বিপিএলের ঢাকা পর্বের প্রথম দিন ছিল কাল। ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল দুটি। কিন্তু দুপুরের ম্যাচ হলো না। বয়কট করলেন ক্রিকেটাররা। রাতের ম্যাচও বাতিল, বয়কটে। আগের দিন বিসিবির পরিচালক নাজমুল ইসলাম ক্রিকেটারদের নিয়ে যে কটু মন্তব্য করেছিলেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে মাঠের ক্রিকেট আর মাঠে নেই। পুরো টুর্নামেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়ল।
গতকাল দুপুরে যখন মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে প্রথম ম্যাচের টস হওয়ার কথা তখন পিচের সামনে বিসিবি পরিচালক আমিনুল ইসলাম একা দাঁড়িয়ে। আর কোথাও কেউ নেই! অনেক দূর থেকে মুখাবয়বের পুরো চিত্র পড়তে না পারলেও তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি জানিয়ে দিল, ভীষণ একা এবং অসহায়বোধ করছেন বিসিবি সভাপতি।
ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাহী কমিটিতে তার সঙ্গীর সংখ্যা ২৫ জন। কিন্তু এদিনের ভীষণ দুঃসময়ে তার পাশে কেউ নেই! বোর্ডে অযোগ্য, অথর্ব সংগঠকদের যে ‘দল’ নিয়ে বুলবুল কাজ করছেন তাদের বেশির ভাগই ম্যাচ উইনার নন, ম্যাচ লুসার! তাদের বেশির ভাগই কাজের চেয়ে কথা বেশি বলেন। যাকে বলে ‘পকপক পরিচালক’!
কিছুদিন আগে সেই পকপক পরিচালকদের একজন আদনান রহমান দীপন তার বাহুল্য কথাবার্তা ও হাবু গোয়েন্দার স্টাইলে বেফাঁস মন্তব্য করে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও বোর্ডকে সংকটে ফেলেন। এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছেন আরেক অদক্ষ সংগঠক, নাজমুল ইসলাম। ক'দিন আগে তামিম ইকবালকে তিনি ‘পরীক্ষিত ভারতীয় দালাল’ এই ট্যাগ দিয়ে ফেসবুকে দাঁত কেলানো হাসি দেন। জাতীয় দলের একজন সাবেক অধিনায়ককে নিয়ে তিনি যে অভব্যতা দেখিয়েছেন তাতে বিসিবির এই পরিচালকের মস্তিষ্কে বাদামি পদার্থের পরিমাণ কতটুকু আছে—তা নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে।
আর গত বুধবার গোটা দেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে তিনি যেসব কটূক্তি করেছেন, তাতে আরেকবার স্পষ্ট হলো মস্তিষ্কে বাদামি পদার্থের অভাবের সঙ্গে তার আরেকটি জিনিসের কমতি বেশ—যার নাম কমনসেন্স!
নাজমুলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যদি বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলে তাহলে ক্রিকেটারদের জন্য বোর্ড আর্থিক ক্ষতিপূরণের কোনো উদ্যোগ কি নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল ঠিক এমন উত্তর দিয়েছিলেন- ‘(ক্রিকেটাররা) এই প্রশ্ন তুলতেই পারবে না।
-কেন?
নাজমুলের তীর্যক জবাব- ‘কারণ আমরা যে ওদের পেছনে এত খরচ করছি। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় ওরা তো কিছুই করতে পারছে না। আজ পর্যন্ত আমরা একটাও বৈশ্বিক কাপ আনতে পারছি? কোনো একটা জায়গায় আমরা কোথায় কী করতে পেরেছি? তাহলে তো প্রত্যেকবারই আমরা বলতে পারি তোমরা কিছু করতে পারোনি। তোমাদের (ক্রিকেটার) পেছনে এই যে এত খরচ করা হয়েছে সেগুলো ফেরত দাও।’
বিসিবিতে অযোগ্য, উদ্ভট ও বাকোয়াস কথাবার্তা বলা পরিচালকদের ভিড়ের কারণে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন আর মাঠে নেই, আছে কেবল বিতর্কে। ব্যাট-বলের চেয়েও অন্য লড়াইয়ে ব্যস্ত ক্রিকেট। সেই লড়াই হচ্ছে যোগ্যতা বনাম অযোগ্যতার, জ্ঞানহীনতা বনাম পরিশ্রমের, মর্যাদা বনাম ময়লার। আর এই লড়াইয়ে কেউ জিতছে না কিন্তু হারছে কেবল ক্রিকেট!
বিসিবির পরিচালকের চেয়ারে বসার আগে নাজমুল ইসলাম নামে যে কোনো ক্রিকেট সংগঠক ছিলেন সেটা তেমন কেউ জানত না। সম্ভবত এজন্যই নিজেকে চেনানোর জন্য মাইক্রোফোন সামনে পেলেই আজগুবি এবং উদ্ভট সব মন্তব্য করা শুরু করলেন তিনি। আলোচনায় থাকার জন্য হঠাৎ করে পরিচালকের পদবি ভুলে হয়ে গেলেন অ্যাক্টিভিস্ট। পরিচালক হয়ে এরা যেন দেশের ক্রিকেটের জমিদার বনে গেলেন। ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বাকি সবাইকে প্রজা ভাবতে শুরু করলেন!
এই অযোগ্য, অদক্ষ, অভদ্র, অসহনশীল লোকগুলো চরম বিতর্কিত এবং ছক সাজানো ইলেকশনের নামে সিলেকশনের কল্যাণে বিসিবিতে পা রাখতে পেরেছে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ক্রীড়া উপদেষ্টা থাকার সময় পরিকল্পিতভাবেই এদের বিসিবির মসনদে বসানো হয়েছে। ই-ব্যালটে বিসিবির সাজানো নির্বাচন ছিল ক্ষমতা ভাগাভাগির স্রেফ এক চুক্তি। যার বিনিময় মূল্য ছিল নগদ নারায়ণ। সেই চুক্তিতে সই করে নাজমুল ইসলামদের মতো অযোগ্যরা বিসিবির বোর্ডরুমে ঢুকে পড়েছেন। প্রহসনের নির্বাচন তাদের এত দুঃসাহস এনে দিয়েছে যে তারা এখন দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার ক্রিকেটারদের অপমান-অপদস্থ করছেন। ক্রিকেট না বোঝা, ক্রিকেট না জানা, ক্রিকেটারদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না থাকা ঠগবাজদের দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তা বানানো হয়েছে। এই ক্রিকেট জ্ঞানহীনদের কারণে পুরো দেশের ক্রিকেট এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও হাস্যকর হয়ে উঠছে!
নাজমুল ইসলাম বিসিবির ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে ভাবলেন দেশের ক্রিকেটের এক হাজার ৩০০ কোটির তহবিলের মালিক তিনি। যে ক্রিকেটারদের ঘামে বিসিবির এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার তহবিল দাঁড়িয়ে, তাদেরই তিনি অপমান করলেন। তাও আবার একবার নয়, বারবার। যারা মাঠে লড়াই করে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে, দেশকে জিতিয়েছে; সেই তারাই এখন তার চোখে চাকর-বাকর। ক্ষমতার চেয়ারে বসে তিনি নিজেকে জমিদার ভাবতে শুরু করেছেন। ভাবখানা এমন যে তিনি দিনভর অনেক পরিশ্রম করে টাকা কামাই করেন এবং সেই টাকা থেকে ক্রিকেটারদের বেতন, পারফরম্যান্স বোনাস হয়!
নাজমুল ইসলামের কাছে আমার এক সঙ্গী সাংবাদিক বিনীত প্রশ্ন করেছেন—এই যে দুপুরের ফ্লাইটে বিপিএল দেখতে সিলেটে গেলেন এবং ফিরলেন বিমানের বিজনেস ক্লাসে উড়ে। সেই টিকিটের টাকা আপনাকে কে দিয়েছে? সিলেটে ফাইভ স্টার হোটেলে থাকলেন কটা দিন। স্টেডিয়ামের প্রেসিডেন্ট বক্সে বসে ফাইভস্টারে কুকিজে কামড় এবং কফিতে চুমুক যে দিলেন, সেই খরচের উৎস কী? সেই টাকা কিন্তু তিনি নিজের মানিব্যাগ থেকে খরচ করেননি। সেই টাকাটা বিসিবির। আর ক্রিকেটাররা খেলেই বলেই সে টাকা পায় বিসিবি। বিসিবির অর্থকে নিজের ব্যক্তিগত ভোগের উৎস বানালেন আর দিনশেষে সেই ক্রিকেটারদের গালিগালাজ করছেন।
নুনের গুন না গাইলে তাকে কি বলে জানেন নিশ্চয়ই, নিমকহারাম!
তামিম ইকবালকে নিয়ে তার আগের মন্তব্য ছিল নোংরামির চূড়ান্ত উদাহরণ। সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, তার মুখ খুললেই ক্রিকেটের মর্যাদায় ছুরি বসে। নাজমুলের রিপোর্ট কার্ড জানাচ্ছে বেহুদা বিতর্ক তৈরি করা ছাড়া গত চার মাসে বিসিবিতে আর কিছুই করতে পারেননি এই পরিচালক। তার আচরণ এবং বিষাক্ত ভাষা দেখে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মানসিকভাবে তিনি সুস্থ আছেন তো? এদের কাজ-কারবার দেখে মনে হচ্ছে পুরোদস্তুর এক ক্রিকেট ক্লাউনের হাতে পড়ে আছে দেশের ক্রিকেট বোর্ড।
বিসিবি নিজেই নাজমুলের বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করেছে। প্রতিবাদ জানিয়েছে। বোর্ড পরিচালক শানিয়ান তামিম প্রকাশ্যে কড়া সমালোচনা করেছেন। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার নাজমুল ইসলামের কথা বিসিবির নীতি নয়, এটি তার ব্যক্তিগত বিকৃতি। তাহলে প্রশ্ন হলো, এমন একজন লোককে বোর্ডে রাখার দায় কার? দায় সেই ব্যবস্থার, যারা আসিফ মাহমুদের সময় এসব অযোগ্য লোককে ক্ষমতার চেয়ারে বসিয়েছে। দায় সেই প্রহসনের নির্বাচনের, যা ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করেছে। আর দায় বিসিবির, যারা এখনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দেখাচ্ছে না। দেশের ক্রিকেট কারো কোনো বাপের জমিদারি নয়, এটা জনগণের আবেগ ও ভালোবাসার অন্য নাম। এখানে অযোগ্যতার কোনো জায়গা নেই। লুজ বলকে যেমন সপাটে ছক্কা হাঁকিয়ে মাঠের বাইরে ফেলা হয়, নাজমুল ইসলাম এখন তেমনই লুজ বল। বিসিবির উচিত এই পরিচালককে বোর্ডরুম থেকে বের করে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেওয়া—প্লিজ, গেট আউট ফ্রম ক্রিকেট!
নষ্ট এবং পচে যাওয়া মানসিকতায় ক্রিকেট বাঁচে না। আমরা চাই সম্মানের সঙ্গেই ক্রিকেট দ্রুততম সময়ে মাঠে ফিরুক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

