সংস্কৃতি কেবল একগুচ্ছ আচার-অনুষ্ঠান বা উৎসবের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি জাতির হৃৎস্পন্দন, তার আত্মপরিচয়ের দর্পণ এবং বেঁচে থাকার নির্যাস। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের ভাষায়, ‘Culture is what we are.’ অর্থাৎ আমরা যা, আমাদের বিশ্বাস ও যাপিত জীবনের যে প্রতিফলন, তাই সংস্কৃতি। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যখন কোনো জাতির এই আত্মিক শক্তিকে বিনাশ করা হয়, তখন সেই জাতি মানচিত্র নিয়ে টিকে থাকলেও আত্মিকভাবে মৃত হয়ে পড়ে। বর্তমানে আমরা যে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-এর মুখোমুখি, তা কোনো আকস্মিক তুফান নয়; বরং এটি দীর্ঘকালীন ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার এক বিষাক্ত ফসল।
উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম উম্মাহ যখন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে, তখনই কলোনিয়াল শক্তিগুলো আমাদের ভূখণ্ডে কেবল ভৌগোলিক দখলদারত্বই কায়েম করেনি, বরং আমাদের মনোজগতে এক দীর্ঘস্থায়ী দাসত্বের বীজ বপন করে দিয়ে গেছে। আজ সেই বীজের বিষবৃক্ষ আমাদের যুবসমাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে, যার মূলে রয়েছে ব্রিটিশদের তৈরি করা হীনম্মন্যতা এবং প্রতিবেশী কলকাতার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। ‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দাও’—এই নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত গবেষণাগার যেন আজকের বাংলাদেশ।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও মুসলিম সংস্কৃতির বিশ্বজনীন পরাজয় : বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের আনুষ্ঠানিক পতনের পর মুসলিম বিশ্ব কেবল রাজনৈতিকভাবে এতিম হয়নি, বরং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। খিলাফত ছিল মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক ঢাল। এই ঢাল সরে যাওয়ার পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ‘সাইকস-পিকট’ চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
খিলাফতের পতনের ফলে মুসলিম দেশগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রের মোড়কে বন্দি হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি জনপদে পশ্চিমা আধুনিকতার নামে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ‘সভ্যতা’র মাপকাঠি হিসেবে প্রচার করা শুরু হয়। উসমানীয় পতনের পর থেকেই ইউরোপীয় শক্তিগুলো মুসলিম যুবসমাজের মনস্তত্ত্ব থেকে ‘ইসলামি খিলাফত’ ও ‘উম্মাহ’র ধারণা মুছে দিয়ে সেখানে ভোগবাদ ও সেক্যুলার জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এটিই ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বিশ্বজনীন বিজয়।
শিক্ষানীতি ও মানসিকতায় কলোনিয়াল লিগ্যাসি : ১৭৫৭ সালের পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়, তার মূল লক্ষ্য কেবল সম্পদ লুণ্ঠন ছিল না। লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যে কুখ্যাত শিক্ষা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, সেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন— ‘We must at present do our best to form a class... Indian in blood and colour, but English in taste, in opinion, in moral and in intellect.’ ব্রিটিশরা জানত, তলোয়ার দিয়ে একটি জাতিকে কয়েক দশক শাসন করা যায়, কিন্তু সংস্কৃতি দিয়ে শাসন করা যায় কয়েক শতাব্দী। তারা আমাদের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ মাদরাসা এবং টোলকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এক ‘কেরানি তৈরির কারখানা’ গড়ে তোলে। তারা আমাদের বিশ্বাস, ভাষা ও পোশাককে ‘অনগ্রসর’ হিসেবে চিহ্নিত করে ইংরেজি আদব-কেতাকে ‘আধুনিকতা’র সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই কলোনিয়াল লিগ্যাসি বা ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার আজও আমাদের হীনম্মন্যতায় ভোগাচ্ছে। আজও আমাদের শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ ইংরেজিতে কথা বলতে পারা বা পশ্চিমা পোশাক পরাকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক মনে করে, যা মূলত লর্ড মেকলের সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেরই সাফল্য।
কলকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্যিক আগ্রাসন : বাংলার প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ রূপ হলো কলকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্যিক আধিপত্য। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে ‘রেনেসাঁ’ বা নবজাগরণের কথা বলা হয়, তা ছিল মূলত একপক্ষীয় এবং মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি চরম বিদ্বেষপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তৎকালীন অনেক সাহিত্যিক তাদের লেখনীতে মুসলিম শাসনকালকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং মুসলমানদের ‘যবন’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
