আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে চলছে কথার লড়াই। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই দুই দলের নেতারা হঠাৎ করেই নির্বাচনের সময়সূচি, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে লিপ্ত হয়েছেনÑএমন চাপান-উতোর। দল দুটির কর্মী-সমর্থকরাও জড়িয়ে পড়েছেন এ বিতর্কে। ৎ
তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের পেজে পোস্ট দিচ্ছেন এসব নিয়ে। অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন—রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু-মিত্র বলতে কিছু নেই। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই পক্ষই পয়েন্ট নেওয়ার চেষ্টা করবে।
১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠিত হলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের কাছাকাছি আসে। দল দুটি ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায়ও আসে। ২০০৯ সালে বিরোধী দলে গেলে চারদলীয় জোট থেকে ২০ দলীয় জোট হয়। ২০১৪ সালের পর থেকেই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটকে বাদ দিয়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে জোট গঠন করে বিএনপি।
একাদশ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জামায়াত অংশ নিলেও বিএনপির সঙ্গে সখ্যের সুতোটা ঢিলে হয়ে যায়। দ্বাদশ নির্বাচনে আগে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনেও নেয়নি জামায়াতকে। তারপরও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে তালমিলিয়ে স্বতন্ত্রভাবে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। কিন্তু ওইসব কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর আক্রমণে পর্যুদস্ত-আহত জামায়াত নেতাকর্মীদের নিয়ে কোনো বিবৃতি না দেওয়ার অভিযোগ এনে ওই কর্মসূচি পালন থেকেও বিরত থাকে দলটি।
পরে জামায়াত নেতা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিবৃতি এবং তারেক ও তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে সাজা দেওয়ার রায়ের প্রতিবাদে জামায়াতের বিবৃতিতে দল দুটি সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ হয়। তাদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে উন্নীত হয় যে, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য জামায়াতকে এক মঞ্চে নিয়ে আন্দোলন করারও চিন্তা করে বিএনপি। তবে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর দুই দলের বিরোধ আবার সামনে চলে আসে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর দল দুটির মধ্যে প্রথম বিরোধ দেখা দেয়, বর্তমান সরকারের মেয়াদ নিয়ে। এরপর সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন নিয়েও মতপার্থক্য দেখা যায় বিএনপি ও জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের কথায়।
গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে রংপুরের পাগলাপীরে দলের এক পথসভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়। ওইদিন জামায়াত আমির বলেছিলেন, ‘দেশে পরীক্ষিত দুটি দেশপ্রেমিক শক্তি আছে–একটি সেনাবাহিনী, আরেকটি জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ সরকার এ দুই শক্তিরই ক্ষতিসাধন করেছে। আগেই সেনাবাহিনীর ক্ষতিসাধন করেছে। পরে জামায়াতকে তছনছ করে দিতে উঠে পড়ে লাগে।’
এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাজধানী ঢাকা ও সিলেটে আয়োজিত দলের দুটি অনুষ্ঠানে বেশ কড়া বক্তব্য রাখেন। তিনি জামায়াত আমিরের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নিজেদের দেশপ্রেমী বলায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশপ্রেমিক নিঃসন্দেহে। আমি সেই রাজনৈতিক দলকে বলতে চাইÑ ইসলামপন্থি সেই রাজনৈতিক দল, একাত্তরে আপনাদের ভূমিকা কী ছিল? আপনারা কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন?
আপনারা কোন সেক্টর কমান্ডারের আন্ডারে যুদ্ধ করেছেন? বাংলাদেশে কেউ দেশপ্রেমিক নেই, শুধু একটি রাজনৈতিক দল দেশপ্রেমিকÑএ ধরনের বিভ্রান্তি আপনারা তৈরি করলে মানুষ হাসবে।’ এর আগে জাতীয়তাবাদী রিকশা-ভ্যান অটোশ্রমিক দলের পক্ষে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রিজভী ‘৫ আগস্টের পর একটি রাজনৈতিক দলের আত্মসাৎ দেখেছে জনগণ, কারা পায়ের রগ কাটে তাদের চেনে জনগণ, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে একাত্তরের বিরোধিতাকারী জামায়াত’— জামায়াতকে নিয়ে এমন নানা অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন। জামায়াত বিবৃতি দিয়ে রিজভীর এসব বক্তব্যের জবাবও দেন।
এরপর গত ৯ জানুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা দলের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদও জামায়াতকে নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম এখন একটা সুযোগ এসেছে, এ সুযোগে তারা (জামায়াত) একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। সেটি না করে তারা একাত্তরে তাদের ভূমিকাকে জাস্টিফাই করছে এবং দেশপ্রেমিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’
হাফিজের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ নামের একটি সংগঠন। এ পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মুসলেহ উদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেন, তাদের এ বক্তব্যে আমরা বিস্মিত ও হতবাক হয়েছি। স্বাধীনতার ৫৩ বছরে আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও ইসলামি দল সম্পর্কে যেসব গণবিরোধী বয়ান দিয়ে দেশ ও জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, এ বক্তব্যে সেই সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর কোনো উদ্যোগ বিএনপির পক্ষ থেকে নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘এমন কোনো দূরত্বের কিছু নেই। তারাও গণতন্ত্র চায়, নির্বাচন চায়। মানুষের অধিকারের কথা বলে, আমরাও বলি। কিন্তু যদি কেউ বলে, শুধু তারাই দেশপ্রেমিক, তাহলে তো আমাদের কষ্ট লাগবেই। আমরা তো বলব, ভাই কথাটা ঠিক না।’
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি বৈঠক করবে কি নাÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে ফরমালি যুগপৎ আন্দোলনে আমরা ছিলাম না। তাদের কর্মসূচি আমাদের কর্মসূচি একরকম ছিল না। কিন্তু তারা আন্দোলনে ছিলেন। নিশ্চয়ই আগামী দিনে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সবাই আমরা থাকব, তারাও থাকবে। এটা নিয়ে কনফিউশনের কিছু নেই।
জামায়াতের জনপ্রিয়তাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না বিএনপি : জামায়াত
বিএনপির সাম্প্রতিক বিরোধের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে পরশ্রীকাতরতাকে দায়ী করছেন জামায়াতের নেতারা। এ বিষয়ে জামায়াতের মুখপাত্র কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দের মন্তব্য জানতে চেয়েও পাওয়া যায়নি। তবে দলটির ঢাকা মহানগরের এক নেতা জানান, গত ৫ আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী সারাদেশে জামায়াতের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বেড়েছে।
এই ভালো অবস্থানকে হয়তো ভালোভাবে নিচ্ছে না বিএনপি। তারা মনে করছে, দেশে আওয়ামী লীগ না থাকলে তাদের রাজনীতিও থাকবে না। আর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে না ফেরানোর বিষয়ে জামায়াত ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতারা একমত। এসব কারণে ছাত্রদের সঙ্গে বিএনপির বনিবনা হচ্ছে না। বামপন্থিরাও বিএনপির ঘাড়ে চেপে জামায়াতের অবস্থান ও জনপ্রিয়তা ঠেকাতে বিএনপিকে ব্যবহার করছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
২০০৮-এর পর থেকে দেশে সঠিক কোনো জাতীয় নির্বাচন হয়নি জানিয়ে জামায়াতের এক নেতা বলেন, সঠিক একটা নির্বাচন হলে বর্তমানে জামায়াতের ভোটার হার বোঝা যাবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মাঠে এরকম কথাবার্তা চলেই। আমরা রাজনীতিতে সংঘাত চাই না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জামায়াতের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান। আমরা তো চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলছি, কারো নাম বলছি না। চাঁদাবাজি না করলেই তো হয়। এটা নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো প্রয়োজন হয় না।
নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই পক্ষই পয়েন্ট নেওয়ার চেষ্টা করবে : ড. সাব্বীর আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও বাংলাদেশ পলিটিক্যাল সায়েন্স নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ড. সাব্বীর আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ‘প্রথম কথা হলো রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু-মিত্র বলতে কিছু নেই। এটা সত্য যে, একসময় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের মিত্রতা ছিল।
৫ আগস্টের সময়ও দেখেছি, তারা দু’পক্ষই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, তারা স্থায়ী মিত্র থাকবে। তাদের প্রত্যেকেরই স্বকীয় অবস্থান রয়েছে। দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থে স্বাধীনভাবে তারা তাদের স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। এটাতে কোনো দোষের কিছু নেই। এটা রাজনৈতিকভাবে অসিদ্ধ কিছু নয়।
তিনি মনে করেন, সামনে নির্বাচন আসছে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই পক্ষই পয়েন্ট নেওয়ার চেষ্টা করবে। সুতরাং একে-অপরকে নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য অস্বাভাবিক কিছু না।
তবে তিনি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া ‘সেনাবাহিনী ও জামায়াত দেশপ্রেমিক শক্তি’ বক্তব্যকে অস্বাভাবিক বলে মনে করেন। তিনি বলেন, শফিক সাহেব যে কথাটা বলেছেন, এটা একেবারেই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। এ রকম বক্তব্য একটা দলের প্রধানের কাছ থেকে আশা করা যায় না। সাব্বীর আহমেদ আরও বলেন, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দেশের জনগণের ধারণা স্পষ্ট। এমনকি যারা জামায়াত করে বা করত তারাও তা জানে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

