বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে লোক দেখানো তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যা সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সংরক্ষিত আসনের সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
সরকার রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক—সকল পর্যায়ে দৃঢ় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানে কাজ করছে। এই সংকটের সৃষ্টি মিয়ানমারের এবং এর টেকসই সমাধানও নিহিত রয়েছে মিয়ানমারেই। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য নিজ ভূমিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন। এ লক্ষ্যে সকল পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে আমরা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছি। বন্ধু রাষ্ট্র, দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রচলিত কূটনীতির পাশাপাশি ট্র্যাক ১ পয়েন্ট ৫ ও ট্র্যাক ২ কূটনীতির সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সম্প্রতি রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে ক্যাম্পের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের ইভেন্ট আয়োজন করছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আশা করছি ওই ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী প্রধান বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট ও প্রত্যাবাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন সুসংহত হবে।
সাতক্ষীরা-২ আসনের মুহাম্মদ আব্দুল খালেকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে সরকার আন্তরিক। তবে সেটা অবশ্যই সমমর্যাদার ভিত্তিতে হতে হবে। সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও বৈধপথে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি আলোচনার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
সীমান্তে পুশইন ইস্যুতে সংরক্ষিত আসনের নেওয়াজ হালিমা আরলীর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, সীমান্তে কোনো ধরনের পুশইন বা পুশইনের প্রচেষ্টাকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের গভীর উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে সীমান্তে পুশইন রোধে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে।
সংরক্ষিত আসনের নিপুন রায় চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনগুলো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপের আওতায় কাজ করছে। সরকারের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের আওতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে এফডিআই জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশ ও সামগ্রিক বিনিয়োগ ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যশোর-৫ আসনের গাজী এনামুল হকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের কারাগারে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ৬৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক বন্দী বা কারাগারে রয়েছেন। যারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন, তারা সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার অধীন থাকেন। সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ৬৩টি দেশে বাংলাদেশের ৮৬টি কূটনৈতিক মিশন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে কার্যক্রমে দুর্বলতা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দূতাবাসগুলোকে একটি জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের মো. জালাল উদ্দীনের প্রশ্নের জবাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তি একটি জটিল, ব্যয়বহুল ও কৌশলগত নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ বছর ডিসেম্বর মাসে ইউনিট-১-এর কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা যায়। তিনি জানান, দেশে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতার লক্ষ্যে স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তি স্থাপনের সম্ভাবনা এবং এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সুযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য অংশীদার দেশসমূহের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে। তবে এ বিষয়ে আলোচনা এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


