকার, সেবা পাওয়ার শর্ত ও প্রতিকার চাওয়ার উপায়।

শুধু তাই নয়, অনেক সিটিজেন চার্টারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল নেই। এতে করে একজন নাগরিক কোনো সেবা নিতে গিয়ে কার কাছে যাবেন, কতদিনে সেবা পাবেন কিংবা সেবা না পেলে কোথায় অভিযোগ করবেন—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না।

অথচ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (সিটিজেনস চার্টার) প্রণয়ন সংক্রান্ত নির্দেশিকা, ২০১৭’-এ নাগরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ—এই তিন ধরনের সেবার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রে সেবার নাম, সেবা প্রদানের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রাপ্তিস্থান, সেবার মূল্য ও পরিশোধ পদ্ধতি, সেবা প্রদানের সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, পদবি, ফোন নম্বর ও ই-মেইল উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু ময়মনসিংহের সরকারি অফিসগুলোতে এই মৌলিক তথ্যগুলোর ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে।

নাগরিকদের ভোগান্তি

এদিকে, সিটিজেন চার্টার না থাকা ও অকার্যকারিতাকে শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন না সচেতন নাগরিকরা। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সেবা নিতে আসা ফেরদৌসি বেগম জানান, একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে তাকে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে ঘুরতে হয়েছে। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কাগজ লাগবে কিংবা কত টাকা লাগবে, তা আগে থেকে জানার কোনো সুযোগ ছিল না। অফিসে স্পষ্টভাবে চার্টার থাকলে হয়তো অনেক কম ভোগান্তি হতো।

নগরীর সিনিয়র সিটিজেন সালিম হাসান বলেন, সরকারি সেবার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অন্ধকারে রাখলে দালালনির্ভরতা ও হয়রানি বাড়ে । অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। নাগরিক জানেন না তার কাজের সরকারি খরচ কত, কতদিনে কাজ হওয়ার কথা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কে। এ কারণে সহজ একটি কাজ করতেও তাকে বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়।

সরকারি অফিসগুলো ঘুরে দেখা যায়, সিটিজেন চার্টারের অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। কারণ সরকারি সেবার নিয়মকানুন প্রকাশ্য না থাকলে একজন নাগরিককে নির্ভর করতে হয় অফিসের কর্মচারী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা দালালের ওপর। এই নির্ভরশীলতাই অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির পরিবেশ তৈরি করে।

‘চার্টারের প্রয়োজন নেই’

অনুসন্ধানকালে ময়মনসিংহ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগীয় কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, এ অফিসে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই এবং এ কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টারের প্রয়োজন নেই। ময়মনসিংহের সড়ক ভবন ও গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়েও কোনো সিটিজেন চার্টার পাওয়া যায়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি দেখা গেছে।

ময়মনসিংহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ফখরুল আলম জানান, শিক্ষা প্রকৌশল ভবনে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই। কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে তিনি ‘বড় স্যারদের’ সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিটিজেন চার্টারের মূল উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে তথ্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা। ফলে ‘বড় স্যারের’ কাছে যাওয়ার পরিবর্তে নাগরিক যেন সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সিটিজেন চার্টারের লক্ষ্য।

জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপার কার্যালয়

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নিচতলার ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মচারী আবু তাহের জানান, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই। সাধারণ জনগণ তাদের কাছে গেলে তারা কাজগুলো করে দেন। কেউ এসে সিটিজেন চার্টার খোঁজেন না বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কে কর্মরত কনস্টেবল হোসনে আরা জানান, সিটিজেন চার্টার বা নাগরিক সেবা কী—তা তিনি জানেনই না। জেলা পুলিশ কার্যালয়ে এ ধরনের কোনো বোর্ড বা ব্যানারও নেই বলে জানান তিনি।

অধিকার সম্পর্কেও অজ্ঞতা

নিয়মানুযায়ী সিটিজেন চার্টারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা বা জিআরএস। কোনো নাগরিক কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে বা সেবা পেতে অসন্তুষ্ট হলে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা (অনিক), এরপর আপিল কর্মকর্তা এবং প্রয়োজন হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনিকের কাছে অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস, আপিল কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ২০ কার্যদিবস এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৬০ কার্যদিবস নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ অফিসে সিটিজেন চার্টারই না থাকায় সাধারণ নাগরিকের এসব অধিকার সম্পর্কে অজানা রয়ে যায়।

সুশাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, সিটিজেন চার্টার শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; এটি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তাদের মতে, সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমান এবং হালনাগাদ অবস্থায় না থাকলে নাগরিকের সেবা প্রাপ্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও হয়রানির বিরুদ্ধে নাগরিকের প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), ময়মনসিংহের সভাপতি শরীফুজ্জামান পরাগ আমার দেশকে বলেন, ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন, নিয়মিত হালনাগাদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু চার্টার প্রণয়ন নয়, সেখানে উল্লেখিত সেবা, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করলেই এর সুফল পাবেন নাগরিকরা।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সিটিজেন চার্টার হলো নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের অলিখিত চুক্তি। প্রতিটি অফিসেই থাকার কথা। যেসব কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার নেই, তা মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন