ঋণ দেওয়া-নেওয়ার আদব

আমীনুর রহমান নড়াইলী

ঋণ দেওয়া-নেওয়ার আদব

মানবজীবন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অন্যের সাহায্য গ্রহণ করা তাদের জন্য একান্ত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে ঋণদান বা কারো প্রয়োজনে অর্থ ধার দেওয়া শুধু একটি মানবিক কাজই নয়, বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি অত্যন্ত মহৎ আমল হিসেবে বিবেচিত।

ইসলাম মানবকল্যাণমুখী একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে প্রতিটি কাজের মধ্যেই রয়েছে নৈতিকতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা। ঋণদান সেই শিক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ঋণদানের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন, ‘কে আছে এমন, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, অতঃপর তিনি তাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দেবেন।’ (সুরা বাকারা : ২৪৫) এখানে আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে ঋণ দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা এর মর্যাদা ও গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

বিজ্ঞাপন

ঋণদান মূলত এক ধরনের নিঃস্বার্থ সাহায্য। এটি এমন একটি কাজ, যেখানে দাতা কোনো তাৎক্ষণিক লাভের আশায় নয়, বরং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে। একজন ব্যক্তি যখন আর্থিক কষ্টে পড়ে, তখন তার কাছে সামান্য সহায়তাও অনেক বড় হয়ে ওঠে। এমন সময়ে কাউকে ঋণ দেওয়া মানে তার কষ্ট লাঘব করা, তার মুখে হাসি ফোটানো। এই মানবিক অনুভূতিই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঋণদানের ফজিলত সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে দুবার ঋণ দেয়, তার জন্য একবার সদকা করার সমান সওয়াব রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ) অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তকে ঋণ দেয় বা তার ঋণ মওকুফ করে, আল্লাহতায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন।’ এসব বাণী থেকে স্পষ্ট, ঋণদান শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি আখিরাতের জন্যও এক বিরাট পুঁজি।

ঋণদানের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। ধনী-গরিবের মধ্যে ব্যবধান কমে আসে। সমাজের একশ্রেণির মানুষ যখন অন্য শ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন একটি সুন্দর ও সুষম সমাজ গড়ে ওঠে। এতে হিংসা-বিদ্বেষ কমে যায় এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তাই ঋণদান শুধু ব্যক্তিগত সওয়াব অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

তবে ঋণদানের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, ঋণ দেওয়ার সময় আন্তরিকতা থাকতে হবে। এতে কোনো ধরনের রিয়া বা লোকদেখানো মনোভাব থাকা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, ঋণগ্রহীতার প্রতি নম্রতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, ঋণ দেওয়ার পর দাতা ব্যক্তি ঋণগ্রহীতার সঙ্গে কঠোর আচরণ করেন, যা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যদি ঋণগ্রহীতা কষ্টে থাকে, তবে তাকে স্বচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা ক্ষমা করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম।’ (সুরা বাকারা : ২৮০)

তৃতীয়ত, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা জরুরি। ঋণগ্রহীতা যদি সত্যিই অসহায় হয়, তবে তাকে সময় দেওয়া উচিত। এমনকি সামর্থ্য থাকলে ঋণ মওকুফ করে দেওয়া আরো উত্তম। এতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় প্রতিদান পাওয়ার আশা করা যায়।

অন্যদিকে, ঋণগ্রহীতারও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাকে অবশ্যই ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে। অযথা বিলম্ব করা বা প্রতারণা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম।’ (বুখারি) তাই ঋণ গ্রহণের পর তা যথাসময়ে পরিশোধ করা একজন মুমিনের কর্তব্য।

বর্তমান সমাজে ঋণদান প্রথা অনেকাংশে বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করেছে। সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থা মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আরো দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইসলাম এ ধরনের শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এবং সুদমুক্ত ঋণদানের প্রতি উৎসাহ দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ‘করজে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ হচ্ছে সেই ঋণ, যেখানে কোনোপ্রকার অতিরিক্ত লাভের শর্ত থাকে না।

সমাজে যদি সুদমুক্ত ঋণদানের চর্চা বাড়ে, তবে তা অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সহজে তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারবে। ফলে সমাজে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

ঋণদান একটি ইবাদত, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। এটি এমন একটি আমল, যার মাধ্যমে একজন মানুষ দুনিয়াতে মানুষের উপকার করতে পারে এবং আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত, সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা এবং ঋণদানের এই মহৎ আমলকে আমাদের জীবনের অংশ করে নেওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, ঋণদান শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি একটি মানবিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব। এটি সমাজে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাই সবার উচিত, আমরা সবাই যেন এই মহৎ আমলের গুরুত্ব অনুধাবন করি এবং বাস্তব জীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। আল্লাহতায়ালা তাওফিক দান করুন।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন