নব্বই মিনিটে একটি দলকে হারানো যায়। কিন্তু একটি দলকে নিঃশব্দ করে দেওয়া? একটি দলকে নিজের ছায়ায় পরিণত করা?
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে, যেখানে এক পাশে এমবাপ্পে, দেম্বেলে, ওলিসে, বারকোলা—এক কথায় আগুনে আক্রমণভাগ, সেখানে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাতে দেখা গেল সেটাই। মাঠে ফ্রান্স ছিল। তবে বেশিরভাগ সময় তারা শুধু বলের পেছনে দৌড়েছে। আর ফুটবলটা শুধু খেলেছে যেন স্পেন।
মাঠে ছিলেন এমবাপ্পে। কিন্তু আলো কেড়েছে ইয়ামাল, ওয়ারজাবাল, রদ্রি, ফ্যাবিয়ানরা। মাঠে ছিল গত বিশ্বকাপের রানার্সআপ। কিন্তু ফুটবল খেলেছে যেন আগামী দিনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
২-০ গোলের দুর্দান্ত জয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল স্পেন। আর কাগজে-কলমে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্স ধরল বাড়ি ফেরার বিমান।
ম্যাচ শুরুর আগে সব হিসাব ছিল ফরাসিদের পক্ষে। এমবাপ্পের বিস্ফোরণ, দেম্বেলের গতি, ওলিসের সৃজনশীলতা, বারকোলার ড্রিবল—এই চার অস্ত্রই ছিল ফ্রান্স কোচ দেশমের সবচেয়ে বড় ভরসা। এই আক্রমণভাগই তাদের সেমিফাইনালে এনে দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু ফুটবল কেবল তারকার খেলা নয়; ফুটবল কৌশলেরও খেলা। আর সেই কৌশলের দাবার বোর্ডে শুরু থেকেই ফ্রান্সকে কিস্তিমাত করে দেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
প্রথম বাঁশি থেকেই স্পেন যেন ঘোষণা করে দেয়—আজ বল আমাদের, ছন্দও আমাদের। ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা বল পেলেই চারদিক থেকে লাল জার্সির ঢেউ। মাঝমাঠে এক সেকেন্ড সময় নেই। ডান দিকে পথ বন্ধ। বাঁ দিকে ফাঁদ। সামনে প্রেস। পেছনে কভার। আধুনিক ফুটবলের ‘পজিশনাল প্রেস’ আর ফাইভ সেকেন্ড ‘কাউন্টার প্রেস’-এর এমন নিখুঁত প্রয়োগ এই বিশ্বকাপে খুব কমই দেখা গেছে।
ফলও মিলেছে হাতেনাতে।
এমবাপ্পে কখনো একা বল পেলেনই না তেমন। দেম্বেলের সামনে তৈরি হয়নি একটিও স্বাভাবিক ওয়ান টু ওয়ান। ওলিসে বল পেলেই পাশে হাজির দুজন স্প্যানিশ। বারকোলার গতি শুরু হওয়ার আগেই থেমে গেছে। ফ্রান্সের আক্রমণ যেন কর্ক লাগানো বোতলের ভেতর বন্দি। শক্তি আছে, বিস্ফোরণ নেই।
১৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল পেয়ে স্পেন প্রথম ধাক্কাটা দিল। ডান প্রান্ত থেকে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন লামিনে ইয়ামাল। পেছন থেকে তার পায়ে আঘাত করেন লুকাস ডিগনে। রেফারি ইভান বার্টনের বাঁশি বাজতে সময় লাগেনি।
পেনাল্টি। স্পটে দাঁড়ালেন মিকেল ওয়ারজাবাল। ফরাসি গোলকিপার মাইক মেইনিয়ান ঠিক দিকেই ঝাঁপিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু শট গোলরক্ষকের জন্য নয়। ইতিহাসের জন্য। ওয়ারজাবালের ডান পায়ের শট তীরের মতো ছুটে জড়িয়ে গেল জালের উপরের কোণে। ম্যাচে স্পেনের লিড ১-০।
