জুলাই শুধু একটি মাস নয়, বিবেকের প্রতিচ্ছবি

আরিফুল ইসলাম রাফি

জুলাই শুধু একটি মাস নয়, বিবেকের প্রতিচ্ছবি
জাতীয় পতাকায় মোড়ানো রাব্বির লাশ

জুলাই শুধু একটি মাস নয়। এটি এখন একটি অনুভূতির নাম, একটি প্রতিজ্ঞার নাম। একটি জাতির বুকভরা সাহস, অশ্রু আর আত্মত্যাগের নাম। ক্যালেন্ডারের পাতায় জুলাই এলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে উত্তাল রাজপথ, অসংখ্য তরুণের দৃপ্ত মুখ, প্রতিবাদের গর্জন আর এমন সব পরিবার, যাদের জীবনের ক্যালেন্ডার চিরদিনের জন্য বদলে গেছে।

বৃষ্টিভেজা আকাশ, মেঘের গর্জন আর বাতাসের শব্দের ভেতর যেন এখনো শোনা যায় সেই দিনগুলোর প্রতিধ্বনি। মনে হয়, শাহবাগ থেকে চট্টগ্রাম, রংপুর থেকে খুলনা, রাজশাহী থেকে সিলেট; সারা দেশের রাজপথ যেন আবার জেগে উঠতে চায়। কোথাও যেন এখনো লেখা আছে সেই দিনের পদচিহ্ন। কোথাও যেন শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ ইতিহাসকে নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীন দেশে অধিকার আদায়ের সংগ্রামও কখনো কখনো বড় কঠিন হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে আন্দোলনের দাবিটি ছিল নির্দিষ্ট, সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থার সংস্কার। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থায় আরো ন্যায্যতা ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আলোচনা শুরু হয়, ছোট ছোট মানববন্ধন হয়, প্রতিবাদ মিছিল বের হয়।

শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেয়, ব্যানার হাতে দাঁড়ায়, যুক্তি তুলে ধরে। তারা বিশ্বাস করেছিল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যুক্তির ভাষা শোনা হবে। কিন্তু না যুক্তি শোনা হলো না; বরং বন্দুকের নলের মাধ্যমে প্রতিবাদ দমনের পথ বেছে নিল সরকার। ফলে দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলন এবং একপর্যায়ে তা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মাফিয়া শাসনব্যবস্থার পতন আর ভারতীয় আধিপত্যের অবসানের এক দফা দাবিতে পরিণত হয়।

১৬ জুলাই আবু সাঈদের আত্মত্যাগের ঘটনা বারুদের স্তূপে আগুন দেওয়ার মতো ভূমিকা পালন করে এবং দেশবাসী পরে রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলন দমনে সরকার গণহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু মানুষকে তা দমাতে পারেনি। কারণ, ইতিহাসে এমন অনেক সময় এসেছে, যখন মানুষ বুঝেছে, ভয়কে জয় করতে না পারলে ভবিষ্যৎকে জয় করা যায় না। জুলাইয়ের তরুণরাও সেই বিশ্বাস নিয়েই বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল ।

জুলাইয়ের আকাশ তখন শুধু বর্ষার মেঘে ভারী ছিল না; ভারী ছিল অজস্র মানুষের প্রত্যাশায়। রাজপথে দাঁড়ানো প্রতিটি তরুণ জানত না, ইতিহাস তাকে কী নামে মনে রাখবে। কিন্তু তারা জানত, নীরব থেকে অন্যায় মেনে নেওয়ার চেয়ে নিজের বিশ্বাসের পাশে দাঁড়ানো অনেক বেশি সম্মানের। এই বিশ্বাসই তাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রতিটি আন্দোলনের একটি শুরু থাকে। কিন্তু সব আন্দোলন ইতিহাস হয় না। ইতিহাস হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত ভয়কে ছাপিয়ে সমষ্টিগত সাহস জন্ম নেয়। জুলাই সেই সাহসের জন্ম দেখেছিল। সেই সাহসই একটি প্রজন্মকে একই কাতারে দাঁড় করিয়েছিল।

একটি সময় আসে, যখন কোনো আন্দোলন আর শুধু আন্দোলন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে একটি জাতির বিবেকের প্রতিচ্ছবি। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ঐক্য। কেউ কাউকে চিনত না, তবু সবাই যেন একে অন্যের আপন হয়ে উঠেছিল। অপরিচিত একজন আহত হলে আরেকজন তাকে কাঁধে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছেন। প্রতিটি আন্দোলনের একটি ভাষা থাকে। জুলাইয়ের ভাষা ছিল তার স্লোগান। সেই স্লোগানগুলো শুধু প্রতিবাদের শব্দ ছিল না, ছিল একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয়।

আজ আবার জুলাই এসেছে। সময়ের ক্যালেন্ডারে আরেকটি বছর যোগ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে, যারা রাস্তায় নেমেছিল, যারা স্বপ্ন দেখেছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ, যারা নিজের জীবন দিয়েও পিছিয়ে যায়নি, তাদের স্বপ্ন আমরা কতটা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি?

