সার সংকট নিয়ে সারা দেশে ছড়ানো তথ্যকে ‘সম্পূর্ণ গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লোটা এবং সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে মানিকগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, যশোরে ভেজাল সার বিক্রি, অতিরিক্ত দাম আদায় ও অবৈধ মজুতের দায়ে একাধিক ডিলার এবং ব্যবসায়ীকে জরিমানা ও বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে।
গত সোমবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম আমার দেশকে বলেন, সার সংকটের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল ও গুজব। সাধারণ কৃষকদের মাঝে প্যানিক তৈরি সৃষ্টি এবং সরকারকে বিব্রত করার জন্য এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের তদারকিতে দেশের ৬৪ জেলার জন্য মন্ত্রণালয়ের ৬৪ কর্মকর্তা এ বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।
অসাধু ডিলারদের বিষয়ে তিনি আরো জানান, বেশি দামে বিক্রি বা কালোবাজারির অভিযোগ পেলেই নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ডিলারশিপ স্থগিত ও বাতিল করা হচ্ছে, যা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে তদারকি সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে কিছু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীর নানা অনিয়ম এবং পদ্ধতিগত ত্রুটি সামনে আসছে।
রংপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সরকারি নিয়ম মেনে গোডাউনে সার না রাখা এবং পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে অনেক ডিলারকে জরিমানার আওতায় আনা হচ্ছে। তার অঞ্চলের কোথায় কাকে আরো জরিমানা ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা পরে নিশ্চিত করা যাবে।
এদিকে সাটুরিয়া উপজেলার জান্না বাজারে বিএডিসির সার ডিলার ছানোয়ার হোসেনকে সারের সঙ্গে মাটি মিশিয়ে ভেজাল ডিএপি সার বিক্রির অভিযোগে হাতেনাতে ধরে ফেলেন স্থানীয় কৃষকরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলামের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী ওই ব্যবসায়ীকে দুই লাখ টাকা জরিমানা এবং ৫ বস্তা ভেজাল সার জব্দ করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের হোসেনডাঙ্গা এলাকায় মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সের মালিক নুর ইসলামকে সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং অবৈধভাবে ২৫৯ বস্তা ইউরিয়া, ১০৬ বস্তা ডিএপি ও ৪৫ বস্তা টিএসপি সার মজুত রাখার অপরাধে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত সোমবার এ ঘটনা ঘটে। সেখানে জব্দ করা সার পরে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের মাঝে বিক্রি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
চৌগাছা পৌর শহরের পারবাজারে লাইসেন্স ও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ৩ লাখ ৫৩,৩৫০ টাকা মূল্যের মোট ২৭১ বস্তা (১৩,৫৫০ কেজি) সার অবৈধভাবে মজুত রাখার দায়ে গত বুধবার খাইরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬-এর ১২ ও ১৮ ধারা অনুযায়ী এ জরিমানা আদায় করা হয় এবং জব্দ সার ন্যায্যমূল্যে কৃষকের মাঝে বিক্রি করে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করার আদেশ দেওয়া হয়। এর আগে চৌগাছায় পাচারকালে আটক আরো ৩৭ বস্তা সার সরকারি মূল্যে বিক্রি করে পরিবহনের দায়ে আলমসাধু চালককে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশের কোথাও সারের প্রকৃত ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলেই প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দাবি সারের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। তবে বিভিন্ন জেলায় বেশি দামে বিক্রি, অবৈধ মজুত ও ভেজাল সারের ঘটনায় সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও কৃষক পর্যায়ে নির্ধারিত দামে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে তদারকি আরো জোরদার করা প্রয়োজন। প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও কৃষকরা সময়মতো ও নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন কি না—সেটিই এখন মাঠ পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে সার সংকট নেই—এমন দাবি করা হলেও নিরাপত্তা মজুতে ঘাটতি দেখা গেছে। গত ২২ আগস্টের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ইউরিয়ার নিরাপত্তা মজুত থাকার কথা ৫ লাখ টন, সেখানে আছে ৪ লাখ ৯৬২ টন; অর্থাৎ ঘাটতি ৯৯ হাজার টন। একইভাবে টিএসপির ৪ লাখ টন; কিন্তু মজুত আছে ৩ লাখ ৩৭৩ টন; অর্থাৎ ঘাটতি সাড়ে ৯৯ হাজান টন। অনুরূপভাবে ডিএপির নিরাপত্তা মজুত থাকার কথা ৫ লাখ টন। কিন্তু আছে ৩ লাখ ২৭৭ টন; এখানেও ঘাটতি ২ লাখ টন। সবশেষ এমওপির মজুত থাকার কথা ৩ লাখ টন, সেখানে আছে ১ লাখ ৪৮৪ টন; এখানেও ঘাটতি প্রায় ২ লাখ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এই তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে সারের নিরাপত্তা মজুত অনেকটাই নিম্নমুখী। এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


