সিলেটে নেদারল্যান্ডস সিরিজ চলাকালে ছক্কা নিয়ে হয়েছিল অনেক আলোচনা। ধুন্ধুমার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ছক্কা হাঁকানোতে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ দল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই দুর্বলতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে তানজিদ তামিম-লিটন দাসরা। দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে সেই প্রমাণ অবশ্য মেলে পরিসংখ্যান ঘাটলে। ছক্কায় বাংলাদেশের এই উন্নতি দেখলে অনেকে হয়তো জুলিয়ান উডকে কৃতিত্ব দিয়ে বসবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- উড উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখার টোটকা দিয়েছেন শুধু। তার দেখানো পথে হাঁটলে বাড়বে ক্রিকেটারদের সামর্থ্য। উডের আগমনের আগ থেকেই ছক্কা হাঁকানোয় অনেকটা ‘বিপ্লব’ করে ফেলেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। পরিসংখ্যান বলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এশিয়া কাপে ছক্কায় নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেবে লিটন দাস-তানজিদ তামিমরা।
অথচ এক সময়ে ছক্কার পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ ছিল অনেকটাই পিছিয়ে। অভিষেক টি-টোয়েন্টি থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৪৪ ম্যাচে বাংলাদেশের ছক্কা সংখ্যা ছিল ৫৫১। ৭৭ ক্রিকেটার মিলিয়ে ম্যাচ প্রতি প্রায় চারটি ছক্কা হাঁকায় বাংলাদেশ। আর যদি ক্রিকেটার প্রতি বিবেচনা করা হয়- তাহলে সংখ্যা মাত্র ৭। এই সময়ে ছক্কা হাঁকানোয় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০ নম্বরে। লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের অবস্থান থাকতে পারত আরো পেছনে। তবে সে সময় আইসিসি সব সদস্য দেশকে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলার সুযোগ না দেওয়ায় শীর্ষ ১০-এ ছিল বাংলাদেশের অবস্থান। শীর্ষে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই সময়ে ১৭৬ ম্যাচে হাঁকিয়েছিল ১১৯১ ছক্কা। বাংলাদেশের চেয়ে কম ম্যাচ খেলা আফগানিস্তানের ছক্কা সংখ্যা ছিল ৬৬৭। এর জন্য তারা খেলেছিল ১০৭ ম্যাচ।
এই সময়ে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ড ছিল মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের । ১২১ ম্যাচে তিনি হাঁকান মাত্র ৬৪ ছক্কা। একটি ছক্কা হাঁকাতে তাকে খেলতে হয়েছে প্রায় দুটি ম্যাচ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সাকিব ১০৯ ম্যাচে ৪৭ ও সৌম্য সরকার ৭২ ম্যাচে হাঁকান ৪৬ ছক্কা। এই সময়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকানো রোহিত শর্মার ১৪৮ ম্যাচে ছিল ১৮২ ছক্কা। এইটুকু তথ্যই যথেষ্ট ২০২২ সাল পর্যন্ত ছক্কা হাঁকানোয় কতটা পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ, সেটা জানতে।
শুরুর ১৬ বছরের ওই পরিসংখ্যান অনেকটাই বদলে গেছে শেষ আড়াই বছরে। ২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দল ৫৩ ম্যাচে হাঁকিয়েছে ২৮৯ ছক্কা। ম্যাচপ্রতি সংখ্যাটা প্রায় সাড়ে পাঁচ। ক্রিকেটারপ্রতি হিসাব করলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় ৮। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি ও ক্রিকেটারপ্রতি-দুই জায়গায় বেড়েছে বাংলাদেশের ছক্কা। ২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত লাল-সবুজের জার্সিতে খেলেছেন ৩৭ ক্রিকেটার। এই সময়ে একমাত্র দেশ হিসেবে ৫০০-এর বেশি ছক্কা হাঁকায় শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৫২ ম্যাচে দেশটির ছক্কা সংখ্যা ৫৩০! অর্থাৎ, ম্যাচ প্রতি ১০টির বেশি ছক্কা হাঁকিয়েছে দলটির ক্রিকেটাররা।
শেষ আড়াই বছরে বাংলাদেশের শীর্ষ ছক্কা হাঁকানো ক্রিকেটারদের তালিকার নামটাও বদলে গেছে। জুলিয়ান উডের পছন্দের ক্রিকেটার জাকের আলী অনিক শেষ আড়াই বছরে ৩৬ ম্যাচে হাঁকান ৩৮ ছক্কা। অর্থাৎ ম্যাচ প্রতি একটির বেশি ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ড আছে তার। দুই নম্বরে থাকা তাওহিদ হৃদয় ৪৬ ম্যাচে ৩৭ ছক্কা, লিটন দাস ৪৫ ম্যাচে ৩৪ ছক্কা, তানজিদ তামিম ৩১ ম্যাচে ৩৪ ও পারভেজ হোসেন ইমন ১৮ ম্যাচে হাঁকিয়েছেন ২৭ ছক্কা। