রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

উৎকর্ষের স্বপ্ন নিয়ে

মো. স্বাধীন খন্দকার

উৎকর্ষের স্বপ্ন নিয়ে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার আবেদন শুরু কাল

ঐতিহ্য, সবুজ আর স্বপ্নের বিস্তৃত মানচিত্র যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ৭৫৩ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের বীজ বুনছে। কিন্তু এই বিশাল পরিবারের ভেতরেই জমে আছে কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংকট, যা শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি আমার দেশ পাঠকমেলা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আহ্বায়ক মো. স্বাধীন খন্দকার, সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ আলি রাজা, যুগ্ম সদস্যসচিব সুরঞ্জিত চন্দ্র পালসহ অন্যরা। আলোচনায় তারা শুধু সমস্যাই নয়, সম্ভাব্য সমাধানের একটি রূপরেখাও উপস্থাপন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে শিক্ষকসংকটকে চিহ্নিত করা হয়। অনুমোদিত পদের উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একজন শিক্ষককে অতিরিক্ত ক্লাস, খাতা মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে গবেষণার জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে টিউটোরিয়াল, একাডেমিক পরামর্শ এবং গুণগত শিক্ষার ওপর। পাশাপাশি পাঠ্যক্রমেও রয়েছে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি। প্র্যাকটিক্যাল ও ফিল্ডওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত গবেষণাগার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণা খাতে বরাদ্দও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয় বেতন-ভাতা ও পেনশনে; গবেষণায় বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল। বরাদ্দ থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা, বিল-ভাউচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বিলম্বের কারণে অনেক অর্থ সময়মতো ব্যবহৃত হয় না। বক্তারা একটি কার্যকর ‘রিসার্চ ম্যানেজমেন্ট সেল’ গঠনের প্রস্তাব দেন, যা গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, অর্থছাড় ও ক্রয়প্রক্রিয়াকে সহজ এবং স্বচ্ছ করবে। গবেষণা দুর্বল হলে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে—এ কথা আলোচনায় জোর দিয়ে বলা হয়।

আবাসন সংকট ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের সুবিধা পায়; বাকিরা মেস বা ভাড়া বাসা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাসে আসে। নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আগত অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি এক নীরব সংগ্রাম। ধাপে ধাপে নতুন হল নির্মাণ, পুরোনো হল সংস্কার এবং স্বচ্ছ সিট বণ্টন নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব উঠে আসে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠনের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামোর অভাব নিয়েও আলোচনা হয়। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও কমনরুমের সংকট এবং বিকালের পর নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতি তাদের স্বাচ্ছন্দ্যকে ব্যাহত করে। একাডেমিক ভবনে পর্যাপ্ত লিফট না থাকায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো জরুরি—এ বিষয়ে সবাই একমত হন।

প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। নির্ভরযোগ্য উচ্চগতির ওয়াইফাই না থাকায় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক জ্ঞানভান্ডারে সহজে প্রবেশ করতে পারে না। অনলাইনভিত্তিক প্রশাসনিক সেবার অভাবও ভোগান্তি বাড়ায়। ডিজিটাল সংযোগ আজ জ্ঞানের প্রধান সেতু; তাই প্রতিটি একাডেমিক ভবনে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ই-গভর্ন্যান্স চালুর দাবি জানানো হয়।

ছাত্রসংগঠন ও প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর সক্রিয়তার বিষয়েও আলোচনা হয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও গঠনমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ছাত্র প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন। বিশেষ করে রাকসুর দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে এ সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানানো হয়।

সম্ভাব্য সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরে আহ্বায়ক মো. স্বাধীন খন্দকার বলেন, সংকট এক দিনে দূর করা সম্ভব নয়; তবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা, গবেষণা ব্যবস্থাপনায় পেশাদারত্ব, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন এবং মাননিশ্চয়ন প্রক্রিয়া জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি আধুনিক ল্যাব, মানসম্মত লাইব্রেরি ও ই-রিসোর্সে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলেন।

যুগ্ম সদস্যসচিব সুরঞ্জিত চন্দ্র পাল গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বমানের গবেষণা পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ মেন্টরশিপ ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা হবে নিরপেক্ষতার মন্দির, যেখানে জ্ঞানের আলোই সর্বোচ্চ, কোনো পক্ষপাত নয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের আশা এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। সংকট আছে, তবে সম্ভাবনাও অসীম। সৎ উদ্যোগ, দায়বদ্ধ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব। সবুজ এই ক্যাম্পাস আবারও জ্ঞান, গবেষণা ও উৎকর্ষের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশাই উচ্চারিত হয়েছে আলোচনার শেষে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন