ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কার্নির বক্তৃতা যেন রাজনৈতিক ভূমিকম্প

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন চায় কানাডা

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন চায় কানাডা

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক দুই বক্তৃতা শুধু কানাডার রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। শান্ত ও সংযত স্বরে দেওয়া এসব বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের কাছে কানাডা নতি স্বীকার করবে না—এমন বার্তা দিয়েছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেওয়া বক্তৃতায় কার্নি বলেছিলেন, বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ওপর আগের মতো নির্ভর করা যাচ্ছে না। তিনি কানাডাসহ মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে এই নতুন জোটের অংশ হওয়ার জন্য আলাদা করে আহ্বান জানানো হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এরপর গত ২২ আগস্ট অটোয়ায় দেওয়া ২৩ মিনিটের এক বক্তৃতায় কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা থেকে কানাডার সরে আসার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন কিছু দাবি করা হয়েছিল, যা কানাডার কাছে অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে কানাডা তা মেনে নেবে না।

কার্নির এই বক্তব্যের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি কানাডার নেতাদের নিয়ে কটাক্ষ করেন এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। এর আগে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথাও একাধিকবার বলেছেন। ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

কার্নির বক্তব্যের বিশেষত্ব ছিল তাঁর শান্ত ও তথ্যনির্ভর উপস্থাপনা। তিনি আবেগের পরিবর্তে দুই দেশের অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। কানাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৯৯ শতাংশই কানাডা থেকে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কানাডার অর্থনীতি বহুমুখী করার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানান।

বাণিজ্য বিরোধ এখন দুই দেশের সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। কানাডার ফরাসিভাষী কুইবেক প্রদেশে ফরাসি ভাষার অধিকার রক্ষার আইন নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। কার্নি স্পষ্ট করেছেন, ভাষাগত অধিকার কানাডার অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এ নিয়ে বাইরের চাপ গ্রহণ করা হবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার বিভিন্ন পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। জবাবে কানাডা আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

দুই দেশের সম্পর্কের এই অবনতিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ঘনিষ্ঠ সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। কিন্তু ট্রাম্পের নীতির কারণে কানাডা এখন ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।

কার্নির ভাষায়, কানাডা এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায়। তাঁর বক্তৃতাগুলো তাই শুধু একটি বাণিজ্য বিরোধের বক্তব্য নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে কানাডার জন্য নতুন আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরির ঘোষণাও হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন