অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে বসবাসকারী মুসলিম সংখ্যালঘুরা বর্তমানে এমন কিছু মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন যা তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে নাগরিকত্ব হরণ করার মতো বিষয়ও। যেমন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও আছে আরো কিছু চ্যালেঞ্জ।
জনসংখ্যা গণনায় কারচুপি
মুসলিম জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে কারচুপি করা অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কোনো মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য প্রকৃত আদম শুমারির তথ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পশ্চিমা আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ইসলামবিদ্বেষী ঔপনিবেশিক শক্তির মদদপুষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের সংখ্যা বাস্তবতার চেয়ে কম হিসেবে উপস্থাপন করছে। এর ফলে পরবর্তীতে তাদের অধিকার হরণ করা এবং তাদেরকে একটি দুর্বল জনমিতিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা সহজ হয়।
এটি সামগ্রিক সংখ্যালঘু আদমশুমারি এবং প্রতিটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর গণনার ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। ফলে, এই বিষয়ে গবেষণা করার সময় বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের প্রকৃত সংখ্যা এবং প্রতিটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সঠিক তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন। বাধ্য হয়েই প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলো ব্যবহার করতে হয়।
কিছু উৎসের মতে, বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়নের কাছাকাছি, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, খ্রিস্টধর্মের (যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ) পর তারা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী; যেখানে হিন্দুধর্ম ১৫ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
তথ্যহীনতার ঝুঁকি
এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিজের কাছে থাকা—তাদের অবহেলা না করা বা শত্রুপক্ষের হাতে ডেটা ছেড়ে না দেওয়া—অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো এই তথ্যের কারচুপি করে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে যায়। তাছাড়া, এই সংখ্যালঘুদের গণনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের অভাব একটি বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা সামগ্রিকভাবে মুসলিমদের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে, যেখানে সার্চ ইঞ্জিনগুলোও এই ‘খেলায়’ অংশ নিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট: মুসলিমদের সার্বিক শক্তিকে ছোট করে দেখানো এবং তাদের সংখ্যা কম হিসেবে উপস্থাপন করা, যাতে তাদের বিভিন্ন অধিকার ও সমতার আলোচনাটি সঙ্কোচিত বা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেসব দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, সেখানেও মুসলিম জনসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের সংখ্যা কমিয়ে একটি মাঝারি আকারের সংখ্যালঘুতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে ‘ChatGPT’-র পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এর বেশ কিছু দিক প্রকাশ পায়।
বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যানে অসঙ্গতি
কিছু অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলিমদের শতকরা হারের উপলব্ধ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু উৎস নির্দেশ করে যে নাইজেরিয়ায় মুসলিমদের হার ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে, যা তাদেরকে খ্রিস্টানদের সমান বা সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে দেখায়। অথচ ঐতিহাসিক এবং বাস্তব সত্য নিশ্চিত করে যে, সেখানে মুসলিমদের অনুপাত অত্যন্ত সুদৃঢ় ও বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC)-এর সদস্য নাইজেরিয়া মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে আফ্রিকার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।
ভারতে এই পরিসংখ্যানে মুসলিমদের সংখ্যা আনুমানিক ১৯৬ মিলিয়ন বা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ বলে হিসাব করা হয়। তবে বাস্তবতা ভিন্ন; ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যমতে তাদের সংখ্যা ২০ কোটিরও বেশি (২০০ মিলিয়নের বেশি)। ইউরোপে অনেক দেশেই নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায় না। বেলজিয়ামে বর্তমান উৎসগুলোতে নির্দিষ্ট তথ্যের অভাব রয়েছে। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ এবং উত্তর আমেরিকায় এই হার ১ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে পরিবর্তিত হয়। ফ্রান্সে প্রায় ৬ মিলিয়ন (৯ শতাংশ), জার্মানিতে ৪ মিলিয়ন (৫ শতাংশ) এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬ মিলিয়ন (১.৮ শতাংশ) বলে ধারণা করা হয়।
