মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে থেমে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি সাময়িক স্বস্তি পেয়েছিল। তেল ও গ্যাস উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত ছিল এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কাও কমে এসেছিল।
কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নতুন করে বিমান হামলা এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরানের পাল্টা আক্রমণে পরিস্থিতি আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এবারের সংঘাত দ্রুত শেষ হবেÑএমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান নিজ ভূখণ্ডে হামলার মুখেও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপে অনড়। আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলোয় ধারাবাহিক হামলা, বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশের তেল-গ্যাস স্থাপনায় সম্ভাব্য বিঘ্ন বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। খবর নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
তেল ও গ্যাস উৎপাদনে যেকোনো বাধা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, বেড়ে যেতে পারে বন্ধক, গাড়ি ঋণ ও অন্যান্য ঋণের খরচ। এতে ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার দিকে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেনেথ এস রোগফ বলেছেন, বিশ্ব এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেকেই সংঘাতকে স্বল্পমেয়াদি ভাবছেন কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন বার্তা দেয়। তিনি আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, তখনও অনেকে ভেবেছিলেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে কিন্তু তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ। বিশ্বে মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৭ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশ যায় এশিয়ায়।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সময় যেমন সরবরাহ কমে গিয়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তেমন পরিস্থিতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। অনেক তেল উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
১৯৭০-এর দশকের সংকটের পর বহু দেশ জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে হাঁটে। জীবাশ্ম জ্বালানির ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে চীন ও ইউরোপ বায়ু ও সৌরবিদ্যুতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। তবুও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো তেল ও গ্যাসের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
যদি হরমুজ প্রণালি কয়েক সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে যায় বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে শুধু জ্বালানিই নয়; পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদনও কমে যাবে। এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে এবং সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের সিনিয়র ফেলো আদনান মাজারেই বলেছেন, এ সংঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া। কারণ, তারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
গত সোমবার তেলের দাম এক দিনে ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে আবার কিছুটা কমেছে, যা বাজারের অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহনের ঝুঁকি বাড়ার কথা জানালে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
চীন, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ইতালি ও স্পেনের মতো শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও উচ্চশুল্কের চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হলে তাদের শিল্প ও রপ্তানি খাত আরো চাপের মুখে পড়বে। চীন বিশেষভাবে ঝুঁকিতে, কারণ তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল আমদানি ইরাননির্ভর। একই সঙ্গে দেশটি রিয়েল এস্টেট খাতে বড় ধাক্কা সামাল দিচ্ছে। ভারতও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা জোরদার হতে পারে। অন্যথায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে কঠিন চাপে ফেলতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