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে অবশ্য বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা অনেকটাই পিছিয়ে থাকবেন। কারণ, এই সময়ে ছক্কা হাঁকানোয় সবার ওপরে থাকা মোহাম্মদ ওয়াসিম ৬২ ম্যাচে পেয়েছেন ১৩১ ছক্কার দেখা। তবে মজার ব্যাপার হলো- এই সময়ে আইসিসির সব সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়ায় শীর্ষ স্থানগুলোতে টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটারদের নাম খুঁজে পাওয়াই কঠিন। টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার ওপরে থাকা সিকান্দার রাজা ৪৬ ম্যাচে হাঁকান ৭৪ ছক্কা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রভম্যান পাওয়েল ৪৪ ম্যাচে ৭০ ও অস্ট্রেলিয়ার টিম ডেভিড ৩৫ ম্যাচে পেয়েছেন ৫৭ ছক্কার দেখা। এই পরিসংখ্যানটা একটু ভালোমতো খেয়াল করলে স্পষ্ট যে, বড় দলগুলোর খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছক্কা হাঁকানোয় ভালোই টেক্কা দিচ্ছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।
এ তো গেল সামগ্রিক ব্যাপার। বছরওয়ারি চিন্তা করলে ছক্কা হাঁকানোয় বাংলাদেশ দল ২০২৪ সালকে এগিয়ে রাখতে পারেন লাল-সবুজের সমর্থকরা। এই বছর ২৪ ম্যাচে ১২২ ছক্কা হাঁকিয়েছে বাংলাদেশ দল। ম্যাচ প্রতি ছক্কার সংখ্যা ছিল পাঁচটি করে। ক্রিকেটারপ্রতি সংখ্যাটা প্রায় ছয়। যথারীতি ২০২৪ সালেও সবচেয়ে বেশি ২৪৩ ছক্কা হাঁকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০২৪ সালে শীর্ষ ১০-এ বাংলাদেশের নাম না থাকলেও উন্নতি চোখে পড়ার মতো। কারণ, টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে সপ্তম সর্বোচ্চ ছক্কা হাঁকানো দেশটির নাম যে বাংলাদেশ। এই বছর বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকান জাকের আলী অনিক। ১৯ ম্যাচে তার ছক্কা ছিল ২১টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তাওহিদ হৃদয় জাকেরের সমান ছক্কা হাঁকান ২১ ম্যাচে। বছরজুড়ে বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখানো মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২০ ম্যাচে হাঁকান ১৩ ছক্কা। এশিয়া কাপের দলে না থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত ২১ ম্যাচে ১২, রিশাদ হোসেন ২৪ ম্যাচে ১১ ও তানজিদ তামিম ১৩ ম্যাচে হাঁকান ১১ ছক্কা। এই বছর সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকান সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোহাম্মদ ওয়াসিম। ২৬ ম্যাচে তার ছক্কা সংখ্যা ছিল ৫৫টি। টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে নিকোলাস পুরান ২১ ম্যাচে হাঁকান সর্বোচ্চ ৩৮ ছক্কা।
২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দল ছক্কার সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছে। এর আগে ২০০৬ সালে টি-টোয়েন্টি অভিষেকের পর কোনো বছরই ছক্কার সেঞ্চুরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ, এশিয়া কাপ শুরুর আগ পর্যন্ত মাত্র ১৫ ম্যাচেই বাংলাদেশের নামের পাশে আছে ১১৬ ছক্কা! এ সময়ে ম্যাচ প্রতি বাংলাদেশের ছক্কা প্রায় ৮টি করে। আর ক্রিকেটারপ্রতি এই সংখ্যাটা ৫। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকিয়েছে মাত্র পাঁচটি দেশ। এর মধ্যে টেস্ট খেলুড়ে দেশ মাত্র দুইটি। শীর্ষে থাকা অস্ট্রিয়া ২৭ ম্যাচে হাঁকিয়েছে ২৮০ ছক্কা! টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকায় পাকিস্তান। ২৫ ম্যাচে সংখ্যাটা ১৫২। সমান সংখ্যক ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছক্কা ১৩০টি।
এই বছর বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ২৩ ছক্কা এসেছে তানজিদ তামিমের (১৩ ম্যাচে) ব্যাটে। দুই নম্বরে থাকা পারভেজ হোসেন ইমন ১২ ম্যাচে হাঁকান ২২ ছক্কা। লিটন দাস ১৫ ম্যাচে ১৯ ও জাকের আলী অনিক ১৪ ম্যাচে ১৬ ছক্কা হাঁকিয়েছেন। এই বছর বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ছক্কা এসেছে অস্ট্রিয়ার করণবীর সিংয়ের ব্যাটে। ২৮ ম্যাচে তার ছক্কা সংখ্যা ৯৯। টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকান পাকিস্তানের হাসান নাওয়াজ। ১৯ ম্যাচে তার ছক্কা সংখ্যা ৩৪। দ্বিতীয় স্থানে দক্ষিণ আফ্রিকার ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। তার ছক্কা সংখ্যা ৮ ম্যাচে ২৬।
গত দুই বছরে ছক্কা হাঁকানোয় বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে সেটা একদম স্পষ্ট করেই বলা যায়। এশিয়া কাপে এখন সেই ধারাবাহিকতা লিটন দাসের দল ধরে রাখতে পারে কি না সেটাই দেখার অপেক্ষা। বলা হয় ‘মাসল মেমরি’ নাকি সহজাত শট খেলতে প্রলুব্ধ করে। ছক্কা হাঁকানোর সেই ‘মাসল মেমরি’ ক্রিকেটাররা এশিয়া কাপেও কাজে লাগাবেন সেটাই তো চাওয়া সবার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

