ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে সাওম তথা রোজা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রোজা পালনের সাথে নানা বন্দেগিতে লিপ্ত থাকেন পুরো একটি মাস। এই রমজানের শেষ দশক অতিক্রম করছে। মুসলমানদের জীবনে নানা শিক্ষা ও গুণাবলি অর্জনের মোক্ষম সময় পবিত্র রমজান মাস।
রোজা মুসলিম সমাজে সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সৃষ্টি করে। এছাড়াও মুসলিমরা আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও নম্র স্বভাবের মত মানবিক গুণাবলি অর্জন করে পবিত্র এই মাসে। মানুষকে সংযত হতে, খোদাভীরুতা অর্জন করতে, পরোপকারিতায় উদ্বুদ্ধ হতে এবং আধ্যাত্মিক চেতনায় উজ্জীবিত করতে পবিত্র রমজান মাসের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
খোদাভীতি অর্জন
মহান আল্লাহ তায়ালার ভয় তথা খোদাভীতি (তাকওয়া) অর্জনের মোক্ষম সময় হলো পবিত্র রমজান মাস। মহান আল্লাহর বাণী- ‘তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা (তাকওয়া) খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।’ সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার কারণে রোজাদারের মধ্যে খোদাভীতি সৃষ্টি হয়।
রোজাদার ব্যক্তি সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার, যাবতীয় অশ্লীল কাজ, মিথ্যা কথা প্রভৃতি খারাপ ও নিন্দনীয় অপকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। তাই সিয়াম সাধনা বা রোজাকে বলা হয় খোদাভীরুতা লাভের সোপান। যদি কেউ আন্তরিকতার সাথে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সঠিকভাবে রোজা পালন করেন, তাহলে তাঁর মধ্যে অবশ্যই খোদাভীতি আসবে।
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহতা'লা বলেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, আর রোজা এর ব্যতিক্রম। রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’ মহান আল্লাহ অন্যান্য বিধানের মধ্যে রোজাকে নির্দিষ্ট করায় এ মাসে সবচেয়ে বেশি খোদাভীতি অর্জিত হয়ে থাকে।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
ভাতৃত্বের বন্ধন (উখওয়াত) মুসলিম উম্মাহর অন্যতম নিদর্শন। ইসলামের প্রতিটি বিধানেই এ বন্ধন দৃঢ় হবার সুযোগ রয়েছে। বরকতময় রমজান মাসে মুসলমানদের মাঝে সবচেয়ে বেশি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইমানের পরে মুমিনদের সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে ঐক্যবদ্ধ থাকবার জন্য।
এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। রমজান মাসে মুসলমানরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবির নামাজ মসজিদে জামায়াতের সাথে আদায় করে থাকেন। অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসে মুসলমানদের মসজিদে উপস্থিতি বেশি লক্ষণীয়।
সমাজজীবনে ধনী ও গরীবরা মিলেমিশে একই কাতারে নামাজ আদায় করে থাকেন। ফলে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে পবিত্র রমজান মাস। অপরদিকে রমজান মাসে ধনীরা তাদের সম্পদ থেকে গরীবদের যাকাত ও ফিতরা প্রদান করে থাকেন এতে করে ধনী-গরীবের মাঝে তৈরি হয় নিবিড় সম্পর্ক। এভাবে পুরো রমজানের সকল আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন দৃঢ় হবার অন্যতম সুযোগ।
আত্মসংযম
রমজান মাস মূলত আত্মসংযমের মাস। এ মাসে মুসলিমরা মিথ্যাচারিতা, আজেবাজে-অহেতুক কথা বলা, চোখের গিবত এবং কটু বাক্য হতে জিহ্বাকে সংযত রাখতে বেশি তৎপর থাকে। সেইসাথে প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হেফাজত করা এবং হারাম মাল ভক্ষণ না করার শিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত সময় পবিত্র রমজান মাস। রোজা প্রকৃতপক্ষে রোজাদারদের হাত, পা, মুখ ও অন্তঃকরণকে সংযত করে। এই মাসে কামনা-বাসনাকে সংযত করার জন্য ক্ষুধা, তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য ও রিপুর তাড়নাকে পরিত্যাগ করতে হয়।
অন্যদিকে জিহ্বা ও মনের চাহিদা এবং অন্যান্য অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। এভাবে রোজাদারগণ দেহকে আত্মনিয়ন্ত্রণে রেখে দৈহিক প্রেরণাকে সংযত করে আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠে।
মাহে রমজানে ত্যাগ ও সংযম সাধনার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচটি বিষয় রোজাদারের রোজা বিনষ্ট করে দেয়—মিথ্যা বলা, কূটনামি করা, পশ্চাতে পরনিন্দা করা, মিথ্যা শপথ করা এবং খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো।’ সুতরাং রমজান মাসে মুসলমানরা আত্মসংযমের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে রোজার যথার্থতা অর্জনে তৎপর থাকেন।
আত্মশুদ্ধি
ইসলামের যেসব বিধিবিধান সরাসরি মানুষকে সংযত, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক চেতনা ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে, মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা তথা রোজা তার মধ্যে অন্যতম। রমজান শব্দটি এসেছে আরবি শব্দের ‘রমজ’ মূল ধাতু থেকে। এর অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া, পোড়ানো ও ভস্ম করে দেওয়া। এই মাসে মুসলমানগণ অন্তরের কুবাসনা তথা কুপ্রবৃত্তিসমূহ জ্বালিয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন কওে বিধায় একে রমজান বলে।
অন্যভাবে বলা যায়- ‘উপবাস, প্রার্থনা ও ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি থেকে শুদ্ধাচারের নাম রোজা’। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুসলমানরা আত্মাকে শুদ্ধ করে কতিপয় নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুশীলনের মাধ্যমে রোজা পালন করে থাকে। খাদ্য-পানীয় এবং অন্যান্য শারীরিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার সুযোগ লাভ করে এই মাসে। এভাবে সাওম তথা রোজা মানুষকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানবীয় গুণাবলি শিক্ষা দেয়; যেন লোভলালসা পরিহার করে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি অর্জন করতে পারে।
ধৈর্য্য
আরবি ‘সবর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ধৈর্যধারণ, সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, সহ্য করা প্রভৃতি। ইসলামের পরিভাষায়- বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, অন্যায়-অত্যাচার, বালা-মুসিবতে বিচলিত না হয়ে এবং অতি আনন্দ ও পরম সুখে উত্তেজিত-আত্মহারা না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে যথাসম্ভব শান্ত ও স্বাভাবিক থাকার নামই সবর। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনায় রোজাদার ব্যক্তি সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ ও সহনশীলতা প্রদর্শনের সুযোগ লাভ করে থাকেন। কাজেকর্মে ও চলাফেরায় ধৈর্যধারণের মাধ্যমেই সিয়াম সাধনা পরিপূর্ণ হয়।
রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তি কেবল আল্লাহকে রাজিখুশি করার জন্য ধৈর্যধারণ করে সব ধরনের পাপকাজ, পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকেন। এ মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কঠোর ত্যাগ, উদারতা, সততা, ধৈর্য্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। ধৈর্য্যধারণের বিনিময়ে নির্ধারিত রয়েছে অতুলনীয় শান্তির আবাস বেহেশত।
তাই এ মহান মাসটির পরিচয় তুলে ধরে ধৈর্য্য-সংযমের গুরুত্ব প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এটা সবর বা ধৈর্যের মাস, আর সবরের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।’ সুতরাং বলা যায় যে, পবিত্র রমজান মাসে মুসলমানরা সকল ক্ষেত্রে ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিল করতে তৎপর থাকেন।
মনুষ্যত্ব অর্জন