এই সাহিত্যিক আগ্রাসন দেশভাগের পরেও স্তিমিত হয়নি। বাংলাদেশের জন্মের পরেও একটি বিশেষ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সচেতনভাবে আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে ভুলিয়ে দিয়ে কলকাতার অনুগামী করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে তারা এমন এক ‘শুদ্ধীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু করে, যেখানে শতাব্দীকাল ধরে ব্যবহৃত ও বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়া আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করা হয়।
আজকের বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাকালে দেখা যায়, ‘ইন্তেকাল’ হয়ে গেছে ‘প্রয়াত’, ‘লাশ’ হয়ে গেছে ‘মরদেহ’, ‘দাফন’ হয়েছে ‘শেষকৃত্য’, ‘মুনাজাত’ হয়েছে ‘প্রার্থনা’ আর ‘রোজা’ হয়েছে ‘উপবাস’। এই শব্দতাত্ত্বিক পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণগত নয়, বরং এটি একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে মগজ থেকে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। কলকাতা-কেন্দ্রিক এই সাহিত্যিক মোড়লিপনা আমাদের নিজস্ব মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে একটি কৃত্রিম ‘বাঙালি পরিচয়’ চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, যা মূলত আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার নামান্তর।
মিডিয়ার আধিপত্য ও পারিবারিক কাঠামো বিনাশ : বর্তমান বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ক্ষতিকর রূপ হলো ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত বিচরণ। তথাকথিত ‘সিরিয়াল’ বা নাটকের মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঘরে এমন এক জীবনবোধ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই নাটকগুলোতে পরকীয়া, পারিবারিক ষড়যন্ত্র, জাঁকজমকপূর্ণ অহেতুক উৎসব এবং অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিক ও আধুনিক হিসেবে দেখানো হয়। ‘স্টার জলসা’ বা ‘জি বাংলা’র মতো চ্যানেলগুলোর প্রভাবে আমাদের দেশের পারিবারিক শান্তি আজ বিপর্যস্ত। ১৯৯৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল—মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোয় পশ্চিমের ব্যর্থতার প্রধান কারণ হচ্ছে ‘ইসলামের পরিবার প্রথা’। তাই আজ সেই পরিবার প্রথার ওপরই সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে।
সিরিয়ালগুলোর প্রভাবে নারীদের মধ্যে আদর্শ মা বা বোন হওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য ও পরকীয়া প্রেমিকা হওয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এর ফলে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার ঘটনা। আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র ও নাটক আজ পুরোপুরি মুম্বাই ও কলকাতার অনুকরণে লিপ্ত, যেখানে অশ্লীলতা ও যৌন সুড়সুড়িই যেন সাফল্যের প্রধান শর্ত।
যুবসমাজ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান শিকার : যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ। কিন্তু আজ আমাদের যুবসমাজকে ‘সেক্স’ নামক আফিম খাইয়ে এবং মাদকাসক্তির অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাম্রাজ্যবাদীরা জানে, যদি যুবসমাজকে নৈতিকতাহীন এবং আদর্শহীন করা যায়, তবে সেই জাতি আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
বর্তমানে আমাদের যুবকদের ফ্যাশনে, পোশাকের ধরনে এবং এমনকি ভাষার ভঙ্গিতেও বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ স্পষ্ট। তারা আজ মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদ, তারিক বিন জিয়াদ, সালাহউদ্দীন আইয়ুবি কিংবা বখতিয়ার খিলজির বীরত্বগাথা পড়ার বদলে হৃতিক বা শাহরুখ খানের মতো কাল্পনিক চরিত্রের অনুকরণ করতে বেশি আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে আজ ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরি’ উদযাপন করা হয় এবং এর বিপরীতে কার্যকর কোনো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না—এটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চরম অবনতির প্রমাণ।
যুবসমাজকে আজ রাজনীতিহীন এবং শেকড়হীন করে তোলা হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ইন্টারনেটের নীল জগৎ তাদের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা এখন ‘ফ্রি-উইল’ ও ‘ফ্রি-মিক্সিং’-এর নামে একধরনের পশুবৃত্তিতে লিপ্ত হচ্ছে, যা সমাজকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক পরাধীনতা : ভাষা একটি জাতির সংস্কৃতির প্রধান বাহন। কিন্তু আজ আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে বিকৃত করতে গর্ববোধ করি। ইংরেজি আজ কেবল যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং এটি আভিজাত্য ও আধুনিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমাদের শিক্ষিত সমাজ মনে করে, বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে কথা বলাই বেশি স্মার্টনেসের পরিচয়।
