নূর আলম একজন স্বনামধন্য তরুণ শিক্ষক। সবুজ বিদ্যাপীঠ স্কুল অ্যান্ড কলেজে রসায়ন পড়ান। ছাত্রবান্ধব এই মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ
তার জীবনটিই অন্যরকম। শিক্ষক পরিবারে জন্ম। বাবা আবদুর রশীদ মিয়া ছিলেন প্রধান শিক্ষক। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থানার ফরিদগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অবসরে গিয়েছেন। শিক্ষকতা তার রক্তে মিশে আছে। ছোট চাচা আবদুর রব কুয়াকাটা হোসেন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ছোট বোন ফেরদৌসী আমতলী থানার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার স্বামী মোহাম্মদ মিলন আমতলী সরকারি ডিগ্রি কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক। আর নূর আলমের স্ত্রী মাহমুদা রহমান ঢাকার ওয়ারীর সৈয়দ মহসীন আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
নূর আলম ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্র, মনোযোগী পড়ালেখায়। রসায়ন বিভাগে অনার্স মাস্টার্স জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ২০১২ সাল থেকে। এখন ১২টি বছর পেরিয়ে গেছে। তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার সবুজ বিদ্যাপীঠ স্কুল ও কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী শিক্ষক। সাত হাজার টাকায় মহান পেশা শিক্ষকতায় যাত্রা শুরু করেছেন, এখন বেতন ২০ হাজার টাকা। স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয়ে ভালোই আছেন তারা। তিনি যে বিদ্যালয়ে পড়ান, সেটি একটি এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয়, যাত্রাবাড়ী ও এর আশেপাশের ছাত্রছাত্রীরাই বেশি পড়ে। একটু নিচের দিকের গরিব এলাকার ও গরিব মানুষের ছেলেমেয়েরাই বেশি পড়ে, আবার বড়লোকের ছেলেমেয়েও আছে। শাকসবজি বিক্রেতার ছেলেমেয়ে যেমন বেশি পড়ে, তেমনি বড় চাকরিজীবীর ছেলেমেয়েরাও পড়ে। সবাইকেই তৈরি করে নিতে হয়। তবে গরিবের সন্তানদের প্রতি মনোযোগটি বেশি দিতে হয়। তারা ঠিকমতো স্কুলে আসছে কি না, তা নূর আলম নিয়মিত খোঁজ রাখেন। তাদের যেকোনো সমস্যায় তিনি সবার আগে গিয়ে সমাধানগুলো তৈরি করে দেন। তারা বিদ্যালয়ে গ্রহণ করা শিক্ষা বাসায় গিয়ে ভালোভাবে অনুশীলন করতে পারে না। ফলে বাড়তি যত্ন নিতে হয় তাকে ও অন্যান্য শিক্ষকদের। তারা নিজেদের জীবন গড়ার জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকে তাদের ওপর। নূর আলম তার এই ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়ে উদারহস্ত। তাদের পড়ালেখাসহ যেকোনো সমস্যার সমাধান করেন খুব মনোযোগ দিয়ে, ভালোবেসে।
তাদের এখানে একটি সুবিধা আছে—গড়পড়তা শিক্ষকের মান ভালো। তারা সবাই নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করে নিয়েছেন। আর সবুজ বিদ্যাপীঠ স্কুল ও কলেজের বয়সও কম নয়। ১৯৮১ সাল থেকে যাত্রা। ৪৩ বছর হয়ে গেছে, মাঠ নেই, তবে সামনে খোলা জায়গা আছে বেশি খানিকটা। বিদ্যালয়ের নিয়মনীতি মেনে সেখানেই বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ফেলেছেন তারা এবারও। বিদ্যালয়টিতে কলেজের অনুমোদন নেই, সে চেষ্টাও চলছে। কাজলা এলাকায় বিদ্যালয়ের নামে জায়গা কেনা আছে। ফলে সেখানে আরেকটি ক্যাম্পাস চালু করে ফেলবেন তারা, তখন অনেকটাই এগিয়ে যাবেন। সেই ভালো ভালো বিদ্যালয় ও কলেজের নামের পাশে তাদেরটিও জ্বলজ্বল করবে।
এই বিদ্যালয়ে এখন মোট ৫৯ শিক্ষক আছেন, শিশু থেকে দশম শ্রেণিতে এক হাজার ৬৫০ ছাত্রছাত্রী আছে। কর্মচারী আছেন আটজন আর অফিস স্টাফ আছেন তিনজন। তাদের নিয়ে গড়া এই বিদ্যালয়ের ফলাফলও খুব ভালো। টানা দু-তিন বছর ধরে বুয়েট ও এমআইএসটিতে তাদের ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হচ্ছে। এ বছরও দুজন মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছে। ভালো ফল করলে খুব খুশি হন—এর কারণ হলো নূর আলমের মতো শিক্ষকদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম।
