তিনি এলেন। ক্ষমতার মসনদে বসলেন। তিনি এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধান। ‘তিনি’ তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পরে তিনি দেশে ফিরলেন গত ডিসেম্বর মাসের পঁচিশ তারিখে। অনেক জল্পনা-কল্পনা ছিল-তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে। তার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস এই জল্পনা-কল্পনাকে আরো ঘনীভূত করেছিল। সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে তিনি এখন বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে পতিত আওয়ামী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন জনসভায় প্রায় বলতে শোনা যেত—‘আয় বেটা, সাহস থাকলে দেশে আয়।’ সেই সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করেই শেখ হাসিনা এমন দম্ভোক্তি করতেন। কটূক্তি করতেন। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। সময়ের বাস্তবতায় তারেক রহমান সে সময় দেশে ফেরেননি। অর্থাৎ ফিরতে পারেননি। কেন পারেননি সে বিষয়টি আমরা পুরোপুরি না জানলেও কিছুটা অনুমান করতে পারি। আমরা বলতে পারি, ক্ষমতার এমন ভাষা রাজনীতিকে গ্রাস করে। আজকে শেখ হাসিনার রাজনীতি শেষ। শুধু তার ক্ষমতার ভাষার জন্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক কবর রচিত হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্বও আজ ঝুঁকির মুখে। সময়ই বলে দেবে এর জবাব। টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারপ্রধানের ভাষা কখনোই নিছক রাজনৈতিক মতামত হিসেবে বিবেচিত হয় না। নির্বাহী ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা ব্যক্তির বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষত যখন সেই ভাষা বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ করে উচ্চারিত হয়, তখন তা রাজনৈতিক বিতর্কের সীমা ছাড়িয়ে শাসনব্যবস্থা, আইন ও সংবিধানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী শাসনামলের পতিত পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পুরোটা সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে দেওয়া বক্তব্যগুলো এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এসব বক্তব্যে বিদেশে অবস্থান, দেশে ফিরলে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা, কিংবা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অভিযোগের মতো বিষয় উঠে এসেছে। সরকারপক্ষ এগুলো সাধারণত আইনের শাসনের অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, জনপরিসরে এই ভাষা প্রায়শই ব্যঙ্গাত্মক ও অবমূল্যায়নমূলক হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়।
বিরোধিতা না কি বৈধতাহীনতার ভাষা
গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন সমালোচনার ভাষা নীতিনির্ভর না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। কোনো রাজনৈতিক নেতাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং নৈতিক বা আইনি দিক থেকে আগাম অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে দুর্বল করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারপ্রধানের বক্তব্য ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের কাছে শক্ত অবস্থানের প্রতীক হলেও, বিরোধী পক্ষের কাছে তা রাজনৈতিক প্রান্তিককরণের বার্তা হিসেবে প্রতিভাত হয়। এর ফলে রাজনীতি ক্রমে প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে শত্রু-মিত্র বিভাজনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
মেরূকরণ ও সংলাপহীনতার রাজনীতি
এ ধরনের ভাষার একটি সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব হলো গভীর মেরূকরণ। সংসদীয় রাজনীতি, আন্তঃদলীয় সংলাপ কিংবা ন্যূনতম সমঝোতার পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়। বিরোধী দল আর ‘বিকল্প সরকার’ হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপিত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এর ফল হয় দ্বিমুখী—একদিকে ক্ষমতাসীন পক্ষ রাজনৈতিকভাবে আরো কঠোর হয়, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়া মনে করে। এই পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য সুসংবাদ নয়।
আইন যখন বক্তব্যের ছায়ায় পড়ে
আইনগতভাবে সরকারপ্রধানের বক্তব্য কোনো আদালতের রায় নয়। তবু বাস্তবতা হলো—নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে তার বক্তব্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের জন্য একটি শক্তিশালী সংকেত বহন করে। প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে বিচারের ইঙ্গিত দিলে ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি হলো—দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যদি এই নীতিকে অগ্রিম দোষারোপের দিকে ঠেলে দেয়, তবে তা আইনের শাসনের ধারণাকে দুর্বল করে, অন্তত নৈতিক ও প্রতীকী অর্থে।
সংবিধান, সংযম ও ক্ষমতার ভার
সংবিধান সরকারপ্রধানকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্বও অর্পণ করেছে। এই দ্বৈত অবস্থান থেকেই সংযমের প্রশ্নটি উঠে আসে। সরকারপ্রধানের ভাষা অনেক সময় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হয়। এ কারণে বিরোধী নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গাত্মক বা কটাক্ষমূলক ভাষা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ না হলেও, তা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার ও ক্ষমতার ভারসাম্যের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। শক্ত রাষ্ট্রের পরিচয় উচ্চকণ্ঠ ভাষায় নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আত্মবিশ্বাস ও সংযমে প্রকাশ পায়।
শেষকথা : শক্ত রাষ্ট্র না কি সংযত গণতন্ত্র
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র ভাষা নতুন নয়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আরো গভীর—রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দমনমূলক ভাষায় মোকাবিলা করবে, নাকি সংযত ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে? গণতন্ত্রে বিরোধিতা অপরিহার্য, কিন্তু সেই বিরোধিতার ভাষা যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারে চাপা পড়ে যায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু বিরোধী দল নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিজেই। সরকারপ্রধানের ভাষা তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি শাসনের মান, আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি গভীর বার্তা বহন করে।
ক্ষমতার ভাষা প্রয়োগে এসব বিষয় বিবেচনা করবে বর্তমান সরকার ও সরকার প্রধান—জনগণের এটিই প্রত্যাশা।
লেখক : প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


গাজা স্থিতিশীলতা বাহিনীতে সেনা পাঠাচ্ছে যে ৫ দেশ