অন্যদিকে শৈশব থেকেই আমাদের শিশুরা ভারতের ‘ডোরেমন’ বা অন্যান্য হিন্দি কার্টুন দেখে বড় হচ্ছে। এর ফলে তারা মাতৃভাষার চেয়ে হিন্দি ভাষার প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলা ভাষার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে পাওয়া মর্যাদা আজ হুমকির মুখে। যখন একটি জাতির শিশুরা অন্য দেশের ভাষায় কথা বলতে শেখে বা অন্য দেশের বীরদের নায়ক মনে করে, তখন সেই জাতির সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, মগজে থাকে পরাধীনতা।
বিজ্ঞাপনী চটক ও পণ্যবাদী সংস্কৃতি : সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অন্যতম রূপ হলো বিজ্ঞাপন। আজ নারীর দেহকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে সাবান থেকে শুরু করে সিমেন্ট পর্যন্ত সবকিছুর বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। পুঁজিবাদী শক্তিগুলো আমাদের শেখাচ্ছে, উৎসব মানেই নতুন জামা কেনা, উৎসব মানেই ডিজে পার্টির উন্মাদনা। তারা আমাদের যুবসমাজকে একধরনের ‘কনজিউমার’ বা ভোগবাদীতে পরিণত করছে, যারা কেবল ভোগ করতে শেখে, ত্যাগের মহিমা বোঝে না।
ম্যাগাজিন, ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে একধরনের ‘লাক্সারি লাইফস্টাইল’ প্রচার করা হচ্ছে, যা আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত যুবকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। তারা সেই রঙিন জীবনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুদূরপ্রসারী ফলাফল : সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কোনো স্বল্পমেয়াদি সমস্যা নয়। এর ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। এর ফলে—
১. সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে : যখন একটি জাতির জনগণ মানসিকভাবে অন্য দেশের অনুগামী হয়, তখন সেই দেশ স্বাধীন হয়েও পরাধীন। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো তখন অনায়াসেই তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।
২. নৈতিক ধস : সমাজে খুন, ধর্ষণ, লিভ-টুগেদার এবং বিকৃত যৌনাচারের মতো পাপাচার বৃদ্ধি পায়। মানুষের মধ্য থেকে পরকালের জবাবদিহিতার ভয় এবং নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যায়।
৩. সৃজনশীলতার বিনাশ : পরনির্ভরশীল জাতি কখনো নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। তারা কেবল বিদেশি ফ্যাশন আর প্রযুক্তির ভোক্তা হয়েই দিন কাটায়।
৪. দেশপ্রেমের অভাব : সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার যুবকদের মধ্যে দেশের প্রতি কোনো মমতা থাকে না। তারা সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে চায় এবং দেশের সংকটে তারা নীরব দর্শক হয়ে থাকে।
মুক্তির পথ কোন দিকে?
এই সর্বগ্রাসী তিমির থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সম্মিলিত ও আদর্শিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই। কেবল আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান সম্ভব নয়; আমাদের সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে পাল্টা বিপ্লব ঘটাতে হবে।
১. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন : আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কলোনিয়াল প্রভাবমুক্ত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, মুসলিম বীরদের বীরত্বগাথা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
২. নিজস্ব মিডিয়া ও বিনোদন তৈরি : অপসংস্কৃতির জবাব দিতে হবে সুস্থ সংস্কৃতি দিয়ে। নাটক, সিনেমা এবং সংগীতের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ডিশ অ্যানটেনার বিদেশি চ্যানেলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং দেশীয় মানসম্মত অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।
৩. পারিবারিক সচেতনতা : সন্তানদের পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির মরণছোবল থেকে বাঁচাতে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। শৈশব থেকেই তাদের মধ্যে আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। বাড়িতে ইসলামি ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. জাতীয় গৌরববোধ জাগ্রত করা : আমাদের মহান মুসলিম পূর্বসূরিদের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং বীরত্বের ইতিহাস যুবসমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, আমরা কোনো ‘রিজেক্টেড প্রোডাক্ট’ বা অনুকরণকারী জাতি নই; আমরা একসময় বিশ্বকে জ্ঞান ও সভ্যতার আলো দিয়েছি।
৫. সাহিত্য ও ভাষার সুরক্ষা : বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করানো বিজাতীয় শব্দগুলো বর্জন করে আমাদের নিজস্ব ইসলামি ঐতিহ্যের শব্দমালা ফিরিয়ে আনতে হবে। কলকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্যিক মোড়লিপনা ত্যাগ করে দেশীয় ও ইসলামি ভাবধারার সাহিত্যচর্চায় লেখকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৬. সামাজিক আন্দোলন : প্রতিটি এলাকায় যুবকদের নিয়ে সুস্থ সংস্কৃতির ক্লাব ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে, যাতে তারা পর্দার আড়ালে অপসংস্কৃতির নেশায় ডুবে না যায়।
লেখক : লেখক ও কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