নূর আলম ঘুম থেকে ওঠেন সকাল সাড়ে ৬টায়। তারপর একটানা বিকাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ের পেছনেই সময় দেন। তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্যও এই—আমার সবুজ বিদ্যাপীঠ ভালো বিদ্যালয়ে পরিণত হবে, দিন দিন ভালো করবে। ছাত্রছাত্রীদের ভালো করার কয়েকটি গোপন রহস্য আছে এই বিদ্যালয়ের। ক্লাসরুমগুলো ছোট ছোট; ৫০ থেকে ৫৫ জনের বেশি ভর্তি করেন না তারা প্রতিটিতে। নূর আলম জানালেন, ‘আমাদের ভালো ফলাফলের অন্যতম কারণ হলো এটি। একটি শ্রেণিকক্ষে ৬০ থেকে ৭০ ছাত্র ভর্তি করলে শিক্ষক ক্লাসের নিয়ন্ত্রণ আর রাখতে পারেন না। তাদের দুর্বলতাগুলোর একটি হলো—প্রায় সব ছাত্রছাত্রীই স্থানীয়। বাইরের স্টুডেন্ট খুব কম। ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ছাত্রছাত্রী নিয়েই চলতে হয়। এই বিদ্যালয়ে ১৬-১৭ জন আছেন, যারা এমপিওভুক্ত শিক্ষক।
নূর আলম ডে শিফটের শিক্ষক। দিবা শাখাকে আরো ভালো করতে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি ক্লাস নিতে হয়। তিনি ছাত্রছাত্রীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর জন্য প্রতিদিন আলাদা প্রস্তুতি নেন। লেসন প্ল্যান করেন, সে অনুযায়ী পড়ান। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন দেখে আসতে হয়। তিনি জানালেন, ভালো শিক্ষকরা লেসন প্ল্যান অনুসরণ করেন। যেসব শ্রেণি উপকরণ এবং রসায়ন বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যেসব উপকরণ ব্যবহার করতে হয়, তিনি সেগুলো নিয়মিত ব্যবহার করেন। গর্বের সঙ্গে তিনি জানালেন, আমাদের একটি গবেষণাগার আছে, সেটি খুবই আপডেট। আর বিজ্ঞানের প্রতি প্রতিটি বিদ্যালয়ের আলাদা মনোযোগ থাকে। তাদের বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরাই বেশি ভালো করে। কলেজ হিসেবে ফি বছর তারা নটরডেম, ঢাকা কলেজ, সবুজবাগ সরকারি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ ও বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ কলেজে ভর্তি হয়। প্রতিবারই ফলাফলের দিক থেকে পাঁচ-সাতজন তাক লাগিয়ে দেয়। সেগুলো হয় পঞ্চম, অষ্টম ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। ফি বছরই তাকে শুনতে হয়—‘স্যার আপনার জন্য আমি ভালো কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি।’ মেয়েরাও ভালো করে এখানে। নারী শিক্ষকদের মানও ভালো বলে জানালেন তিনি।
তার রসায়ন বিষয়টি অনেকটাই ব্যবহারিক। তিনি জানালেন, ‘থিওরির পাশাপাশি আমি ব্যবহারিক মিলিয়ে এমনভাবে পাঠদান করি, যাতে তারা উচ্চমাধ্যমিকে গেলে কোনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে না পড়ে, খুব সহজেই ভালো করতে পারে।’ ব্যবহারিকের অংশ হিসেবে এই অক্টোবরে প্রথম বিজ্ঞানমেলা করেছেন নিজ উদ্যোগে। মার্চে আরেকটি বিজ্ঞানমেলার আয়োজন করবেন। ইংরেজিতে পারদর্শী করতে ইংলিশ ক্লাব যাত্রা শুরু করেছে সবুজ বিদ্যাপীঠ স্কুল অ্যান্ড কলেজে।
শ্রেণিকক্ষে ছাত্ররা যেসব প্রশ্ন করে, সেগুলো তিনি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেন। কৌতূহলী মনগুলোর কৌতূহলের জবাব দেন শ্রেণিকক্ষে ও গবেষণাগারে। কখনোই ছাত্রছাত্রীদের হতাশ করেন না তিনি, যা তার বড় গুণ। বিদ্যালয়-সম্পর্কিত যেকোনো সমস্যার সমাধানে তিনি সবার আগে থাকেন। বিদ্যালয় ভালো করার জন্য প্রধান শিক্ষককে সবসময় পরামর্শ দেন। কোনো ছাত্র বা ছাত্রী খুব ভালো ফলাফল করলে বা পুরস্কার পেলে তার খুব ভালো লাগে, শিক্ষকতাকে সার্থক মনে হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

