ফ্যাসিবাদ-একনায়কতন্ত্র কিছুদিন টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত টেকে না: রিজভী

ফ্যাসিবাদ-একনায়কতন্ত্র কিছুদিন টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত টেকে না: রিজভী

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক সাংবাদিক ফ্যাসিস্টের পক্ষে কাজ করেছেন, কিন্তু সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ফ্যাসিবাদের পক্ষে রুহুল আমিন গাজীদের মতো সাংবাদিকরা বিবৃতি দেন না। ফ্যাসিবাদ বা একনায়কতন্ত্র কিছুদিন টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত টেকে না।

তিনি বলেন, রুহুল আমিন গাজীর মতো মানুষেরা নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। এ কারণেই তাদের অবস্থান মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। তিনি এমন একজন সাংবাদিক ছিলেন, যাকে দিয়ে ফ্যাসিবাদের পক্ষে কোনো বক্তব্য দেওয়ানো সম্ভব হয়নি। অনেক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী তৎকালীন সরকারের পক্ষে অবস্থান নিলেও রুহুল আমিন গাজীর মতো মানুষ সব ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেও নিজের অবস্থানে ছিলেন। সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রুহুল আমিন গাজীর সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী থাকতেন। সাংবাদিকদের কর্মসূচি ও পেশাজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি জানতে চাইতেন। রুহুল আমিন গাজীর ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে খালেদা জিয়া গুরুত্ব দিতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, রুহুল আমিন গাজীর মুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন। ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় প্রেসক্লাবেও নানা চাপ তৈরি করা হয়েছিল। চারদিকে যখন কথা বলার জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছিল, তখন প্রেসক্লাব কিছুটা হলেও মতপ্রকাশের জায়গা করে দিয়েছিল।

বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) উদ্যোগে বিএফইউজের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে রিজভী বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্যে নানা ধরনের রেটরিক থাকতে পারে। কিন্তু বিরোধী দলের নেতাকে ‘তুই’ করে সম্বোধন করা বা অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। এ ধরনের সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি তিনি চান না।

জল্লাদেরা চারদিকে অবস্থান নিয়েছে উল্লেখ করে মহাসচিব রিজভী আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটলে রাষ্ট্রই থাকবে না। এজন্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যতই মতানৈক্য ঘটুক, ফ্যাসিবাদ যেন ফিরে না আসে, সে বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। গণতন্ত্র মানে যা ইচ্ছা তা-ই বলা নয়। রাজনৈতিক বক্তব্যে তীব্র সমালোচনা করা গেলেও সেখানে মার্জিত ভাষা ব্যবহার করা উচিত। বিরোধী দলের কর্মসূচি ও বক্তব্যের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও শালীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন। গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য ও বোঝাপড়া থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেন ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক, কবি আবদুল হাই সিকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাংবাদিক বাছির জামাল, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ূব ভূঁইয়া, সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল বাছির, খাইরুল বাশার, ড. হাসনাত করিম পিন্টু, বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম মহসিন প্রমুখ।

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দেশে যখন কোনো অন্যায়, অবিচার, অব্যবস্থাপনা কিংবা মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো আইন বা বিধান দেখা যাবে, তখন সাংবাদিকদের সোচ্চার হতে হবে। সাহসের সঙ্গে এসব বিষয় তুলে ধরতে হবে। সরকার যাতে সঠিক পথে থাকে, সে জন্য সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘ লড়াইয়ের মাধ্যমে আমরা এই দেশ পেয়েছি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাস্তবতায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় একটি সুন্দর ও সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধান তৈরি ও সংস্কার করতে হবে। আমরা আইনের শাসনের পক্ষে, মানবিক শাসনের পক্ষে। আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে চাই। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দুঃসাহসিক ভূমিকা প্রয়োজন।

রুহুল আমিন গাজীর স্মৃতিচারণ করে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে রুহুল আমিন গাজী নিঃসন্দেহে একজন কৃতিত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্ব পালন করার সময় রুহুল আমিন গাজীর প্রধান অগ্রাধিকার ছিল সাংবাদিক ও সহকর্মীদের কষ্ট-বেদনা লাঘব করা এবং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো আদায় করা। অনেকেই যখন কথা বলতে পারেননি, তখন তিনি দৃঢ় ও বলিষ্ঠভাবে কথা বলেছেন। সাংবাদিকদের অধিকার ও সত্যের পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট।

তিনি আরও বলেন, সত্য কথা বলা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে হাতে গোনা যে কয়েকজন সাংবাদিক দুঃসাহসিক ভূমিকা রেখেছেন, রুহুল আমিন গাজী তাঁদের অন্যতম। সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান, শফিক রেহমান, দৈনিক সংগ্রামের আবুল আসাদসহ অনেক সাংবাদিক বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কিন্তু সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার ক্ষেত্রে তারা আপস করেননি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন