সার মজুতের সরকারি হিসাবে গরমিল

সার মজুতের সরকারি হিসাবে গরমিল

দেশে সার মজুতের সরকারি হিসাব নিয়ে গরমিল দেখা দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব মজুতের মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত মজুত দেখানো হলেও গুদামে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার নেই। আবার কোথাও মজুতের হিসাব হালনাগাদ না করেই পুরোনো তথ্য দেখানো হচ্ছে। এতে সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

বিশেষ করে বোরো ও আমন মৌসুমে কৃষকের চাহিদা বাড়ার সময়ে এ ধরনের হিসাবের গরমিল সংকটকে আরো প্রকট করে তুলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকৃত মজুত যাচাই করে দ্রুত হিসাব সমন্বয় না করা হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ডিলারদের অভিযোগ, কৃষি ও কৃষিকাজের আওতা বাড়লেও সারের বরাদ্দ বাড়েনি।

বিজ্ঞাপন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছর এ সময় দেশে ইউরিয়ার সরকারি মজুত ছিল ১৪ লাখ ৬ হাজার ৯২৬ টন। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৩ হাজার ৩৯৯ টনে। অর্থাৎ এক বছরে ইউরিয়ার মজুত কমেছে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৫২৭ টন।

একইভাবে, ডিএপির মজুত গত বছর ছিল ৪৩ হাজার ৩৪৩ টন। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ৩৬ হাজার ৪০ টন। তবে টিএসপি ও এমওপি সারের মজুত কিছুটা বেড়েছে। গত বছর টিএসপির মজুত ছিল ২৬ হাজার ১২৩ টন, বর্তমানে তা ৩০ হাজার ২৬৫ টন। এমওপির মজুত ৫১ হাজার ৩৫ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৩ হাজার ৩৮৮ টন।

এদিকে, সারের মজুতের এই পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দাবি করেছেন, দেশে চাহিদা অনুযায়ী সারের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, কৃষকদের সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে এবং নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নিবিড় মনিটরিং চলছে। অঞ্চল, জেলা ও গুদামভিত্তিক চাহিদা, বরাদ্দ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় চাহিদার তুলনায় মজুত কমে গেলে অন্য গুদাম বা অঞ্চল থেকে সার সরবরাহ করে ঘাটতি সমন্বয় করা হবে।

এদিকে, সার সংকটের মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। দেশজুড়ে সার বিতরণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব ও একজন যুগ্ম সচিবকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন সদস্য-পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ওসমান ভূঁইয়াকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।

তবে সরকারি মজুত কমে যাওয়া, ডিএপির বাড়তি চাহিদা, আগাম মজুতের প্রবণতা এবং খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দেশে সত্যিই সারের সংকট নেই, নাকি মাঠপর্যায়ে সংকটের আগেই তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম চাপ?

এ বিষয়ে রাজশাহীর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে মাঠে সারের প্রকৃত চাহিদা তুলনামূলক কম। আমন ধান রোপণের কাজ প্রায় শেষ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে আসন্ন আলু মৌসুমকে সামনে রেখে কৃষকরা আগাম সার সংগ্রহ করছেন।

তার ভাষ্যমতে, ইউরিয়ার বিক্রি বর্তমানে তেমন নেই; নন-ইউরিয়া সারের মধ্যে মূলত ডিএপির চাহিদা বেশি। কিছু খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মজুত ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৯ জন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে।

একই চিত্র কুড়িগ্রামেও। সেখানকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় চার খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুতের অভিযোগ ছিল। জেলায় বিসিআইসির ৯৪ জন এবং বিএডিসির ১১৪ জন ডিলার রয়েছেন।

বর্তমানে সারা দেশে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার ডেটাবেজ হালনাগাদের কাজ চলছে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে ৮৫ জন ডিলার, ৩৩০টি পৌরসভায় ৯৯০ জন ডিলার এবং ৪,৫৯২টি ইউনিয়নে নির্ধারিত অনুপাত অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের তথ্য গুগল শিটের মাধ্যমে হালনাগাদ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এর আগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট ডিলার ছিল ১০ হাজার ৮১৪ জন এবং খুচরা বিক্রেতা ছিল ৩১ হাজার ৩৮৪ জন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশে সারের অভাবে কোনো জমির আবাদ নষ্ট হওয়ার রেকর্ড নেই। তার দাবি, প্রতি বছরই কিছু ডিলার বাড়তি মুনাফার আশায় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম করেন।

উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, ডিলারের দোকানে কৃষকের কোনো অস্বাভাবিক ভিড় নেই বলে তিনি জানান।

তিনি আরো বলেন, গত বছরও যেমন সারের অভাবে আবাদ নষ্ট হওয়ার রেকর্ড নেই, এবারও ঘাটতি নেই। কোনো নতুন জমিও বের হয়নি যে সারের চাহিদা হঠাৎ লাফিয়ে বাড়বে। ডিলাররা অনৈতিকভাবে কিছু বাড়তি পয়সা পকেটে নেওয়ার জন্যই মূলত ভীতি তৈরি করছে।

তবে মাঠের কৃষকের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরের কোদালকাটি ইউনিয়নের কৃষক শহীদুল ইসলাম বলেন, আমন মৌসুমে ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের প্রয়োজন থাকলেও তিনি এখনো সার কেনা শুরু করেননি। তার মতে, সরবরাহ একেবারে বন্ধ নয়, তবে কোথাও কোথাও দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, সরকারি মজুত কিছুটা কমলেও মাঠপর্যায়ে সারের জোগান সচল রয়েছে জানান কৃষকরা। তবে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের অবৈধ মজুতদারি ও মনিটরিংয়ের দুর্বলতার সুযোগে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যে চেষ্টা চলছে, তা দ্রুত কঠোর হস্তে দমন করতে হবে বলে জানান তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন