২-০ গোলে হার। আমরা এই ম্যাচ থেকে কোনো পয়েন্ট পাইনি। কোনো গোলও করতে পারিনি। কিন্তু যা পেলাম, তার নাম মর্যাদা, সম্মান। ম্যাচে হারের পরও বাংলাদেশ দল যে পুরো গ্যালারিজুড়ে হাততালি পেল, সেটাই জানাচ্ছে এ ম্যাচে বাংলাদেশ দলও ‘বড় বিজয়ী’।
টুর্নামেন্টে আমাদের এই ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে এখানে ভালো কিছু করার সুদৃঢ় একটা পণ নিয়ে এসেছে গোটা দল। কোচের পরিকল্পনাকে প্রশংসা করতেই হচ্ছে। আর ডিফেন্স, মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগ পুরো এলাকাজুড়ে মেয়েরা যে ফুটবল খেলেছে, সেটা হাততালি পাওয়ার যোগ্য।
অধিনায়ক আফঈদা ম্যাচ শেষে প্রেস কনফারেন্সে যা বলেছে, তাতেই স্পষ্ট এখন এ দলের কনফিডেন্ট লেভেল অনেক উঁচুতে। আমার বিশ্বাস পরের ম্যাচে প্রতিপক্ষ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমরা ভালো কিছু করব। সত্যি বলতে চীনের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে আমরা এত দুর্দান্ত ফুটবল খেলব, সেটা আমিও আশা করিনি। আমি আসলে কোনোভাবেই এমনটা ভাবিনি! ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এভাবে কোমর কষে, চোখে চোখ রেখে লড়াই করা সহজ কিছু নয়। সেই কঠিন কাজটাই বাংলাদেশের মেয়েরা এই ম্যাচে সহজ করে দেখিয়েছে।
পিটার বাটলার সব সময় কিন্তু হাই প্রেসিং খেলার জন্যই দলকে পরিকল্পনা দেন। তার ডিফেন্সিভ লাইন কিন্তু একদম মিডফিল্ড পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাই ম্যাচের আগে আমরা ধরে নিয়েছিলাম তিনি হয়তো এই কৌশল থেকে কিছুটা ব্যাক করবেন, কিন্তু তার খেলার ধরনে কোনো বদল আনেননি। তিনি হয়তো ডিফেন্সে একজন খেলোয়াড় বাড়িয়েছেন। থ্রি ডিফেন্স নিয়ে খেলেছে; কিন্তু তার ডিফেন্স ছিল কম্প্যাক্ট; প্রায় নিখুঁত!
হাইলাইন ডিফেন্স পরিকল্পনা বড় দলগুলোর বিপক্ষে কাজে দেয় এবং কাজে দিয়েছেও তাই। আমরা দুটি গোল হজম করেছি ৪০ মিনিট পর; এর আগে পর্যন্ত যদি দেখেন, আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশ দল ফ্যান্টাস্টিক ফুটবল খেলেছে এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আপনি তেমন কোনো কিছু সুযোগ দেননি এবং প্রথম গোলটি আমরা পেতে পারতাম। ঋতুপর্ণা চাকমার ওই শটে যদি গোল হতো, আমরা কিন্তু এক গোলে লিড নিতাম এবং তখন আসলে খেলার দৃশ্যপট বদলে যেতে পারত। এখানে আমি পিটার বাটলারকে একটা অনন্য উচ্চ ক্রেডিট দিতে চাই।
বাটলারের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি বলতে হয়, তাহলে গোলকিপার মিলির কথা বলতে হবে। মিলি তো বেসিক্যালি এরকম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেনি। আপনি যদি ২০২২ সাফ থেকে এ পর্যন্ত শুরু করেন, সব প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচই খেলেছে রূপনা চাকমা এবং লাস্ট আমরা ঘরের মাটিতে যে সিরিজটি খেলেছি, সেখানেও রূপনা চাকমা নিজেকে চিনিয়েছে। তাই মিলি যে আসলে খেলবে- এটা কিন্তু আমরা কেউ চিন্তাই করিনি। কিন্তু মিলিকে আমার মনে হয় অব দ্য সিন, সে প্রিপেয়ার্ড করেছে। হ্যাঁ, আমার মনে হয় তার প্রতিভা সে লুকিয়ে রেখেছে এবং সেটা সে ম্যাচে প্রয়োগ করেছে। সে সফল হয়েছে এবং আপনি যদি দেখেন, পুরো ম্যাচের সিনারিও কিন্তু অনেকভাবেই চেঞ্জ করে দিয়েছে মিলি। দুর্দান্ত সেভ করেছে এবং পুরো খেলাটা এমনভাবে রিড করেছে, ম্যাচের যত সিনারিও এসেছে, সেটাকে সে নিজের কব্জায় রেখেছে। এ ধরনের ম্যাচে এত হাই ইন্টেনসিটি, হাই ভোল্টেজ ম্যাচে নিজেকে যেভাবে প্রমাণ করেছে, তাতে আমি বলব পিটার বাটলারের ক্রেডিট প্রাপ্য। একইসঙ্গে গোলকিপার কোচ উজ্জ্বলকেও ক্রেডিট দেব।
আবার গোলকিপার রূপনাকে আমি ছোট করছি না। ব্যাক টু ব্যাক দুটি সাফে সে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিন্তু আপনার যখন ভালো ব্যাকআপ থাকবে, তখন ভালো কম্পিটিশনও থাকবে। মিলি যেটা করে দেখিয়েছে, সেটাকে অনবদ্য বলতে হয়। তার উচ্চতা ভালো, বয়স কম এবং আপনি যদি দেখেন লং রেঞ্জ শুটগুলো, যেগুলো মিডফিল্ড ক্রস করে এসেছে- সেগুলো সে শট করেছে। সে হিসেবে আমি বলতে চাইছি, তার পারফরম্যান্সের জায়গাটা যদি আপনি আমাকে বলেন, তবে আমি অবশ্যই বলব ‘আউটস্ট্যান্ডিং’।
সেকেন্ড হাফে বল দখল ও অ্যাটাকে বাংলাদেশ ফোকাস করেছে বেশি। মিডফিল্ড ও আক্রমণভাগে বেশ ভালো ডমিনেট করেছে আমাদের দলের মেয়েরা। এটা বলতেই হবে। এর অন্যতম কারণ হলো তিন সেন্টার ব্যাক নিয়ে যখন আপনি খেলবেন, তখন মিডফিল্ডে কিন্তু প্লেয়ারের সংখ্যা বেশি থাকে এবং তাতে সুবিধাও হয়। কোচ পিটার বাটলার সম্পর্কে আপনি যত আলোচনা-সমালোচনাই করুন না কেন, তিনি মাঠের ফুটবলে সব জবাব নীরবে দিয়ে দিয়েছেন।
চীনের কোচ বাংলাদেশ দলকে সমীহ করছে এবং স্পেসিফিকলি কিছু খেলোয়াড়ের নামও উল্লেখ করে জানিয়েছে ওই প্লেয়াররা তাদের বিপক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে। চীন দলের টেকনিক্যাল টিম আমাদের ম্যাচের ভিডিওগুলো দেখেছে। সেভাবেই তারা গেম প্ল্যানের বড় একটা অংশ সাজিয়েছে। যেখানে আমাদের ঋতুপর্ণা চাকমার সঙ্গে মনিকা এবং মারিয়াকে তারা বিপজ্জনক এবং গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে ধরেছে। মনিকা-মারিয়া কিন্তু বেশ ভালোভাবেই মিডফিল্ডে ব্লক করার চেষ্টা করেছে। আমাদের নিয়ে কিন্তু প্রতিপক্ষ সজাগ থাকে। আপনি শুধু একবার চিন্তা করে দেখুন, এ ব্যাপারটা আসলে আমাদের জন্য কত বড় সম্মানের। মেয়েরা দেখিয়ে দিল বৈশ্বিক আসরেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ তাদের সমীহ করছে। এই সম্মান আমাদের মেয়েরা অর্জন করেছে। তাদের ধন্যবাদ।
একটা আশার জায়গা তৈরি হয়েছে যে, পরের ম্যাচে আমরা আরো ভালো করতে পারব। কারণ, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে আপনি যেভাবে ফাইট করেছেন, যেভাবে সেকেন্ড হাফে বল পজিশনে রেখেছেন এবং মিডফিল্ড ডমিনেট করেছেন, তাতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমার কাছে মনে হয় আরো ভালো ফুটবল খেলতে পারব। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমরা ভালো কিছু করব। আমি খুব আশা রাখছি, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যদি আমরা ড্র করতে পারি, উজবেকিস্তানকে যদি আমরা হারাতে পারি, তাহলেই আমাদের মিশনটা সফল হবে।
৬ মার্চের ম্যাচের আগে খেলোয়াড়রা যাতে স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎফুল্ল থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। এটা ম্যাচ জেতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জাহিদ হাসান এমিলি
বাংলাদেশ ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

