নৈতিকতার সংকট, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক অবক্ষয়

আক্তার খান মুকুল

নৈতিকতার সংকট, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক অবক্ষয়
ছবি জেমিনি দিয়ে তৈরি

পরিবার সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার মানুষের নৈতিকতা শিক্ষার প্রথম সোপান। শিশুরা পরিবারে ত্রুটিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠলে সমাজে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন কারণে আজ পরিবারকেন্দ্রিক সুস্থ ব্যবস্থা হুমকির মুখে। সমাজের গতিশীলতার কারণে সমাজের উন্নয়ন, প্রগতি এগিয়ে যাবে, কিন্তু মৌলিক কাঠামোর ভিত নড়ে গেলে প্রচলিত মূল্যবোধ, আদর্শ, রীতিনীতি, আচার-আচরণ ইত্যাদির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

পুঁজিবাদী সমাজের বস্তুটাই সব। কার্ল মাক্সের মতে, একমাত্র বস্তুই সমাজের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। এমনকি মানুষের প্রেম-ভালোবাসা, আদর, স্নেহও বস্তুদ্বারা নিয়ন্ত্রিত । তবু, মানুষ সমাজের মধ্য থেকে নিজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

মানুষের জ্ঞান, সক্ষমতা দিয়ে নিজের সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে, বিশাল প্রাচুর্য তাকে কিছুটা সাময়িক স্বস্তি দেয় বটে; কিন্তু নৈতিক ও মানবিক উন্নতি ছাড়া শেষ পর্যন্ত মানসিক প্রশান্তি সে পায় না। আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতাহীন বিশাল প্রাচুর্য একসময় তাকে নীরবে গ্রাস করতে থাকে। এ প্রসঙ্গে স্টিভ জবস বলেন, ‘আমি ব্যবসায়িক সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলাম। কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে বুঝতে পারছি, যে সম্পদ ও খ্যাতি নিয়ে আমি এত গর্ব করতাম, তা এখন অর্থহীন মনে হচ্ছে । সুতরাং মানুষের নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মশুদ্ধি মানুষকে বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা জোগায়। জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসের এই বোধগম্য জীবনের সেরা অলংকার। যুগে যুগে সমাজচিন্তাবিদ, দার্শনিক, কবি ও মনীষীদের জীবনদর্শন মানুষকে বেঁচে থাকার আনন্দ, নতুন স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করে। মানুষের প্রকৃত উন্নতি শুধু অর্থ, ক্ষমতা, পার্থিব সাফল্য কিংবা জ্ঞানের দ্বারা নয়; বরং চরিত্র, আত্মসংযম, নৈতিকতা এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে-ই সফল, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে’।

সক্রেটিস জীবনবোধ সম্পর্কে বলেন, আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসাহীন জীবন অর্থহীন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন, ‘সুখ সম্পদে নয়, বরং আত্মার প্রশান্তিতে। তিনি মনে করতেন, লোভ ও অতিরিক্ত ভোগবিলাস মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে। সংযম ও নৈতিক জীবনই প্রকৃত সুখের উৎস। লিও টলস্টয় তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এ কনফেশন’-এ তিনি জীবনের অর্থ অনুসন্ধান করেছেন। ধন, খ্যাতি ও সাহিত্যিক সাফল্য পাওয়ার পরও তিনি মানসিক শান্তি পাননি। শেষে তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসে নৈতিক জীবন, স্রষ্টায় বিশ্বাস এবং মানবসেবার মাধ্যমে।

ফ্রান্সিস বেকন, জ্ঞানের গুরুত্বের কথা বললেও তিনি সতর্ক করেছিলেন, জ্ঞান যদি নৈতিকতার দ্বারা পরিচালিত না হয়, তবে তা মানবকল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তার মতে, জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিক চরিত্রের সমন্বয়ই মানবসভ্যতার অগ্রগতির ভিত্তি। কবি ও সুফি-সাধক জালালউদ্দিন রুমির দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো, আত্মশুদ্ধি ও প্রেম। তিনি লিখেছেন, ‘গতকাল আমি চতুর ছিলাম, তাই পৃথিবীকে বদলাতে চেয়েছিলাম; আজ আমি জ্ঞানী, তাই নিজেকে বদলাচ্ছি।’