এর ওপর ভিত্তি করে এটি স্পষ্ট যে, উল্লিখিত শতকরা হারগুলো পুরোপুরি সঠিক নাও হতে পারে—বিশেষ করে নাইজেরিয়া এবং ভারতের ক্ষেত্রে। তাই নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য ব্যবহার করে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে মুসলিমদের প্রকৃত জনসংখ্যা নির্ধারণ করতে ইসলামিক বিশ্বের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওআইসির উচিত মুসলিম সরকারগুলোর সহায়তায় এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়া।
জনমিতিক বিন্যাস বা ব্লকের বিচ্ছিন্নকরণ
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো মুসলিমদের বড় বড় জনমিতিক ব্লক বা ঘনবসতিগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন দূরবর্তী ও বিক্ষিপ্ত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া। এটি করা হয় এই ব্লকগুলোর পারস্পরিক বন্ধন ছিন্ন করা এবং অমুসলিম জনসংখ্যা বেশি এমন এলাকায় তাদের স্থানান্তরিত করার উদ্দেশ্যে—যা সংখ্যাগত ও মানসিকভাবে তাদের দুর্বল করার একটি কৌশল। অতীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে এটি ঘটেছে এবং বর্তমানে ভারতেও এটি দেখা যায়; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিটি শহরেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে ভেঙে অন্যান্য ধর্মীয় ঘনবসতির মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাদের দুর্বল সংখ্যালঘুতে পরিণত করে সহজে তাদের অধিকার খর্ব করা যায়।
নাগরিকত্ব হরণ
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে মুসলিমদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক থেকে অধিকারহীন বিদেশি বা বহিরাগত ব্যক্তিতে পরিণত করা, যেমনটি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে ঘটেছে। এটি মুসলিমদের ‘বিতাড়িত বা বহিরাগত’ বানানোর পর তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার একটি আইনি অজুহাত তৈরি করে—তাদেরকে অবাঞ্ছিত বিদেশি বা আইনি বসবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এমন অযুহাতে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়।
মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিতকরণ
চতুর্থত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। এটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের এমন এক দুর্বল অবস্থায় ফেলে দেয় যা প্রায় ‘মৃত্যুর’ কাছাকাছি—তাদেরকে এমন এক জীবনযাত্রার মান থেকে বঞ্চিত করা হয় যা স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করে এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে শিক্ষার সুযোগ সীমিত করা হয় বা কেবল মাধ্যমিক পর্যায়ে আটকে রাখা হয়। এর ফলে তাদের রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ পদে যাওয়া রুদ্ধ হয়ে যায়, আর অন্য ধর্মের অনুসারীরা পূর্ণ অধিকার ভোগ করে বেসামরিক প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিচার বিভাগে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়।
ইসলামবিদ্বেষী শাসকগোষ্ঠী বসানো
পঞ্চম চ্যালেঞ্জটি হলো জনগণের মধ্য থেকেই এমন শাসকগোষ্ঠী বা শাসনব্যবস্থা বসানো যারা ইসলামের প্রতি বৈরী। নামগুলো মুসলিম হলেও তাদের আদর্শ ও নীতিমালা ইসলামবিদ্বেষী। ভাবাদর্শগুলো কমিউনিস্ট, পশ্চিমাঘেঁষা কিংবা জায়নবাদীদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সমর্থক যাই হোক না কেন, এই শাসনব্যবস্থাগুলো শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ইসলামের বিরুদ্ধে চালিত করে। যারা ভারসাম্যপূর্ণ বা মধ্যপন্থী ইসলামী চিন্তাধারার অধিকারী, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে জেলে বন্দী করা হয় এবং নির্যাতন চালানো হয়, যেমনটি সাবেক সোভিয়েতভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে এবং চরমপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থার অধীনে থাকা বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে দেখা গেছে।
এগুলোই হলো সেই সব চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি যা আজ এবং ভবিষ্যতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। সবাইকে এদের মোকাবিলা করতে এবং এর প্রভাব নিরসনে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সূত্র: আল মুজতামা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