রোজার অন্যতম শিক্ষা - মানুষকে প্রকৃত মানুষ হওয়া, তার মধ্যে মনুষ্যত্ব পূর্ণ মাত্রায় জাগ্রত হওয়া। বান্দা যেন খুঁজে পায় চিরমুক্তির মোহনা, যেন পৌঁছাতে পারে তার কাঙ্খিত গন্তব্যে। আর এজন্য আল্লাহ তাআলা পবিত্র রমজানের মতো একটি শিক্ষনীয় মাস দান করেছেন মুসলিম উম্মাহকে।
অপরদিকে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য শয়তান ব্যক্তির নফস বা প্রবৃত্তির ওপর কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ প্রভৃতি রিপু দ্বারা প্রভাব বিস্তার করে। তাই পবিত্র রমজানে অভিশপ্ত শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। কারণ, এতে শয়তান মানুষকে পাপকাজের প্রতি ধাবিত করতে পারে না। তবে মানবিক শয়তান কিংবা বাজে অভ্যাসের কারণে মানুষ মন্দকাজে লিপ্ত হতে পারে।
আবু হোরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন রমজান উপস্থিত হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুষ্ট শয়তানদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়।’ সর্বোপরি রোজাদারগণ এই মাসে বাজে অভ্যাস তথা শয়তানি সকল কুমন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে মনুষ্যত্বের গুণাবলি অর্জনে সর্বদা তৎপর থাকেন।
পরোপকারিতা
ইসলামে ধনী-গরিবের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। সকলে মিলেমিশে ইবাদত করে একত্রে সমাজবদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে। পবিত্র রমজান মাস শান্তি ও সৌহার্দ্যের মাস হওয়ায় প্রকৃত রোজাদারগণ সমাজের কাউকে ঠকাতে বা কারো সঙ্গে প্রতারণা করতে পারেন না। কখনো কারো অনিষ্ট, অকল্যাণ ও ক্ষতিসাধন করেন না।
পক্ষান্তরে স্বচ্ছল ব্যক্তিরা মাহে রমজানে সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেন, সেহরি-ইফতারের আয়োজন করেন। এভাবে যথাসম্ভব সাধ্যানুযায়ী পরোপকারে ব্যস্ত থাকেন মুসলিমরা। সকল রোজাদার রমজান মাসে অসাধারণ ত্যাগ-তিতিক্ষা অনুশীলনের মাধ্যমে ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হন। একজন রোজাদার ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি সব সময়ই অসৎ কাজকর্ম থেকে দূরে থেকে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের প্রতি পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে নবি করিম (সা.) বলেছেন, ‘এ মাস (রমজান) সহানুভূতি প্রদর্শনের মাস।’ রোজাদারদের পারস্পরিক সমবেদনা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও পরোপকারিতা প্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য মাস পবিত্র রমজান মাস। রমজানের উছিলায় একে-অপরকে উপকার করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন প্রকৃত রোজাদারগণ।
ইবাদতের প্রশিক্ষণ
রমজান মূলত ইবাদত-বন্দেগির প্রশিক্ষণের মাস। এ মাসে প্রশিক্ষণ নিয়ে বান্দা নিজের মধ্যে মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়। এটা মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকালও বটে। পুরো মাসব্যাপী ইবাদত বন্দেগির অত্যধিক অনুশীলন করে বাকি এগারো মাস এ বন্দেগির ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ লাভ করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।
রোজাদারগণ ইবাদতের মাধ্যমে রমজানকে কাজে লাগাতে পারলে এ রমজানই জীবনের সফলতা বয়ে নিয়ে আসবে। রমজানের প্রতিটি ইবাদতের জন্য ন্যূনতম ৭০ গুণ বেশি সওয়াবের ঘোষণা রয়েছে। আর এ অধিক পুণ্যের আশায় ধর্মপ্রাণরা পুরো রমজানে ইবাদত বন্দেগিতে ব্যস্ত থাকেন। সর্বদা বান্দা আল্লাহর পছন্দনীয় পথে চলবে, আল্লাহর হুকুমকে সর্বাবস্থায় মান্য করবে, এটিই মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। মানুষ যেন শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে ইবাদত-বন্দেগীতে অলসতা না করে, সে জন্যই মূলত রমজানে ইবাদতের এই প্রশিক্ষণ।
লেখক: ধর্মীয় শিক্ষক
কুলকান্দী শামছুন্নাহার উচ্চ বিদ্যালয়, ইসলামপুর, জামালপুর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

