অস্ট্রেলিয়ায় নারী এশিয়ান কাপে গতকাল প্রথমবারের মতো খেলতে নেমে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাল বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এই টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে প্রবল প্রতিপক্ষ চীনের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ নারী দল। শক্তি, সামর্থ্য ও অতীত সাফল্যের রেকর্ডে এই দুদলের ম্যাচের ‘অসম’ লড়াই দেখছিলেন অনেকে। চীনের বিপক্ষে কত গোলে হজম করে হারে বাংলাদেশ- সেই শঙ্কা ছিল। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে এশিয়ার সেরা মঞ্চে ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে লড়াকু ও সাহসী ফুটবল খেলেছে নারী দল।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন চীনের কাছে ২-০ গোলে হারলেও মাঠের পারফরম্যান্সে সবার মন জয় করল বাংলাদেশের মেয়েরা। সব দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকা চীনের সঙ্গে টক্কর দিয়ে সমান তালে লড়েছে তারা। প্রথমার্ধের শেষ ১০ মিনিটের খেলা বাদ দিলে চীন ও বাংলাদেশ দলের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান, সেটি মাঠের লড়াই বোঝা যায়নি। ৪৪ ও ৪৬ মিনিটে দুটি গোল হজম করে ম্যাচে পিছিয়ে না পড়লে এশিয়ান কাপের শুরুটা অবিস্মরণীয় করে রাখতে পারত বাংলাদেশ নারী দল।
পুরো ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশ গোলরক্ষক মিলি আক্তার। শারীরিক উচ্চতা কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন অভিজ্ঞ রুপনার জায়গায় খেলতে নামা এই গোলকিপার। প্রশংসা করার মতোই ফুটবল খেলেছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। খেলার ১৪ মিনিটে তার দারুণ এক দূরপাল্লার শট মুগ্ধতা ছড়ায়। চীনের গোলরক্ষক অবিশ্বাস্য দক্ষতা ফিস্ট করে গোল বাঁচান। বলের নিয়ন্ত্রণ আর চমৎকার ড্রিবলিংয়ে মনিকা চাকমাও নজর কেড়েছেন।
প্রথমার্ধে গোল হজমের পর দ্বিতীয়ার্ধে খেলায় নিজেদের আরো মানিয়ে নিয়ে আক্রমণে যায় বাংলাদেশ দল। চাপ সৃষ্টি করে চীনের অর্ধে। বেশকিছু সুযোগও তৈরি করে তারা। শুরু থেকে ম্যাচের শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়রা যেভাবে চীনের বিপক্ষে পাল্লা দিয়ে খেলেছেন, তাতে এশিয়ান কাপের মঞ্চে নতুন বার্তাই দিল বাংলাদেশের মেয়েরা। আগামী ৬ মার্চ ‘বি’ গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে টুর্নামেন্টের আরেক শক্তিশালী দল উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। এরপর ৯ মার্চ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ রয়েছে তাদের।
সিডনির ৩০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কমনওয়েলথ ব্যাংক স্টেডিয়ামে খেলার শুরুতে শক্ত রক্ষণভাগ মাঠে নামান বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার। একাদশে পাঁচ ডিফেন্ডার রাখেন এই ইংলিশ কোচ। দ্বিতীয়ার্ধে একাদশে পরিবর্তন এনে মিডফিল্ডে শক্তি বাড়ান বাটলার। বাংলাদেশের রক্ষণের বিপক্ষে কুলিয়ে উঠতে পারেনি চীনের মেয়েরা। তবে ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের বিপক্ষে আধিপত্য বিস্তার করে খেলে তারা। চীনের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা বাংলাদেশ দলকে কিছুটা নড়বড়ে দেখাচ্ছিল। চার মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে চীনের লিউ জিংয়ের শট পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।
১২ মিনিটে ওয়াং সুয়াংয়ের শট ফিস্ট করে ফেরান গোলরক্ষক মিলি। ফিরতি পাসে বল পেয়ে ওয়াংয়ের হেড পোস্টের বাইরের দিকে লেগে বেরিয়ে যায়। ১৪ মিনিটে ঋতুপর্ণার চমক দেখা যায়। তার নেওয়া দূরপাল্লার শটে লাফিয়ে ফিস্ট করে কোনোমতে ক্রসবারের ওপর দিয়ে বের করে দেন চীনের গোলরক্ষক চেন চেন। ২৪ মিনিটে ক্রস পেয়ে ওয়াং হেডে বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়ে যায়। এ ম্যাচে প্রথমবারের মতো ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে বাংলাদেশ নারী দলের। এরপর বিরতিতে যাওয়ার আগে স্কোর লাইন গোলশূন্য থাকবে-এমন ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু ৪৪ মিনিটে বাংলাদেশকে হতাশ করে প্রথম গোল আদায় করে নেয় চীন।
বাংলাদেশের প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে দিয়ে সতীর্থের থ্রু পাস ধরে কোনাকুনি শটে দূর পোস্টে বল জালে জড়ান ওয়াং। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে (৪৬ মিনিটে) ঝ্যাং রুই আরেকটি গোল করলে চীন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। ঝ্যাংয়ের নেওয়া নিচু শটে বল বাংলাদেশ ডিফেন্ডার কোহাতি কিসকুর পায়ে ডিফ্লেক্ট হয়ে জালে জড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধে চীনের আক্রমণের সামনে দারুণ লড়ে বাংলাদেশ দল। তেঁড়েফুঁড়ে বেশ কয়েকবার গোল সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালায় চীন। কিন্তু ডিফেন্স শক্ত করে হারের ব্যবধান আর বাড়তে দেয়নি বাংলাদেশ।
ম্যাচে হারলেও বাংলাদেশ ঠিক্ই জানিয়ে দিল বড় আসরের এই টুর্নামেন্টে ভালো কিছু করার জেদ, জোস, আত্মবিশ্বাস এবং কমিটমেন্টের কোনো ঘাটতি নেই তাদের।
৬ মার্চ একই ভেন্যূতে আরেক শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তত বাংলাদেশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