ইবনে খালদুন, মনে করতেন, যেকোনো সভ্যতার উত্থান ও পতনের পেছনে নৈতিকতার বড় ভূমিকা রয়েছে। সমাজে যখন বিলাসিতা, দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতা বৃদ্ধি পায়, তখন সভ্যতার পতন শুরু হয়। কবি দান্তে দেখিয়েছেন, নৈতিক উন্নতি ছাড়া প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। মির্জা গালিবের মতে, হৃদয়ের পরিশুদ্ধতার ওপরেই নির্ভর করে মানুষের প্রকৃত মূল্য।

আল্লামা ইকবালের দর্শন অনুসারে আত্মশক্তি, আত্মমর্যাদা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগ্রত করতে পারে। শেখ সাদি শিরাজির গুলিস্তাঁ ও বুস্তাঁ নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের ভান্ডার। তিনি বলেছেন, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার চরিত্র ও মানবসেবার মধ্যে নিহিত। ইবনে রুশদ বলেছেন, সত্যিকার জ্ঞান মানুষকে নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে। জ্ঞান ও নৈতিকতা একে অন্যের পরিপূরক।

শামস তাবরিজের মতে—হৃদয়ের পবিত্রতা ও স্রষ্টার প্রতি প্রেমই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করে। তিনি মনে করতেন—অহংকার মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতা আধ্যাত্মিক উন্নতির ভিত্তি। অন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ছাড়া প্রকৃত ধর্মচর্চা অসম্পূর্ণ। তিনি আধ্যাত্মিকতার শিক্ষায় দেখিয়েছেন, আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু হলো স্রষ্টাপ্রেম।

স্রষ্টাকে শুধু বুদ্ধি দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। মানুষের অন্তরে প্রেম জাগ্রত হলে সে সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার নিদর্শন দেখতে পায়। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে আন্তরিকতা ও আত্মসমর্পণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। শামস তাবরিজ মনে করতেন, আত্মশুদ্ধির প্রধান ধাপ হলো নিজের ‘নফস’ বা খারাপ ও স্বার্থপর প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। লোভ, হিংসা, ক্রোধ ও অহংকার থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। হৃদয়কে প্রেম, ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ করতে হবে। শামস তাবরিজের শিক্ষা রুমির জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

উপরোক্ত মনীষীদের চিন্তাধারার আলোকে বলা যায় সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য শুধু বস্তুগত সমৃদ্ধি বা বাহ্যিক উন্নতিই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ। নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং আত্মশুদ্ধি—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই মানুষের সুন্দর ও সার্থক জীবন গড়ে ওঠে। জাগতিক কোলাহলে হারিয়ে না গিয়ে আত্মিক শান্তি ও সৎ জীবনযাপনের জন্য এই গুণাবলির কোনো বিকল্প নেই। নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মশুদ্ধির চর্চা কোনো এক দিনের কাজ নয়, এটি হলো আজীবন চালিয়ে যাওয়ার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। এই চর্চার মাধ্যমেই মানুষ তার জৈবিক সত্তা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবিক ও আধ্যাত্মিক সত্তায় পৌঁছাতে পারে। নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং আত্মশুদ্ধি। এগুলো শুধু ধর্মীয় আদর্শ নয়, বরং একটি সুন্দর ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতা গঠনের মৌলিক চিন্তন।

নৈতিকতাবিহীন শিক্ষা ও জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। আমাদের দেশে তার অনেক উদাহরণ রয়েছে। উচ্চশিক্ষিতদের বড় একটি শ্রেণি আজ বহুমাত্রিক অনৈতিকতায় লিপ্ত। নৈতিক ও বিশুদ্ধ চরিত্রের মানুষ তৈরিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে যদি নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিকতা, স্রষ্টাপ্রেম ও বিশুদ্ধতার চর্চা যুক্ত করা যায়, তাহলে সমাজে ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন