ভোগ-বিলাসিতা ভালো নয়। এর পরিণাম ভালো হয় না। মানব চরিত্রে যেসব খারাপ দিক আছে, তার মধ্যে লোভ মারাত্মক ক্ষতিকারক। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, কলহ-বিবাদ প্রভৃতি মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবনকে অত্যন্ত বিষময় করে তোলে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। লোভ-লালসার প্রকৃতিতে আত্মসমর্পণ করে অন্যায়ভাবে অন্যের ধন-সম্পত্ত আত্মসাৎ করা এবং মানুষের মান-সম্মান ধূলিসাৎ, এমনকি অন্যদের হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাই ইসলামে লোভকে নিন্দা করা হয়েছে। কাব ইবনে মালিক আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালে ছেড়ে দেওয়া হলে তা যতটুকু না ক্ষতি করে, কারো সম্পদ ও প্রতিপত্তির লোভ এর চেয়েও বেশি ক্ষতি করে তার ধর্মের।’ (তিরমিজি : ২৩৭৬)
পক্ষান্তরে এমন কিছু গুণ রয়েছে, যার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) ঈর্ষা করেছেন। এই লোকদের ব্যাপারে রাসুল (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন। যারা সততা ও বিদ্বানের আকাশে এমন নক্ষত্র, যাদের আলোকরশ্মি সবাইকে সমান আলো বিলায়। জগতের সব মানুষই তাদের দ্বারা উপকৃত হয়, কিন্তু তাদের নাম কারো জানা থাকে না। এসব গুণিজন নীরবে-নির্জনে কাজ করে যায়। যশ-খ্যাতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যায়। তাদের রেখে যাওয়া অমূল্য জিনিস থেকে দুনিয়ার মানুষ যুগ যুগ ধরে উপকৃত হতে থাকে। নিজের যত সুখ্যাতি আছে, সবকিছু চুপিসারে অন্যের জন্য রেখে যায়। সে এ কল্পনা করে নিজে প্রশান্তি লাভ করে আমি যা করেছি এর খুঁটিনাটি সম্পর্কে তিনিই জানেন, যার জন্য এ কাজ করা হয়েছে। অন্যরা না জানলেও তার কোনো সমস্যা নেই। যাদের দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ কম। দুনিয়ার জন্য তার অনেক সম্পদ নেই, কোনোমতে অল্পস্বল্প চলার পাথেয় নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকে। যখন যা থাকে তা নিয়ে সে সন্তুষ্ট। বেজায় খুশি মনে সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় লুটিয়ে পড়ে। তারা যখন দুনিয়া থেকে চলে যায়, তখন তাদের স্মরণে কোনো শোকসভার আয়োজন করা হয় না। তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় একদম সাদামাটাভাবে, যেন কেউ টেরই পায় না।
এদের কথাই হাদিসে এভাবে এসেছে। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষণীয় হলো সেই মুমিন ব্যক্তি, যার অবস্থা খুবই হালকা (স্বল্প সম্পদ এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যাও কম) এবং যে নামাজে মনোযোগী, সুচারুরূপে তার প্রভুর ইবাদত করে, একান্ত নিভৃতেও তার অনুগত থাকে, মানুষের মধ্যে অখ্যাত, তারদিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করা হয় না, আর ন্যূনতম প্রয়োজনমাফিক তার রিজিক এবং তাতেই ধৈর্য ধারণকারী। তারপর রাসুল (সা.) তার দুই হাতের ইঙ্গিতে বলেন, শিগগিরই তার মৃত্যু হয়, তার জন্য ক্রন্দনকারীর সংখ্যাও কম, তার রেখে যাওয়া সম্পদও খুব সামান্য।’ (তিরমিজি : ২৩৪৭)
আমাদের প্রিয়নবী (সা.) দরিদ্রতা পছন্দ করতেন, দরিদ্রদের ভালোবাসতেন এবং তাদের সঙ্গে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দরিদ্র অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখো, দরিদ্র থাকা অবস্থায় মৃত্যু দিও এবং কিয়ামত দিবসে দরিদ্রদের দলভুক্ত করে হাশর করো।’ এ কথা শুনে আয়েশা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এমন বলছেন কেন? তিনি বললেন, হে আয়েশা! তারা তো তাদের সম্পদশালীদের চেয়ে চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হে আয়েশা। তুমি প্রার্থনাকারী দরিদ্রকে ফিরিয়ে দিও না। যদি দেওয়ার মতো কিছু তোমার কাছে না থাকে, তা হলে একটি খেজুরের টুকরা হলেও তাকে দিও। হে আয়েশা! তুমি দরিদ্রদের ভালোবাসবে এবং তাদের তোমার সান্নিধ্যে রাখবে। তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তোমাকে তার সান্নিধ্যে রাখবেন। (তিরমিজি : ২৩৫২)
আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) তো দরিদ্র ছিলেন। তবে এ দরিদ্রতায় ছিল না কোনো মুখাপেক্ষিতা। ছিল শুধু সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা। আর এই অমুখাপেক্ষিতাই ছিল তার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা বড় বড় রাজা-বাদশাহরও ছিল না। আমাদের মনে রাখা উচিত, আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজি (সা.)-এর ওফাতের সময় তার বাড়িতে মাত্র সাতটি স্বর্ণমুদ্রা ছিল। অথচ তিনি তাও গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার অসিয়ত করে গেছেন এবং বলেছেন, ‘আমার লজ্জা হচ্ছে, ঘরে পার্থিব সম্পদ রেখে আল্লাহর রাসুল আল্লাহর সান্নিধ্যে যাব।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৪২২২)
হে আল্লাহ! আমাদের সবাইকে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে অনুধাবন ও অনুসরণের তওফিক দান করুন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

