বরখাস্ত কোচ জোনসের অভিযোগ বানোয়াটÑদাবি বাফুফের

বরখাস্ত কোচ জোনসের অভিযোগ বানোয়াটÑদাবি বাফুফের

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে গত জুনে অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য ইংলিশ কোচ জেরার্ড জোনসকে নিয়োগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। তাকে দেওয়া হয়েছিল সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। কিন্তু দুবছরের জন্য চুক্তি হলেও মাত্র দুই মাস পরই বরখাস্ত হলেন জোনস। দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আর চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে নিজের বিদায়ঘণ্টা নিজেই বাজালেন এই বিদেশি কোচ। একের পর এক নাটকীয় ঘটনা, শৃঙ্খলা ভঙ্গ আর দলের বাজে পারফরম্যান্সের কারণে জোনসকে টুর্নামেন্টের মাঝপথে বরখাস্ত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় বাফুফে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রধান কোচের চাকরি হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের নীরবতা ভেঙেছেন এই কোচ। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি থেকে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে তাকে নাকি ‘মৃত্যুর হুমকি’ দেওয়া হয়েছিল! বরখাস্তের পর নিজের অপেশাদার আচরণের দায় এড়াতে এখন এমন দাবি করছেন জোনস। বাফুফে সূত্রে জানা যায়, একজন পেশাদার কোচ হিসেবে চুক্তি সই করার পর যে পেশাদারি আচরণের ন্যূনতম মানদণ্ড থাকে, জোনস তার কোনোটিই বজায় রাখেননি। অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক ঝামেলা পাকান এই ‘ক্র্যাক’ কোচ। চাকরি হারানোর পর জেরার্ড জোনস যে ‘মৃত্যুর হুমকির’ দাবি করেছেন, সেটি উড়িয়ে দিল বাফুফে। জোনসের দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট। কেননা, সিসিক্যামেরার ফুটেজসহ অনেক কিছুই রয়েছে। কিন্তু কোচ এর কোনো প্রমাণ দিতে পারবেন না। প্রশ্ন হলো, সত্যি যদি এমন হতো, তাহলে ফেসবুকে না বলে আইনের আশ্রয় কেন নিলেন না এই বিদেশি কোচ! যেকোনো পেশাদার সংস্থায় আর্থিক কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে সেটি সমাধানের একটা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকে। বাফুফের পক্ষ থেকে তার পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু গত আগস্টে কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়ে জোনস বেছে নেন অনিয়মতান্ত্রিক পথ। বেতন না পাওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ফেডারেশনকে হেয় করার চেষ্টা করেন জোনস, যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শুধু তা-ই নয়, জানা যায়, ইউসিবি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় গিয়েও উগ্র আচরণ করেন জেরার্ড জোনস। ছুটির দিন থাকায় বেতনের টাকা তুলতে না পেরে ব্যাংকের ম্যানেজারের দিকে তেড়ে যান এই কোচ। এছাড়া সামান্য জটিলতাতেই অহেতুক ‘নিরাপত্তাহীনতা’র অজুহাত তুলে হোটেলে পুলিশ ডাকার মতো নাটকীয় ঘটনাও ঘটান এই কোচ, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।

অন্যদিকে অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের আগে ও টুর্নামেন্ট চলাকালীন দলের মধ্যে বাজে এক পরিবেশ তৈরি করেন। যার ফলশ্রুতিতে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ভরাডুবি হয়েছে বাংলাদেশের। যে দলটি কয়েক মাস আসে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে, সে দলটিই কি-না এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে তিন ম্যাচ খেলে কোনোটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি! ফলে একের পর এক ম্যাচে হেরে বাছাই পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ। দলের বাজে পারফরম্যান্স আর ক্রমাগত চুক্তি লঙ্ঘনের কারণেই জোনসকে বাধ্য হয়ে বরখাস্ত করে বাফুফে। মাঠের বাইরে যেসব ঘটনায় আলোচিত হলেন কোচ জোনস, সেটি একনজরে দেখে নেওয়া যাক :

বিজ্ঞাপন

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

গত ১০ আগস্ট হঠাৎ ফেসবুকে এক পোস্টে জেরার্ড জোনস দাবি করেন, এখনো তাকে বেতন দেয়নি বাফুফে। সংকটের মধ্যে আছে তার পরিবার। বেতনের অপেক্ষায় আছেন। তার কাছে কোনো টাকা নেই। পরিবারকে খাবার কেনার জন্য দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন না। এছাড়া প্রতিনিয়ত ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন জোনস। শুধু তা-ই নয়, নিজের জীবন নিয়ে ভয়ে ও আতঙ্কে আছেন বলেও জানান তিনি।

সহকারী কোচের সঙ্গে হাতাহাতি

গত ১৯ আগস্ট এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে যাওয়ার আগে টিম হোটেলে বাগ্‌বিতণ্ডার এক পর্যায়ে সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়ান প্রধান কোচ জেরার্ড জোনস। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে পুলিশ ডাকেন এই বিদেশি। ঘটনাটি তদন্ত করে বাফুফে। বাছাই পর্ব খেলতে যাওয়ার কদিন আগে কোচিং স্টাফদের মধ্যে এমন বিরোধ স্বাভাবিকভাবেই দলের প্রস্তুতি ও পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কোচ-অধিনায়ক ছাড়া সংবাদ সম্মেলন

এশিয়ান কাপ বাছাই পর্ব খেলতে উজবেকিস্তান যাওয়ার আগে কোচ ও অধিনায়ককে ছাড়াই অনূর্ধ্ব-২০ দলের সংবাদ সম্মেলন করে বাফুফে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন না প্রধান কোচ জেরার্ড জোনস, সহকারী কোচ আতিকুর রহমান কিংবা কোনো খেলোয়াড়। সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে কথা বলেছেন শুধু টিম ম্যানেজার সামিদ কাশেম।

উজবেকিস্তানে গিয়ে বরখাস্ত

গত ৩১ আগস্ট স্বাগতিক উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ এবং গত ৩ সেপ্টেম্বর সিরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলে হারের পর বরখাস্ত হন প্রধান কোচ জোনস। টুর্নামেন্টে বাকি সময় তার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেন সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশু। সহকারী কোচকে দলের সঙ্গে ভিড়তে না দেওয়া এবং এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেন ব্রিটিশ কোচ। সব মিলে ভারত ম্যাচের আগে চাকরি যায় তার। এশিয়ান কাপ বাছাই পর্ব চলাকালীন বাফুফে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জেরার্ড জোনসকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে ফুটবল ফেডারেশন। পাশাপাশি তার সঙ্গে করা চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।

অপেশাদার আচরণের দায় এড়াতে ‘মৃত্যুর হুমকি’ দাবি

চাকরি হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার আক্রমণ ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হওয়ার বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে জোনস বলেন, ফুটবলের সিদ্ধান্ত বা পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা করা শতভাগ ন্যায্য। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা এবং মেরে ফেলার হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি অত্যন্ত বাজে কিছু বার্তা পেয়েছি, আমার ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হয়েছে এবং মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমি একজন স্বামী, একজন বাবা এবং একজন সন্তান। মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফলাফলে নিজের ক্যারিয়ারের মূল্যায়ন হতে পারে না বলে দাবি করেন ইংলিশ কোচ জোনস। তিনি বলেন, আমার প্রায় দুই দশকের কাজের অভিজ্ঞতা ও অর্জন মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফলাফলে মুছে যেতে পারে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন