রাউন্ড অব সিক্সটিন

রেফারিং বিতর্ক, ব্রাজিলের বিদায় ও আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক

রেফারিং বিতর্ক, ব্রাজিলের বিদায় ও আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের গল্প

বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই স্বপ্নভঙ্গের কান্না, অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের বিস্ময়, নতুন নায়কের জন্ম আর পুরোনো কিংবদন্তির বিদায়। কোথাও শেষ বাঁশির সঙ্গে থেমে গেছে এক যুগের গল্প, কোথাও আবার শেষ মিনিটে লেখা হয়েছে নতুন মহাকাব্য। গোল, কান্না, বিতর্ক, বীরত্ব আর বিশ্বাসÑসব মিলিয়ে প্রতিটি রাত যেন হয়ে উঠেছিল ফুটবলের একেকটি উপন্যাস। শেষ ষোলোর লড়াইয়েও নতুন করে লেখা হয়েছে ইতিহাস, ভেঙেছে বহু রেকর্ড, জন্ম নিয়েছে অসংখ্য গল্প। সে গল্পগুলোরই কিছু নির্বাচিত অধ্যায় তুলে ধরা হলো।

আর্জেন্টিনার অলৌকিক প্রত্যাবর্তন

বিজ্ঞাপন

শেষ ষোলোতে যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলো আর্জেন্টিনা। মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১১ মিনিটে তিন গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় লিওনেল স্কালোনির দল। ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডে শুরু হয় প্রত্যাবর্তন; এরপর গোল করে সমতা ফেরান লিওনেল মেসি, আর যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে লেখা হয় অবিশ্বাস্য জয়ের গল্প। এ ম্যাচেই জাতীয় দলের হয়ে ৫৯তম অ্যাসিস্ট করে দিয়েগো ম্যারাডোনার রেকর্ড ভাঙেন মেসি। ম্যাচ শেষে চোখের জল লুকাতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এটি শুধু একটি জয়ই ছিল না, আসরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের টিকে থাকার ঘোষণাও ছিল।

নেইমারের কান্নায় বিদায়

শেষ ষোলোতে শেষ হলো ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও। নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের ২-১ গোলে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। শেষ ম্যাচে বদলি নেমে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করলেও দলকে বাঁচাতে পারেননি। ২০১৪ বিশ্বকাপের ইনজুরি, ২০১৮-এ বেলজিয়াম, ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়া আর ২০২৬-এ নরওয়েÑচারটি বিশ্বকাপে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে এসেও নেইমারকে ফিরতে হলো শূন্য হাতে। ইতিহাসে তিনি থাকবেন প্রতিভার উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে, তবে বিশ্বকাপ তাকে কখনো পুরোপুরি আপন করে নিল না।

হালান্ডের উত্থানে ব্রাজিলের পতন

যে ফুটবলারকে এতদিন বলা হতো ক্লাবের গোলমেশিন, সেই আর্লিং হালান্ড এবার বিশ্বকাপেও নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছেন তিনি। সে সঙ্গে বিদায় করে দিয়েছেন ব্রাজিলকেও। এবারো পূরণ হলো ব্রাজিলের হেক্সা। তবে টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে হেরে ‘পরাজয়ের হেক্সা’ ঠিকই জিতে নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ব্রাজিলকে পরাজয়ের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার ম্যাচে জোড়া গোলে টুর্নামেন্টে হালান্ডের গোলসংখ্যা দাঁড়াল সাত, যা তাকে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও রেখেছে। হালান্ডের উত্থানের গল্পে ব্রাজিলের গল্প লেখা রইল পতনের অধ্যায়ে।

মরক্কোর ৩৪ ম্যাচের অজেয় অভিযাত্রা

বিশ্বকাপে মরক্কো আর কোনো রূপকথার দল নয়। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলা দলটি চলতি বিশ্বকাপেও দেখিয়েছে বীরত্ব। শেষ ষোলোয় কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে আটলাস লায়ন্স। ২০২২ সালে আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনালিস্ট হওয়ার পর এবারও তারা দেখিয়ে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, একাডেমিক বিনিয়োগ এবং দৃঢ় দলগত দর্শন কীভাবে একটি জাতিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারে।

রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ

সময়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি নীরবে শেষ হয়ে গেল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপও শেষ হলো শিরোপাহীন। ২০০৬ থেকে ২০২৬Ñমোট ছয়টি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বিদায় নিলেন; কিন্তু অধরা রয়ে গেল সেই সোনালি ট্রফি। বিশ্বকাপে অসংখ্য গোল, রেকর্ড আর নেতৃত্ব দিয়েও শেষ হাসিটা আর হাসা হলো না। ইতিহাস তাকে কিংবদন্তি বলবে; কিন্তু বিশ্বকাপের ট্রফি তার নামের পাশে কখনো লেখা থাকবে না।

কাঠগড়ায় ভিএআর

শেষ ষোলোতে যতটা আলো ছড়িয়েছে ফুটবল, ততটাই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি)। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে মিসরের একটি গোল বাতিল, মোহাম্মদ সালাহর পেনাল্টি আবেদন নাকচ এবং একাধিক ফাউলের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস বিশ্লেষণে বলেছেন, মারওয়ান আতিয়ার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের জার্সি টানা ও পায়ে ট্যাকল করার ঘটনায় মিসরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তবে ম্যাচের শেষদিকে সালাহ ও হামদি ফাথির ঘটনাগুলো ভিএআরের হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পড়েনি বলেও মত দেন তিনি। তাতে শেষ ষোলোর শেষ আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছিল রেফারিং এবং ভিএআর।

আয়োজকদের হতাশা, ইউরোপের দাপট

নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলেও শেষ আটে নেই তিন আয়োজক দেশের কেউ। কানাডা মরক্কোর কাছে, যুক্তরাষ্ট্র বেলজিয়ামের কাছে এবং মেক্সিকো ইংল্যান্ডের কাছে বিদায় নিয়েছে। অন্যদিকে কোয়ার্টার ফাইনালে শক্ত অবস্থান নিয়েছে ইউরোপ। আছে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আছে কেবল আর্জেন্টিনা আর আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে আছে মরক্কো।

গোল্ডেন বুটে মেসি-এমবাপ্পে-হালান্ডের মহারণ

বিশ্বকাপ যত শেষের দিকে যাচ্ছে, ততই জমে উঠছে গোল্ডেন বুটের লড়াই। শেষ ষোলোর পর লিওনেল মেসি আট গোল ও এক অ্যাসিস্ট নিয়ে সামান্য এগিয়ে। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড দুজনেরই সাত গোল, এমবাপ্পের আছে দুই অ্যাসিস্ট। মেসি এগিয়ে আছেন অ্যাসিস্ট ও ম্যাচে সামগ্রিক অবদানের হিসাবে। তাদের ঠিক পেছনে রয়েছেন আরো কয়েকজন ফরোয়ার্ড; তবে শিরোপার আসল লড়াই এখন এ তিন মহাতারকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একদিকে বিদায়বেলার মেসি, অন্যদিকে বর্তমানের রাজপুত্র এমবাপ্পে, আর ভবিষ্যতের দৈত্য হালান্ডের এ লড়াই যেন তিন প্রজন্মের এক মহারণে পরিণত হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন