গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আলোচনা সভায় বক্তারা

গুমের বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন তদন্তের দাবি

গুমের বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন তদন্তের দাবি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে সংঘটিত গুমের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার স্পষ্ট সুযোগ না থাকলে, এ সংক্রান্ত আইন বা কমিশন না থাকাই ভালো বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) উপদেষ্টা নূর খান লিটন।

শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এইচআরএসএস আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

নূর খান লিটন বলেন, “একজন ভুক্তভোগী গুম হওয়ার দেড় মাস পর সংবাদ সম্মেলন করেন, পরবর্তীতে তিনি আবারও গুম হন এবং এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন। যুবদল কর্মী রবিনকে গুম করার পর তা দস্যুতা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রতিটি ঘটনা এমনভাবে ঘটে যে, তথ্য দিচ্ছে এক বাহিনী আর তা ঢেকে দিচ্ছে অন্য বাহিনী। বরিশালের একটি থানায় সংঘটিত ছয়টি ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন মেজর রাশেদ, যাকে পরিচালনা করতেন জিয়াউল আহসান।”

তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। ভয়ভীতি ও লোভ-লালসা উপেক্ষা করে শক্তিশালী একটি টিম নিয়ে আমরা দায়িত্ব পালন করেছি। তদন্তের পর্যাপ্ত এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও আমরা বিষয়টিকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলাম। নিখোঁজ মিরাজ শেখের বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যা এখনো দেখা যাচ্ছে না।”

আলোচনা সভায় আলোকচিত্রী ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, “নিজের বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারক সাধারণত বিচার করেন না। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নৈতিকতার খাতিরে তার সরে দাঁড়ানো উচিত। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিচালনা করা। সরকার যদি তা না করতে পারে, তবে তারা জনগণের প্রতিনিধি হয় কীভাবে? সরকারের উচিত জনগণের স্বার্থকে প্রধান্য দেওয়া, বাহিনীর বা নিজস্ব স্বার্থকে নয়।”

ড. নাবিলা ইদ্রিস আইনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, “আইনের ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়ার কথা। আবার ১৪.৩ ধারায় বলা হয়েছে, যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তদন্ত করতে পারবে না। কিন্তু এক বাহিনী অন্য বাহিনীর তদন্ত করলে স্বার্থের সংঘাত থেকেই যায়। মানবাধিকার কমিশন তদন্তে গেলেও শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে যায়; কারণ কোনো বাহিনীকে চিঠি পাঠানো হলে কতদিনের মধ্যে উত্তর দিতে হবে তার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এই আইন পাস হলে প্রভাবশালী ছাড়া সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কোনো সুফল পাবে না।”

গোলটেবিল আলোচনা সভা থেকে এইচআরএসএস সরকারের কাছে ১২টি দাবি ও সুপারিশ পেশ করে:

১. সন্ধান নিশ্চিতকরণ: মিরাজ শেখসহ বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিখোঁজ সকলকে অবিলম্বে খুঁজে বের করা।

২. স্বাধীন তদন্ত: গুমের প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা।

৩. রোডম্যাপ তৈরি: গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাস্তবায়নে স্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা।

৪. বিচার নিশ্চিতকরণ: অতীতের সকল গুমের ঘটনার বিচার সম্পন্ন করা।

৫. দায়বদ্ধতা নির্ধারণ: ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা নেতৃত্বের দায় স্পষ্ট করা।

৬. আইন সংশোধন: ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ সংশোধন করা।

৭. কমিশনের স্বাধীনতা: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া।

৮. সত্য জানার অধিকার: ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য ‘রাইট টু ট্রুথ’ বা সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা।

৯. পুনর্বাসন: জাতীয় পর্যায়ে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

১০. সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা: গুম প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।

১১. নতুন আইন: সাক্ষী ও অভিযোগকারীর সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন করা।

১২. ইতিহাস সংরক্ষণ: ‘আয়নাঘর’ ও অন্যান্য গোপন আটককেন্দ্রের তথ্য ও সত্য সংরক্ষণ করা।

এইচআরএসএসের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম এবং ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন