গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

গুম প্রতিরোধে ভালো আইন আনার প্রতিশ্রুতি রাখেনি সরকার

গুম প্রতিরোধে ভালো আইন আনার প্রতিশ্রুতি রাখেনি সরকার
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এনসিপির আয়োজিত মানবাধিকার কমিশন ও গুম আইনবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী। ছবি: আমার দেশ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বও এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে।

তিনি বলেন, সরকার আরো ভালো আইন আনার কথা বলে বরং উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।

বৈঠকে আখতার হোসেন বলেন, গুমের ভুক্তভোগী কোনো পরিবার অভিযোগ করতে গেলে, অভিযোগ মিথ্যা হলে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে। আমরা একটা ফেয়ার সিস্টেম বাংলাদেশে চাই। একটা জবাবদিহি চাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রটা আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু আমলা ও বাহিনীর মতামতের ভিত্তিতে নয়, সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে ধারণ করে নতুন করে আইনগুলো প্রণয়ন করতে হবে। বর্তমান খসড়া আইন এভাবেই সংসদে পাস হলে মানবাধিকার সুরক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা থেকে বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, অতীতে তো বাহিনীগুলো গুম করত, মানবাধিকার লঙ্ঘন করত, তারা দায়মুক্তি পেয়ে যেত। তো সামনেও কি আমরা এরকম দেখতে চাই? অতীতের মতো দায়মুক্তির সংস্কৃতি আর ফিরিয়ে আনা উচিত নয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের একটি শক্ত আদর্শগত ভিত্তি প্রয়োজন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব নয়। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে এগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না।

গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি এই ভুল পথ থেকে সরে এসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।

আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। দায়িত্বশীল রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি এবং রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কথা যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব। নিরাপত্তা বাহিনী সংক্রান্ত অভিযোগে এনএইচআরসির স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা বহাল, কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা এবং গুম আইনের দুর্বলতা সংশোধন জরুরি। নতুন সরকার অতীতের পথ থেকে সরে এসেছে- এটি শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। জুলাই সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহারে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আপনারা ভোটের আগে বলে আসছেন, আপনারা ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করবেন, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন করবেন, মানবাধিকার স্বাধীন করবেন। এটাও আছে নির্বাচনি ইশতেহারে যে, মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হবে এবং এটাকে একটা গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড মেনে প্রতিষ্ঠা করা হবে। তো একটা কথাও তো আপনারা মানছেন না।

বৈঠকে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক তিনটি আইনি পরিবর্তনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করা এবং অভিযোগ অভিযুক্ত বাহিনীর কাছেই পাঠানোর ব্যবস্থা এর উদাহরণ। র‍্যাবের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত তদন্ত কাঠামো স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করে না।

তিনি আরো বলেন, কর্মকর্তাদের সুরক্ষার যুক্তিতে স্বাধীন তদন্ত বন্ধ করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন পরও পুরোনো অপরাধের ঘটনায় কর্মকর্তারা আইনের আওতায় আসতে পারেন। এমনকি বহু বছর পরও সামান্য একটি সূত্র ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার করা সম্ভব। তবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় অভিযানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করি। এজন্য স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা বাতিল না করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আলাদা আইনি কাঠামো করা উচিত বলে মত দেন তিনি। তার মতে, স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করলে কর্মকর্তাদের প্রকৃত সুরক্ষা হবে না; বরং ভবিষ্যতে তারাই বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো খাসলত বদলায় না কেন- এটি বোঝা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছু ওয়াদা করে, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে না। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মানুষকে অধিকার না দিলে তাকে মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পুলিশ কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রের সংকট কাটাতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ক্ষমতার কাঠামো আলাদা করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।

এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হুসাইনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরো অংশ নেন আইনজীবী ও সাবেক বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য তানিম হোসেন শাওন, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার, মানবাধিকার কর্মী রুবি আমাতুল্লাহ প্রমুখ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন