বিএনপি ক্ষমতায় আসলে মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিবিজড়িত বিডিআর নাম পুনর্বহাল করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়াও রাজনৈতিক স্বার্থে কোনোভাবেই সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কাজ বিএনপি অতীতেও করেনি, বর্তমানেও করে না এবং ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও করবে না।
শনিবার রাতে রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লুতে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক বাহিনীর সদস্য ও পিলখানায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সবসময় বাংলাদেশের পক্ষের দল। বিএনপি সবসময় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। রাজনীতির মাঠে বিএনপি শক্তিশালী থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও শক্তিশালী থাকে, সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ইনশাল্লাহ অক্ষুণ্ন থাকে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা, বিডিআর শহীদ পরিবারের সদস্য এবং সাংবাদিকদের উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, আজকের এই আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রতি তিনি ও তার স্ত্রী আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।
মতবিনিময় সভায় নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি ও আমার স্ত্রী আজ কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি। বরাবরই সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে আমি আমাদের বৃহত্তর পরিবার হিসেবেই মনে করি। তিনি বলেন, শৈশবে পিতাকে হারালেও বড় হয়ে দেখেছেন সেনাবাহিনীর প্রতি তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এক ধরনের নির্ভরতা ও সম্মান ছিল। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, সন্তান হিসেবে আমি যেমন আমার পিতাকে নিয়ে গর্ব করি, তেমনি একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শহীদ জিয়া সেনাবাহিনীকেও গর্বিত করেছিলেন। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক জনগণ যেমন শহীদ জিয়াকে নিয়ে গর্বিত, তেমনি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও তাকে নিয়ে গর্বিত বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

তারেক রহমান বলেন, জনগণ সেনাবাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নির্ভরযোগ্য প্রহরী হিসেবে দেখে। সেনাবাহিনীকে ভিন্ন কাজে যুক্ত করা হলে তাদের মূল দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বিগত দেড় দশকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও গৌরব নিয়ে সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করলে অনেক উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশ যখন ফ্যাসিবাদ ও তাঁবেদার অপশক্তির কবলে পড়ে, তখন শুধু গণতন্ত্র ও মানুষের স্বাধীনতাই নয়, একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়ে।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর সেনা হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ওই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও দিনটিকে সেনাবাহিনী যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে পারেনি বা পালন করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “আমি সেনাবাহিনীর হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলতে চাই না; বরং গৌরব অর্জন ও তা ধারণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর গৌরব সেনাবাহিনীকেই রক্ষা করতে হবে।”
তিনি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের নিজেদের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, সেনাবাহিনী অবশ্যই রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকবে, তবে রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাওয়া কখনোই উচিত নয়।
মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান আরও বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর পতিত ও পলাতক ফ্যাসিবাদী অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে দেয়, এমনকি তাদের ইউনিফর্মও বদলে ফেলা হয়। তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিডিআরের নাম পুনর্বহাল করতে চাই।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে পিলখানা সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবসকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ বা ‘সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস’ অথবা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিবস হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত বিভিন্ন সুপারিশের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন, সেনা আইনের কিছু বিধিমালা সংস্কারসহ প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে এসব সুপারিশ পর্যালোচনা ও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এছাড়া সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও সদস্যদের দীর্ঘদিনের দাবি ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পে’ নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমরা ইতোমধ্যেই আমাদের দলীয় ম্যানিফেস্টোতে ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পে অন্তর্ভুক্ত করেছি এবং বাস্তবায়নের ঘোষণা জাতির সামনে দিয়েছি। বিএনপি সরকার গঠন করলে যত দ্রুত সম্ভব এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিশেষে তারেক রহমান বলেন, আমাকে ও আমার স্ত্রীকে এই সুন্দর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। সকলে ভালো ও সুস্থ থাকবেন ইনশাল্লাহ। আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

