মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের কী লাভ, কী ঝুঁকি

এক চুক্তিতে তিন দেশ, যাকে অনেকেই বলছেন ‘মুসলিম ন্যাটো’। তবে এর আনুষ্ঠানিক নাম মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের এই চুক্তি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যার মূল কারণ এর সামরিক দিক।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ও তুরস্কের হাসান কালিয়ানকু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুরাত আসলাম বলেন, এটিকে আক্রমণাত্মক জোট ভাবা ভুল হবে; এটি মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। এই জোটের নির্দিষ্ট কোনো শত্রু দেশ নেই, বরং এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো- সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবে না এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে। একই সাথে এর বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এতে নতুন নতুন দেশ যুক্ত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে প্রাথমিকভাবে তিনটি দেশ থাকলেও এখানে দেশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে এবং এই আলোচনায় বাংলাদেশের নামও উল্লেখ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, এই চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক। তবে এই জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

গতকাল সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, জোটে যোগদানের বিষয়টি নির্ভর করছে বর্তমান সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর; তারা আমন্ত্রণ জানালে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় অন্যদের উদ্বেগের কোনো অবকাশ নেই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসিব আজিজ বলেন, মক্কা জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের মূলত যৌথ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে, যেখানে তুরস্ক ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব, এআই পার্টনারশিপ এবং বড় সামরিক জোটের মতো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তুরস্ক থেকে বায়রাক্তার ড্রোন এবং অটোকার কোবরা ভেহিকেল আমদানি করছে, যা এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আরো সম্প্রসারিত হতে পারে।

এছাড়া, সৌদি আরব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী এবং বিপুল প্রবাসীর কারণে রেমিটেন্সের অন্যতম বড় উৎস। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের সাথে একটি নৌ প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত রয়েছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হলে তা ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর পেরিয়ে বাংলাদেশের নৌ রুটের সাপ্লাই চেইনকে আরও শক্তিশালী এবং সহজগম্য করবে। এছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বড় ফুটপ্রিন্ট থাকায় বাংলাদেশ উন্নত প্রশিক্ষণ ও কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো অফার করতে পারে।

হাসিব আজিজ বলেন, এই জোটের সামরিক ঝুঁকির প্রধান দিকটি হলো এর একটি বিশেষ নীতি—যেখানে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে তা জোটের বাকি দেশগুলোর ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। ন্যাটোর আদলে এমন কোনো জোটে বাংলাদেশ থাকলে তা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

তবে তুরস্কের ভূরাজনীতির অধ্যাপক মনে করেন, এটি নতুন কোনো ন্যাটো নয়, কারণ এখানে ন্যাটোর মতো কোনো কমান্ড স্ট্রাকচার বা সেনাবাহিনী নেই। যেমন অতীতে সৌদি আরব ইরানের হামলার শিকার হলেও পাকিস্তানকে কোনো যুদ্ধে জড়াতে হয়নি।

তবে এই জোটের অন্যতম ঝুঁকিটি হলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি। এই জোটে পাকিস্তান থাকায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত শুরু থেকেই জোটটিকে সন্দেহের চোখে দেখছে। ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তানের কোনো দ্বন্দ্বে এই জোটের ভূমিকা কী হবে এবং বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, আমি মনে করছি যে আমাদের প্রায়োরিটি অনেকগুলো আছে। সেই প্রায়োরিটিগুলোকে মাথায় রেখে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে আমি একটি সামরিক জোটে আমি জয়েন করতে চাই কিনা এবং একই সাথে আমি মনে করি যে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে আমার সাউথইস্ট এশিয়া আমার জন্য বেশি ইম্পর্ট্যান্ট—আমার ট্রেডের জন্য, আমার ইনভেস্টমেন্টের জন্য নাকি একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বেশি প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কিন্তু তার স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে কখনোই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। তো এটা যদি যোগ দিতে চায় সেটা প্রথম হবে। কোনো কিছুতেই প্রথম হবার আগে আমি মনে করি যে একটু ন্যাশনালি এটাকে আলোচনা করা দরকার।

এটা ঠিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে এক ধরনের অসামরিক নীতি রয়েছে। কিন্তু এটাও একটা বাস্তবতা যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের পর আঞ্চলিক, বিশেষত বাণিজ্যিক নৌরুটের নিরাপত্তার ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। যেখানে মার্কিন নির্ভরতা কমে যাওয়ায় নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে। বাংলাদেশ সেই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ না হয়েই তার অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায় করার সুযোগ পেতে থাকবে কিনা সেটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন