ভালুকায় গ্যাস সংকটে ২০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

ভালুকায় গ্যাস সংকটে ২০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

ময়মনসিংহের ভালুকায় তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অন্তত ২০টি শিল্পকারখানায় কোনো কাজ নেই। এসব কারখানার শ্রমিকরা সকালে কাজে যোগ দিলেও উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে তাদের ছুটি দিয়ে দিচ্ছে। গ্যাসের চাপ দ্রুত না বাড়লে কয়েক দিনের মধ্যে আরও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

ভালুকা গ্যাস অফিসের আশপাশের কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কিছুটা থাকলেও দূরবর্তী কারখানাগুলোতে চাপ একেবারেই কমে গেছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্প পুলিশ-৫-এর পুলিশ সুপার মো. আনছার উদ্দিন জানান, ২০ আগস্ট সকাল থেকে ভালুকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সকালে শ্রমিকরা কারখানায় কাজে যোগ দিলেও গ্যাসের অভাবে ২০টি কারখানার শ্রমিকদের দুপুর ১২টা পর্যন্ত ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় অন্যান্য কারখানাতেও উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে ভালুকার শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। চাহিদামতো গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় অর্ধেকেরও বেশি মেশিন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকপক্ষ। সার্বিকভাবে এ অঞ্চলের প্রধান শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।

শিল্প পুলিশ-৫ (ময়মনসিংহ ইউনিট)-এর হিসাব অনুযায়ী, ভালুকা শিল্পাঞ্চলে মোট ২৯৩টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি কারখানা গ্যাসচালিত। বর্তমানে এসব কারখানা গ্যাস সংকটে ভুগছে।

উৎপাদন সচল রাখতে মালিকপক্ষ জেনারেটর ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আংশিকভাবে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শিল্প পুলিশের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেহাল অবস্থায় রয়েছে টেক্সটাইল ও সুতা তৈরির স্পিনিং মিলগুলো। ভালুকা-গৌরীপুরের টোয়েটা স্পিনিং মিলসে মোট ৫০টি মেশিনের মধ্যে ৪৩টিই বন্ধ রাখতে হয়েছে। মাত্র সাতটি মেশিন পিডিবির বিদ্যুতের মাধ্যমে সচল রেখে কাজ চলছে।

ভালুকার ভরাডোবা এলাকার সীমা স্পিনিং মিলসে গ্যাস সংকটের কারণে ৩০টি মেশিন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে কারখানাটির সার্বিক উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

এ ছাড়া বাশার স্পিনিং, নরটেক্স টেক্সটাইল ও ডেল্টা স্পিনার্সে উৎপাদন ৫০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইলে গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় ৪০ শতাংশ মেশিন বন্ধ রয়েছে। সিরামিক খাতের এক্সিলেন্ট সিরামিকসে ফার্নেস বন্ধ থাকায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে।

শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার গোপীনাথ কাঞ্জিলাল বলেন, সকাল থেকেই গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। কারখানাগুলো সাধারণত বিকেল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত চলে। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম থাকায় দুপুরের খাবারের সময় মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেড, সুলতানা সোয়েটার্স, লিজ ফ্যাশন, টিএম টেক্সটাইল, ত্রিশাল টেক্সটাইল ও বিএসপি স্পিনিং মিলসহ ২০টি প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিকেল ৫টার পর গ্যাসের চাপ বাড়তে পারে। সে সময় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো উৎপাদন চালাতে পারবে।

গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার বিষয়ে মাহাদি সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলেননি। সুলতানা সোয়েটার্স ও বিএসপি স্পিনিং মিলস কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভরাডোবা গোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের ইউটিলিটি বিভাগের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ কম। কারখানায় গ্যাসের ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে ১২ পিএসআই। এতে উৎপাদন প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমে গেছে।

তবে বর্তমানে ভালুকা শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বড় ধরনের ব্যাঘাতের মুখে পড়েছে।

গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ময়মনসিংহের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন) শামীম হোসেন বলেন, ভালুকা এলাকার জন্য ১৪০ ও ১৫০ পিএসআইয়ের দুটি পৃথক লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাস।

তিনি বলেন, সরবরাহ কম পাওয়ায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তারা দ্রুত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে আরও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন