রাত গভীর হতে না হতেই জনসভার মাঠ যেন রূপ নেয় অপেক্ষার প্রহরে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রথম নির্বাচনি জনসভাকে ঘিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে বুধবার দিবাগত রাত থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। লক্ষ্য একটাই—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিজের চোখে এক নজর দেখা।
সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানা বিএনপির সদস্য আব্দুল হক রাতেই মঞ্চের সামনে জায়গা নিয়ে বসেছেন। তিনি বলেন, এর আগে এই মাঠে খালেদা জিয়ার জনসভায় দুইবার এসেছি। কিন্তু তারেক রহমানকে কখনো সামনে থেকে দেখা হয়নি। সকালে জনসভা শুরু হলে হয়তো সামনে জায়গা পাব না—তাই রাতেই চলে এসেছি।
বুধবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা মাঠে এসে অবস্থান নিচ্ছেন। কেউ মাদুর পেতে বসছেন, কেউ শীতের কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উৎসবের নগরী সিলেট
তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো সিলেট শহর যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাত যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি। কখনো ‘ধানের শীষ’, কখনো ‘বিএনপি’, আবার কখনো ‘তারেক রহমান’—এমন স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা।
একই সঙ্গে আলিয়া মাদ্রাসার আশেপাশে ভবনে ও গাছে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিএনপির মনোনয়ন প্রাপ্ত নেতারা ব্যানার ফেস্টুন লাগিয়েছে।
রাত পোহালেই এই মাঠে অনুষ্ঠিত হবে বিএনপির প্রথম নির্বাচনি জনসভা। সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির পাশাপাশি সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এ জনসভা ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা।
দলীয় সূত্র জানায়, এখান থেকেই নির্বাচনি মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে চায় বিএনপি। সে কারণেই জনসভা সফল করতে রাতভর মাঠে অবস্থান করছেন নেতাকর্মীরা।
সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলা থেকে আসা ছাত্রদলের শতাধিক নেতাকর্মীর একজন মোরসালিন বলেন, তারেক রহমানকে কখনো সামনে থেকে দেখিনি। কাল সকালে দেখার সুযোগ পাব—এই আশায় রাতেই চলে এসেছি, যাতে মঞ্চের সামনের সারিতে থাকতে পারি।
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলা থেকে আসা ইমাম উদ্দিন জানান, ২০০৮ সালে খালেদা জিয়ার জনসভায় এসেছিলাম। এবার তারেক রহমানের ভাষণ শুনতে এসেছি। এখান থেকেই আমরা নতুন বাংলাদেশের পরিকল্পনার কথা শুনতে চাই।
আর সুনামগঞ্জ থেকে চারটি বাসে আসা নেতাকর্মীদের একজন ইমাম হোসেন বলেন, শীতের জামাকাপড় নিয়ে এসেছি। রাত এখানেই কাটাব, যাতে সকালে মঞ্চের সামনে থাকতে পারি, হয়তো তারেক রহমানের সঙ্গে হাত মিলানোর সুযোগ পাব।

মাজার জিয়ারত থেকে নির্বাচনি সফর
রীতি অনুযায়ী অতীতের মতো হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রচার শুরু করে বিএনপি। তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটে পৌঁছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি মাজার জিয়ারতে যান।
মাজার জিয়ারত শেষে তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুরে শ্বশুরবাড়িতে যান। দীর্ঘ ২১ বছর পর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া তারেক রহমান সেখানে রাতের খাবার শেষে বাইরে অপেক্ষারত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন এবং ধানের শীষে ভোট চান। ২০০৪ সালের পর এটিই তার প্রথম শ্বশুরবাড়ি সফর—যাকে ঘিরে ছিল বিশেষ প্রস্তুতি।
বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী ব্যস্ত কর্মসূচি
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠের জনসভায় ভাষণ দেবেন। এরপর দুপুরে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ; বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ; সন্ধ্যায় নরসিংদী এবং রাতে নারায়ণগঞ্জে একাধিক নির্বাচনি সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে রাত ১০টার দিকে গুলশানের বাসভবনে ফেরার কথা রয়েছে তার।
আলিয়া মাদরাসা মাঠে এখন শুধুই অপেক্ষা—একটি বড় রাজনৈতিক জমায়েতের, একটি নির্বাচনি বার্তার। রাত জেগে সেই অপেক্ষায় আছেন হাজারো নেতাকর্মী, যাদের চোখে-মুখে একটাই আকাঙ্ক্ষা—নেতাকে সামনে থেকে দেখা, তার কণ্ঠে শোনা আগামী দিনের স্বপ্ন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