গোলের পর রক্ষণে নামেনি স্পেন। বরং আরো সাহসী হয়েছে। আরো উঁচুতে উঠেছে। আরো দ্রুত বল ঘুরিয়েছে। পুরো মাঠকে করেছে বিশাল। আর ফ্রান্সকে আটকে দিল সেই প্রশস্ত সবুজ চত্বরে।
মাঝমাঠে রদ্রি যেন অর্কেস্ট্রার পরিচালক। তার একেকটি পাসে বদলে গেছে আক্রমণের দিক। ফ্যাবিয়ান রুইজ ছন্দ বুনেছেন। দানি ওলমো দুই লাইনের মাঝখানে ঘুরে ঘুরে ফরাসি মিডফিল্ডকে টেনে বের করেছেন। আর ইয়ামাল? মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বয়স ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে, ফুটবলে নয়। উনিশ নম্বর জন্মদিনটা দারুণ জয়ে উপভোগ করলেন স্পেনের প্লেমেকার।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে এমবাপ্পে একবার রাবিওর থ্রু বলে ছুটে উঠেছিলেন। কিন্তু বক্সের অনেক বাইরে উঠে এসে উনাই সিমন মুহূর্তেই নিভিয়ে দেন সেই আশার প্রদীপ। বিরতিতে মনে হচ্ছিল, এক গোলের নয়; দুই ফুটবল দর্শনের লড়াই চলছে।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার মরিয়া চেষ্টা করে ফ্রান্স। কিন্তু যতই সামনে উঠেছে, ততই স্পেনের জন্য খুলেছে নতুন নতুন পথ।
আর সেখানেই আসে শেষ আঘাত। ৬৭ মিনিটে মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে চোখের পলকে আক্রমণে যায় স্পেন। রদ্রির নিখুঁত পাস থেকে ওলমো বাম দিকে ছেড়ে দেন পেদ্রো পারোর জন্য। পারো এক স্পর্শে সামনে এগিয়ে ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিচু ক্রসে বল পাঠান ফ্রান্সের জালে। বেচারা ফ্রান্সের গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না।
স্কোর তাতেই ২-০। ফ্রান্সের জন্য ম্যাচও কার্যত ওখানেই শেষ।
শেষ বিশ মিনিটে ফ্রান্সের শরীর ছিল মাঠে, মন যেন বিমানে। এমবাপ্পে ক্রমশ হতাশ। দেম্বেলের পাসে ধার নেই। ওলিসে হারিয়ে গেছেন স্প্যানিশ প্রেসের ভেতর। বারকোলার পা থেকে উধাও গতি। যে আক্রমণভাগকে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বলা হচ্ছিল, তারা যেন একসঙ্গে ফর্ম হারিয়ে ফেলেছে।
আসলে তারা ফর্ম হারায়নি। স্পেন তাদের খেলতেই দেয়নি। এই জয়ের নায়ক শুধু গোলদাতারা নন। এই জয়ের নায়ক ছিল একটি পরিকল্পনা। একটি দর্শন। একটি সংগঠিত দল।
স্পেন এ রাতে শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি। জিতেছে মাঝমাঠ। জিতেছে কৌশলের যুদ্ধ। জিতেছে মানসিক লড়াই। সবচেয়ে বড় কথা, জিতেছে ফুটবলের সৌন্দর্য। ফাইনালে উঠে এখন তাদের সামনে আর মাত্র একটি ধাপ।
আর ফ্রান্স? তারা ডালাস ছাড়ছে একটি কঠিন শিক্ষা নিয়ে। বিশ্বকাপে শুধু বড় নাম যথেষ্ট নয়। এই সেমিফাইনাল আরেকবার চিরসত্য সেই কথাটাই জানিয়ে গেল, তারকারা ম্যাচ জেতাতে পারে। কিন্তু ইতিহাস লেখে পুরো একটা সম্মিলিত দল।
আর সেই ইতিহাসের পাতায়, বিশ্বকাপে ডালাসের এই রাতটি একটি নামেই—স্পেন।
সেই স্পেন এখন ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে অপেক্ষা করছে হয় আর্জেন্টিনা না হয় ইংল্যান্ডের জন্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


‘বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মতো খেলতে পারিনি’