বর্ষাকালে হৃদরোগীর সতর্কতা

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

বর্ষাকালে হৃদরোগীর সতর্কতা

বর্ষা মানেই স্বস্তির বৃষ্টি, শীতল বাতাস আর সবুজ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এই মনোরম ঋতুই অনেকের জন্য, বিশেষ করে হৃদ্‌রোগীদের জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, অতিরিক্ত আর্দ্রতা, সংক্রমণের প্রকোপ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শারীরিক কার্যকলাপের অনিয়ম—সব মিলিয়ে এ সময় হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কেন বর্ষাকালে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ে?

আমাদের শরীর নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য সবসময় কাজ করে। বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যাহত হয়। ফলে হৃদ্‌যন্ত্রকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছে দিতে তুলনামূলকভাবে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে এ সময় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। জ্বর, নিউমোনিয়া বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের সময় শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায় এবং হৃদ্‌যন্ত্রকে আরো বেশি কাজ করতে হয়। যাদের আগে থেকেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, হার্ট ফেইলিউর রয়েছে, হার্টের ভালভের সমস্যা আছে, অথবা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন (Arrhythmia) রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত চাপ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

যেসব রোগীর সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন

বর্ষাকালে বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন যদি আপনার—

* উচ্চ রক্তচাপ থাকে

* হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকে

* করোনারি আর্টারি ডিজিজ থাকে

* হার্ট ফেইলিউর থাকে

* হার্টের ভালভের রোগ থাকে

* জন্মগত হৃদ্‌রোগ থাকে

* পেসমেকার বা স্টেন্ট বসানো থাকে

* ডায়াবেটিস বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের সঙ্গে হৃদ্‌রোগও থাকে

এছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি, ধূমপায়ী ও স্থূলতায় আক্রান্ত মানুষের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অবহেলা নয়

অনেকেই মনে করেন, বর্ষাকালে গরম কম থাকায় রক্তচাপও স্বাভাবিক থাকবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অনেকের ক্ষেত্রে বর্ষাকালে রক্তচাপ ওঠানামা করতে পারে। আবার অতিরিক্ত লবণযুক্ত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার কারণেও রক্তচাপ বাড়তে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই রক্তচাপের ওষুধ কমানো বা বন্ধ করা উচিত নয়। যাদের বাসায় ডিজিটাল রক্তচাপ মাপার যন্ত্র আছে, তারা সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন নির্দিষ্ট সময়ে রক্তচাপ মেপে লিখে রাখতে পারেন। এতে চিকিৎসকের জন্যও চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

হার্ট ফেইলিউর রোগীদের জন্য বাড়তি সতর্কতা

হার্ট ফেইলিউর এমন একটি অবস্থা, যেখানে হৃদ্‌যন্ত্র শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না। এ সময় শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। বর্ষাকালে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে—

* আগের তুলনায় বেশি শ্বাসকষ্ট

* রাতে শুয়ে থাকতে কষ্ট হওয়া

* পা, গোড়ালি বা পেট ফুলে যাওয়া

* কয়েক দিনের মধ্যে দু-তিন কেজি ওজন বেড়ে যাওয়া

* অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ক্লান্তি

অনেক রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিদিন একই সময়ে ওজন মাপা হার্ট ফেইলিউর নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর একটি অভ্যাস।

সংক্রমণও হতে পারে হৃদ্‌রোগের শত্রু

বর্ষাকালে সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। সংক্রমণের সময় শরীরে প্রদাহ বাড়ে, হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয় এবং অক্সিজেনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এতে আগে থেকেই দুর্বল হৃদ্‌যন্ত্র আরো চাপের মধ্যে পড়ে। তাই জ্বর, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতা দেখা দিলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বৃষ্টিতে ভেজার পর যা করবেন

অনেকেই দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড়ে থাকেন, যা শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দিতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বৃষ্টিতে ভেজার পর যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড় পরুন এবং ভেজা জুতা-মোজা বদলে ফেলুন। শরীর উষ্ণ রাখুন। জ্বর বা শ্বাসকষ্টের মতো কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করবেন না।

খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা জরুরি

বর্ষাকালে রাস্তার খাবার ও দূষিত পানি থেকে ডায়রিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। হৃদ্‌রোগীদের জন্য এটি আরো ক্ষতিকর হতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় তাজা শাকসবজি, মৌসুমি ফল, সামুদ্রিক বা দেশীয় মাছ, ডাল এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ পানি পান করুন।

এ সময় অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, আচার, চিপস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা অবশ্যই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।

ওষুধ বন্ধ করা যাবে না

বর্ষাকালে ভ্রমণ, বৃষ্টি বা দৈনন্দিন ব্যস্ততায় অনেক রোগী নিয়মিত ওষুধ খেতে ভুলে যান, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে রক্তচাপের ওষুধ, রক্ত পাতলা করার ওষুধ, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ, হার্ট ফেইলিউরের ওষুধ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...