নারীর শরীর একটি স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক ছন্দে পরিচালিত হয়, যেখানে প্রতি মাসেই নতুন জীবনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি তিনটি বিষয় মাসিক, ওভুলেশন এবং গর্ভধারণ। অনেকেই এ বিষয়ে কিছুটা জানলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভুল ধারণা কম নয়। অথচ নিজের শরীরের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দুটোই সহজ হয়ে ওঠে।
মাসিক: স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া
মাসিক বা পিরিয়ড নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘটনা, যেখানে জরায়ুর ভেতরের আবরণ নির্দিষ্ট সময় পর ঝরে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাসিক চক্র সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হলে সেটি স্বাভাবিক ধরা হয়। অর্থাৎ কারও ২১ দিনে আবার কারও ৩৫ দিনে চক্র সম্পন্ন হলেও তা স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই পড়ে।
প্রতিটি চক্রে সাধারণত ৫০ থেকে ১৫০ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয় বয়স, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার ধরন মাসিকের সময় ও ধরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
ওভুলেশন: গর্ভধারণের গুরুত্বপূর্ণ সময়
ওভুলেশন হলো সেই সময়, যখন ডিম্বাশয় থেকে একটি পরিপক্ক ডিম্বাণু বের হয়ে জরায়ুর দিকে অগ্রসর হয়। এই সময়টিই গর্ভধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সাধারণভাবে ধরা হয়, পরবর্তী মাসিক শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ দিন আগে ওভুলেশন ঘটে।
যেমন: ২৮ দিনের চক্রে প্রায় ১৪তম দিনে, ৩৪ দিনের চক্রে প্রায় ২০তম দিনে, ২৪ দিনের চক্রে প্রায় ১০ম দিনে। তবে এটি একটি গড় হিসাব; বাস্তবে ব্যক্তিভেদে এই সময় কিছুটা এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে।
ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর সময়কাল
গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সময়ের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিম্বাণু সাধারণত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে, অন্যদিকে শুক্রাণু নারীর শরীরে ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
এই কারণে ওভুলেশনের আগের কয়েক দিন এবং ওভুলেশনের দিনকে সবচেয়ে বেশি উর্বর সময় বা ‘ফার্টাইল উইন্ডো’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে মিলন ঘটলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
কখন গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি
ওভুলেশনের আগের ২-৩ দিন এবং ওভুলেশনের দিন এই সময়টিতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে এই সময় সম্পর্কে জানা জরুরি। একইভাবে, যারা আপাতত গর্ভধারণ এড়াতে চান, তাদের জন্যও এই সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
অনেকেই মনে করেন, মাসিক শেষ হওয়ার পরপরই গর্ভধারণ সম্ভব নয়। কিন্তু যাদের চক্র ছোট, তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের পরপরই ওভুলেশন হতে পারে। সবার ওভুলেশন ১৪তম দিনেই হয় এটিও সঠিক নয়; এটি শুধু ২৮ দিনের চক্রের একটি গড় হিসাব। অনিয়মিত মাসিক মানেই গুরুতর সমস্যা এটিও সবসময় ঠিক নয়, তবে দীর্ঘদিন অনিয়ম থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে সচেতন থাকবেন
নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে- মাসিকের তারিখ নিয়মিত নোট রাখা, মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য হিসাব করা ,শরীরের পরিবর্তন, যেমন হালকা ব্যথা বা স্রাবের ধরণ লক্ষ্য করা। এসব তথ্য থেকে ওভুলেশন ও উর্বর সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয়।
মাসিক, ওভুলেশন ও গর্ভধারণ এই তিনটি বিষয় আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান শুধু মাতৃত্ব পরিকল্পনাতেই সহায়ক নয়, বরং নিজের শরীর সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস ও সচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নারীর শরীর কোনো রহস্য নয়; এটি একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর ছন্দ যাকে বোঝা মানেই নিজের জীবনের উপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
তথ্যসূত্র: আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ধূমপান যেভাবে ধীরে ধীরে আপনার হৃদযন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে
রান্নায় অতিরিক্ত তেল, আপনাকে ঝুঁকিতে ফেলছে না তো