যারা সেদিন প্রাণ হারিয়েছেন, তারা শুধু একটি সংখ্যা নন। তারা ছিলেন কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো বোন, কারো বন্ধু, কারো সহপাঠী। কারো স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার, কারো প্রকৌশলী, কারো শিক্ষক, কারো সাংবাদিক। তাদের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো আজও আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে।

কিন্তু এই বিজয়ের মূল্য কত? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারে না। কারণ একজন শহীদের জীবনকে কোনো সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। একটি পরিবারের শোকের কোনো পরিমাপ হয় না। যে মা সন্তানের জন্য আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, যে বাবা আজও সন্তানের ছবিতে হাত বুলিয়ে নীরবে কাঁদেন, যে ছোট ভাই বা বোন আজও বিশ্বাস করতে পারে না, তার প্রিয় মানুষটি আর ফিরবে না, তাদের বেদনার হিসাব কোনো ইতিহাসের বইয়ে সম্পূর্ণ লেখা সম্ভব নয়। সে সময় অসংখ্য নাম-না-জানা মানুষ ইতিহাসের নায়ক হয়ে উঠেছিলেন।

যারা চলে গেছেন, তাদের আমরা ফিরিয়ে আনা যাবে না, কিন্তু তাদের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব, তাদের অসমাপ্ত পথচলাকে সমাপ্ত করা সম্ভব। জুলাই ফিরে আসে প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি সত্য উচ্চারণে, প্রতিটি সাহসী সিদ্ধান্তে। ফিরে আসে প্রতিটি তরুণের চোখের স্বপ্নে, প্রতিটি মায়ের প্রার্থনায়, প্রতিটি শহীদের রক্তে লেখা ইতিহাসে।

একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন সে তার আত্মত্যাগকে ভুলে যায় না, ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেয় না এবং নতুন প্রজন্মকে সত্য, সাহস ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তাই আবার যখন জুলাই আসে, আমরা শুধু একটি মাসকে স্বাগত জানাই না; আমরা ফিরে তাকাই সেই দিনগুলোর দিকে, যেদিন একদল তরুণ বিশ্বাস করেছিল, মানুষের কণ্ঠ কখনো চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করা যায় না।

এই আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল, এটি কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে আটকে থাকেনি। এটি একসময় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। বাবা-মা বুঝতে শুরু করেন, সন্তানরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, একটি ন্যায্য ব্যবস্থার প্রত্যাশায় রাজপথে নেমেছে। শিক্ষকরা উদ্বিগ্ন হন। সাধারণ মানুষ ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। তারপর আসে সেই দিনগুলো, যখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। সব শ্রেণিপেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে; সংঘর্ষ, উত্তেজনা এবং সহিংসতার খবর দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসতে থাকে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ে। বহু জায়গায় বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। আহত হয় অসংখ্য মানুষ। হাসপাতালে বাড়তে থাকে ভিড়। উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে পরিবারে পরিবারে।

একটি মায়ের জন্য এর চেয়ে কঠিন সময় আর কী হতে পারে? সকালবেলা সন্তানকে মিছিলে পাঠিয়ে তিনি জানেন না, সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরবে কি না। একটি বাবার বুকের ভেতর জমে ওঠে অজানা আতঙ্ক। ফোন বেজে উঠলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সন্তানের কণ্ঠ শুনতে পারলেই যেন একটু স্বস্তি। কিন্তু সবার ভাগ্যে সেই স্বস্তি জোটেনি। কেউ ফিরেছে আহত হয়ে, কেউ ফিরেছে দীর্ঘ চিকিৎসার পথে, আবার কেউ আর কোনো দিন ফেরেনি। একটি খালি চেয়ার, একটি অগোছালো বইয়ের তাক, একটি অর্ধেক পড়া খাতা, এসবই হয়ে উঠেছে অনেক পরিবারের নীরব স্মৃতিচিহ্ন।

তবু আন্দোলন থামেনি। কারণ, ইতিহাসে এমন অনেক সময় এসেছে, যখন মানুষ বুঝেছে, ভয়কে জয় করতে না পারলে ভবিষ্যৎকে জয় করা যায় না। জুলাইয়ের তরুণরাও সেই বিশ্বাস নিয়েই রাজপথে দাঁড়িয়েছিল। তাদের হাতে ছিল ব্যানার, মুখে ছিল স্লোগান, মনে ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এ সময় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, আন্দোলন শুধু একটি দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের মনে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং মর্যাদার প্রশ্নও জায়গা করে নিচ্ছে। আন্দোলনের ভাষা বদলাতে শুরু করে, দাবির পরিধিও বিস্তৃত হয়। রাজপথ তখন আর শুধু ইটপাথরের রাস্তা নয়; সেটি হয়ে ওঠে মানুষের সাহসের ঠিকানা।

একটি জাতির শক্তি শুধু তার অস্ত্রে নয়, তার মানুষের বিবেকে। জুলাই সেই বিবেককে জাগিয়ে তুলেছিল। মানুষ উপলব্ধি করেছিল, অধিকার শুধু কাগজে লেখা একটি শব্দ নয়; অধিকারকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সাহস, ঐক্য এবং আত্মত্যাগ। আন্দোলনের দিনগুলো যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে এটি শুধু একটি নীতিগত দাবি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আরো প্রবল হয়েছে। তরুণদের চোখে তখন ভয়ের চেয়ে স্বপ্ন বড় হয়ে উঠেছে। তারা এমন একটি বাংলাদেশের কথা ভাবতে শুরু করেছে, যেখানে ন্যায়বিচার শুধু বইয়ের সংজ্ঞা হবে না, বাস্তব জীবনেরও অংশ হবে।

প্রতিটি সংগ্রামেরই একটি গন্তব্য থাকে। কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছাতে কেউ হারায় তার শৈশব, কেউ তার স্বপ্ন, কেউ তার সন্তান, কেউ তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে। জুলাইয়ের পথও তেমনই ছিল। সেই পথের প্রতিটি বাঁকে ছিল অশ্রু, অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা এবং আত্মত্যাগ। তবু মানুষ থেমে যায়নি। কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল, ভয়ের চেয়ে সত্যের শক্তি অনেক বেশি।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...