নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধসে বিপুল প্রাণহানি

* নিহত ৩৮৯, শত শত বিদেশিসহ নিখোঁজ অন্তত ১,৫০০

* সৃষ্টি হয়েছে নতুন হ্রদ, আবারও বন্যার শঙ্কা

নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধসে বিপুল প্রাণহানি
নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় কাদা-মাটিতে ঢেকে যায় ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। নেপালের নোয়াকোট জেলা থেকে তোলা। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

‘হিমালয় কন্যা’ হিসেবে পরিচিত নেপালে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ পাওয়া তথ্যমতে, এ দুর্যোগে অন্তত ৩৮৯ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় দেড় হাজার। হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সীমান্তের তিব্বত অংশে অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ এবং ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৯টার দিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। পানি, কাদা ও পাথরের বিশাল ঢল লেন্দেখোলা নদীর উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে একের পর এক গ্রাম প্লাবিত করে। এতে বহু ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ভেসে গেছে।

বিজ্ঞাপন

সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীর উপত্যকায় আকস্মিক হিমবাহ ধসের পর এ ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হিমবাহ থেকে নেমে আসা বিপুল বরফ, পানি ও পাথরের স্রোত উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীতে মিশে যায়। এতে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসতবাড়ি, সেতু ও বৈদ্যুতিক টাওয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। খবর : বিবিসি, আলজাজিরা ও দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট

কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৪০ মাইল উত্তরে হিমবাহ ধসের ঘটনায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ওই জলাধারের বাঁধ ভেঙে গেলে আরো বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।

এদিকে দুর্গত এলাকায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

দুর্গত এলাকায় সামরিক বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্যসহ উদ্ধারকারী দল তৎপরতা চালাচ্ছে। উদ্ধারকাজে নেপালি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর ব্যবহার করছে। তবে নদীর পানির উচ্চতা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং ব্যাপক কাদার কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমান্তের অপর পাশে তিব্বতেও গভীর পলি জমে থাকায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে চীনা উদ্ধারকারী দলগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

নিখোঁজ বহু পর্যটক

নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের ৫ শতাধিক পর্যটক রয়েছেন। নেপালের পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের নাগরিক সবচেয়ে বেশি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ১৭৭ ভারতীয় নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া চীনের ১০০, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, মালয়েশিয়ার ৫৫, ইউক্রেনের ৫৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩, কানাডার ২৫, দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯, জার্মানির ৮ ও জাপানের ৫ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

এর বাইরে নিউজিল্যান্ড ও রাশিয়ার ৫ জন করে এবং সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকার ৬ জন করে নাগরিকেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বেলারুশ, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, ইসরাইল, কাজাখস্তান, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, ফিলিপাইন, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেনেরও কয়েকজন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত বা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

ফের বন্যার শঙ্কা

নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভয়াবহ বন্যার পর নতুন করে বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূমিধসে তৈরি হয়েছে নতুন হ্রদ। এতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী ৩ দিনে সেখানে আরো ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশ করতে পারে। ফলে বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা ও কাদার ঢল নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির ড্রোনে ধারণ করা সবশেষ ভিডিওতে দেখা গেছে, আগের ভূমিধসে তৈরি বিশাল গর্তে পানি জমে নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে।

সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটি দ্রুত বড় হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর দ্রুত নিচের দিকে নেমে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।

উদ্ধার অভিযান সমন্বয়ে ১২ টিম

নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর দেশটির সরকার উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে ১২টি ভাগে ভাগ করেছে। রাসুয়া বন্যা মোকাবিলা কমিটির অধীনে গঠিত পৃথক এই টিমগুলো জরুরি যোগাযোগ, বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপন, উদ্ধার ও ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা এবং নিহতদের ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তা সমন্বয়, সড়ক যোগাযোগ, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, নিখোঁজদের স্বজনদের সন্ধান, ত্রাণসামগ্রী ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনাসহ উদ্ধার, নিখোঁজ ও নিহতদের তালিকা প্রকাশের দায়িত্ব পৃথক দলকে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নেপাল সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ডোর টু ডোর’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

বাড়ছে হিমবাহজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি

নেপালের প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার কারণ বিশাল হিমবাহের অংশ ভেঙে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের ধারণা, জমে থাকা পানি পরে প্রচণ্ড গতিতে ভাটির দিকে ধেয়ে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বুধবার ৫.২ মাত্রার কম্পনে হিমবাহ ধসের কথা জানিয়েছে। বিজ্ঞানী জ্যাকব স্টাইনার বলেন, হিমবাহের নিচের বিশাল অংশ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। উঁচু থেকে বিপুল বরফখণ্ড পড়ার ঘটনা বোমা বিস্ফোরণের মতো প্রভাব ফেলতে পারে।

নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন জরুরি

নেপালের রাসুয়া অঞ্চল এবং ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা এলাকা বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড। সংস্থাটির নেপাল কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদর্শন নেউপানে বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় অসংখ্য পরিবার প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, এই বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কত দ্রুত তীব্র হচ্ছে—তা আবারও তুলে ধরেছে। বন্যার পর রোগের বিস্তার রোধে নিরাপদ খাবার পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এবং যথাযথ পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলেও জানান তিনি।

বিশ্বনেতাদের শোক

নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির ঘটনায় শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের নেতা। একইসঙ্গে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তারা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো জরুরি সরঞ্জাম এবং উদ্ধারকর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এছাড়া বুধবার ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বন্যাকে ‘অত্যন্ত ভয়াবহ’ উল্লেখ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের কেউ হতাহত হননি

নেপালে বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিক নিহত বা আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। দূতাবাস জানায়, নেপালের আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে বুধবার সাময়িকভাবে কাঠমান্ডু-পোখারা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক সেখানে আটকা পড়েছিলেন। পরে তারা নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছান বলে জানিয়েছে দূতাবাস।

ধর্মীয় কারণেই পর্যটকের ভিড়

বন্যাকবলিত নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, ধর্মীয় কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ অঞ্চলের দুটি উচ্চভূমির হ্রদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর একটি তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর; অন্যটি নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড হ্রদ। বছরের এ সময়ে ভারতীয় পর্যটকরা মানস সরোবর ভ্রমণ এবং গোসাইকুণ্ডে পবিত্র স্নানের জন্য যান। আলপাইন কৈলাস ট্রেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ পাণ্ডিত বিবিসিকে বলেন, এই দুর্যোগের সময়ও বিপুলসংখ্যক পর্যটক ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তাদের একটি বড় অংশ এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন