মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ১৫ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছার আগেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে জরুরি ফোন করেন। তিনি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করেন।
কিন্তু এরপরও ট্রাম্প অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর নেতানিয়াহু দ্রুতই স্পষ্ট করে দেন যে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননে হামলা বন্ধ করবে না। অনেকেই তার এই কর্মকাণ্ডে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল দেখতে পান। শুধু নেতানিয়াহু এবং তার মিত্ররাই নন, তার বিরোধীরাও চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। এর কারণ, ইসরাইলি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সার্কেলের অভিজাতরা ইরানের পরাজয়কে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা অপসারণ হিসেবে দেখেন। ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্প একটি জায়নবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প, যা বাস্তবায়নে ইসরাইল শুধু আরো ভূমি দখলই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশের ওপর সামরিক আধিপত্য এবং ক্রমাগত প্রসারিত প্রভাব বলয়ও গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান।
ইসরাইলের সীমান্ত সম্প্রসারণ
‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্পের কেন্দ্রে আছে ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণ। কয়েক দশক ধরে ইসরাইল ১৯৬৭ সালে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপন করছে, যা এখন কার্যত ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত বলা যায়। সেখানের ফিলিস্তিনিরা এখন তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্কে দিন পার করছেন।
ফিলিস্তিনি ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পর ইসরাইল এখন তার উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ সীমান্তে নিজের কর্তৃত্ব সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এর ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ১৯১৯ সালে বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা প্রস্তাবিত পরিকল্পনার অনুরূপ, যার মধ্যে আছে দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশ, জর্ডান নদীর বাম তীর (বর্তমানে জর্ডানে) এবং মিসরের সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশ।
ইসরাইল প্রায় ৬০ বছর ধরে সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করেছে এবং গত দুই বছরে সিরিয়ার আরো ভূমি দখলের চেষ্টা করছে। গোলান মালভূমির উত্তর ও দক্ষিণে সম্প্রসারণের ফলে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ওপর নজর রেখে ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। এ ধরনের উপস্থিতি দামেস্ককে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপের মধ্যে ফেলতে পারে, যা সিরীয় সরকারকে একটি সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য করতে পারে।
দক্ষিণ লেবাননের ওপর ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে এবং বারবার সেখানে আক্রমণ করেছে। বর্তমানে ইসরাইলি সেনাবাহিনী এলাকাটি দখল করে রেখেছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন করা শুরু করেছে। এলাকাটি শুধু তার পার্বত্য ভূখণ্ডের জন্যই নয়, বরং তার জলসম্পদের জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে জর্ডান নদীর পূর্বতীরও চায় ইসরাইল। এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে তা শুধু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণই বাড়বে না, বরং ইরাক ও ইরানের সঙ্গে যুক্ত পূর্বাঞ্চলীয় হুমকির বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধাও দেবে। এ অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবহন পথগুলোকেও ইসরাইলি প্রভাবে আনবে, বিশেষ করে, যেগুলো আরব উপদ্বীপকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। সব মিলিয়ে সম্প্রসারণবাদী এই পরিকল্পনাগুলো ইসরাইলকে লোহিত সাগরের মতো কৌশলগত নৌপথগুলোয় ব্যাপক প্রবেশাধিকার এবং প্রধান জ্বালানি সম্পদের আরো কাছে নিয়ে যাবে। ফলে, আঞ্চলিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও বাড়বে।
সামরিক আধিপত্য
‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্পটি শুধু ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণের বিষয় নয়; এটি সামরিক অভিযান পরিচালনার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও একটি বিষয়। ১৯৪৮ সাল থেকে পশ্চিমতীর ও গাজা উপত্যকায়, সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে লেবাননে এবং ২০২৪-এর ৮ ডিসেম্বর বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে সিরিয়ায় ইসরাইল যা করছে এটি তারই প্রতিচ্ছবি।
ইসরাইল শুধু তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননের ওপরই নয়, বরং মিসর, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং হর্ন অব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়াসহ এই এলাকার কিছু অংশের ওপরও সামরিক অভিযান পরিচালনার স্বাধীনতা চায়। ইসরাইল তার প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা হলেও সাফল্য পেয়েছে। ভবিষ্যতে, আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য অর্জনের জন্য ইসরাইল সামরিক সহযোগিতার ধারাযুক্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের স্থাপনাগুলোয় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান মোতায়েন এবং সম্ভাব্যভাবে আরব দেশগুলোয় এর নিজস্ব ঘাঁটি সুরক্ষিত করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার আওতায় ইসরাইলকে অনুমিত আসন্ন হুমকির বিরুদ্ধে পূর্ব প্রস্তুতিমূলক হামলা চালানোর ক্ষমতা দেবে।
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির অধীনে সিনাই উপদ্বীপে অনুরূপ ব্যবস্থা বিদ্যমান। এই চুক্তিটি একটি নিরস্ত্র বাফার জোন বজায় রাখা, আকাশসীমার ওপর বিধিনিষেধসহ মিসরীয় বাহিনীর ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রদানকারী বহুজাতিক বাহিনী ও পর্যবেক্ষক বজায় রাখার মাধ্যমে ইসরাইলের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে।
প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা
‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্পের তৃতীয় উপাদান হলো একটি ভূরাজনৈতিক প্রভাব বলয় প্রতিষ্ঠা করা। এই কৌশলের আওতায় ইসরাইল সেসব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গঠনে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়, যেগুলোকে সে এই বলয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে। ইসরাইল এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সফট ও হার্ড পাওয়ারকে কাজে লাগিয়ে তার প্রভাব বলয় বাড়াতে চায়। ওয়াশিংটনের ইসরাইলপন্থি লবি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরাইলি আঞ্চলিক স্বার্থকে অন্তর্ভুক্ত করতে সফল হয়েছে।
এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের জন্য মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা এই শর্তের ওপর নির্ভরশীল যে, তারা আঞ্চলিক বিষয়ে ইসরাইলি নির্দেশ মেনে নেবে। যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি ঋণবাজারকে প্রভাবিত করে এমন আর্থিক নেটওয়ার্কগুলোও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রধান বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এসব দেশের ওপর নির্দিষ্ট নীতি গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় যা তাদের ইসরাইলি কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করবে।
বাধা হিসেবে ইরান
বিগত কয়েক দশকে ইসরাইল তার ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্পের পথে থাকা বিভিন্ন বাধা একে একে অপসারণ করেছে। ইরানই ছিল অবশিষ্ট শেষ বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ জন্যই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে ইসরাইল বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু যা অপ্রত্যাশিত ছিল ইসরাইল সরকারের জন্য, তা হলো- তারা ইরানের এ রকম প্রতিরোধ সক্ষমতা কল্পনা করেনি।
সংঘাত শুরু হওয়ার দেড় মাসের মধ্যেই ইরান একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে সুসংহত করে একটি ভূরাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করেছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ও সামরিক সহযোগিতা সত্ত্বেও ইরানকে পরাজিত করতে ইসরাইলের ব্যর্থতা তাদের ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ কৌশলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছিল যা ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের একক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। এই যুদ্ধের পরিণতি ইসরাইল-ইরান সংঘাতের বাইরেও বিস্তৃত। ইসরাইল সরকারের এই অবিবেচক পদক্ষেপ এ অঞ্চলে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর কৌশলগত চিন্তাভাবনায়ও পরিবর্তন আনবে। ইরানে হামলা করার ক্ষেত্রে ইসরাইলের লক্ষ্য ছিল তার আঞ্চলিক আধিপত্যের পথ পরিষ্কার করা। কিন্তু ইসরাইলের সেই আশা পূরণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র নিজেও হয়তো ইসরাইলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, মার্কিনিদের মধ্যে ইসরাইলবিরোধী বা দেশটি সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব ক্রমেই বাড়ছে। এ ধরনের মনোভাব ইসরাইলের পক্ষে ওয়াশিংটনকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ইসরাইলি লবির সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে। চলতি বছর কংগ্রেসের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটে আরো বেশি ইসরাইল-সমালোচক নিয়ে আসতে পারে, যা ইসরাইলের প্রতি মার্কিন সমর্থন সীমিত করবে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্কিন সমর্থনে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে, যা আগামী মাস ও বছরগুলোয় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে আরো মরিয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

