আর্চারিতে অনাচার! সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার

স্পোর্টস রিপোর্টার

আর্চারিতে অনাচার! সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার

একের পর এক পদক জিতে আন্তর্জাতিক আর্চারি অঙ্গনে যখন দাপট দেখাচ্ছে বাংলাদেশ, তখনই বেরিয়ে এলো আর্চারি ফেডারেশনের অভ্যন্তরের কুৎসিত চেহারা। এ যেন আলোর নিচে অন্ধকার! আর্চারি ফেডারেশনে স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজস্ব রাজত্ব কায়েম করেছেন বর্তমান সভাপতি ড. মো. মোখলেসুর রহমান। আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সাধারণ সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কোষাধ্যক্ষকে সরিয়ে সিগনেটরি পরিবর্তন করে ফেডারেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা।

২০২৫ সালের মার্চে বর্তমান আর্চারি ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি গঠন করে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। তাই এই অ্যাডহক কমিটির কাউকে সরাতে হলে ক্রীড়া পরিষদের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কমিটি থেকে কোষাধ্যক্ষকে সরিয়ে নতুন কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়েছে মোখলেসুর রহমানের নেতৃত্বাধীন অ্যাডহক কমিটি। এসব অভিযোগ ছাড়াও বর্তমান সভাপতির আরো নানা অনিয়ম ও অভিযোগ ক্রীড়া পরিষদকে আনুষ্ঠানিক চিঠিতে জানিয়েছেন আর্চারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ। ২১ এপ্রিল ক্রীড়া পরিষদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগপত্রে সাম্প্রতিক সাফল্য উল্লেখ করে আর্চারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, তাকে না জানিয়ে বোর্ডসভা আহ্বান করেছেন বর্তমান সভাপতি। সেখানে বিনা কারণে কোষাধ্যক্ষকে পদত্যাগ করতে বলা হয় এবং অনিয়মতান্ত্রিকভাবে নতুন কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, সভাপতি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোষাধ্যক্ষের পদত্যাগপত্র এবং সাধারণ সম্পাদকের সম্মতি ছাড়াই ফেডারেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে রাতারাতি সিগনেটরি (স্বাক্ষরকারী) পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া প্রশিক্ষণ ও নির্বাচন উপকমিটির আহ্বায়ক থেকে সাধারণ সম্পাদক প্রতিস্থাপন এবং চীনে বিশ্বকাপে ২০ সদস্যের ব্যয়বহুল একটি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে আর্চারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ‘আমি বিদেশ থেকে ফেরার পর দেখলাম ট্রেজারার পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রায় ১৪ লাখ টাকার মতো ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে। আরো টাকা তোলার জন্য আমার কাছে স্বাক্ষর নিতে এলে আমি দিইনি। আমি ক্রীড়া পরিষদের কাছে বিস্তারিত অভিযোগ দিয়েছি। তারা আমাকে ফেডারেশনে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন। সঠিক ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ক্রীড়া পরিষদের ইমেজ যেন নষ্ট না হয়, সেভাবেই আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে চাই।’

বিজ্ঞাপন

নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অ্যাডহক কমিটির সদস্য তুহিন। সভাপতি ও তার স্বাক্ষরের মাধ্যমেই ১৪ লাখ টাকার মতো ফেডারেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তোলা হয়েছে। প্রাইম ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে এই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

কীভাবে সিগনেটরি পরিবর্তন হলো?

এ প্রসঙ্গে প্রাইম ব্যাংকের দিলকুশা শাখার ম্যানেজার রোজিনা পারভীন আমার দেশকে বলেন, ‘ফেডারেশন আমাদের যেভাবে রেজ্যুলেশন দেয়, সেভাবেই আমরা সিগনেটরি পরিবর্তন করে দিই।’ সরিয়ে দেওয়া কোষাধ্যক্ষ শহিদুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ‘গত মিটিংয়ে সভাপতি হঠাৎ করেই বললেন, আমার জায়গায় অন্য কেউ দায়িত্ব পালন করলে অসুবিধা আছে কি না। উনার কথায় আমি অত্যন্ত হতবাক হয়েছি। পরপর কয়েকবার আমি কারণ জানতে চেয়ে উনাকে মোবাইলে টেক্সট পাঠালাম। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। আমাকে কোনো কারণ ছাড়া তারা বাদ দিতে পারেন না। আর আমাকে তো নিয়োগ দিয়েছে ক্রীড়া পরিষদ।’

তানভীর আহমেদ জানান, অ্যাডহক কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই তিনি সভাপতির অসহযোগিতা ও অবজ্ঞার পাত্র হয়ে আছেন। গত কয়েক মাস ধরে সভাপতির স্বেচ্ছারিতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফেডারেশনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাকে না জানিয়ে নেওয়া হয়। গত ডিসেম্বরে সভাপতি একক স্বাক্ষর করে কাউন্সিলর তালিকা ক্রীড়া পরিষদে পাঠিয়েছেন। এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক ওয়ার্ল্ড আর্চারির সভায় যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কোনো প্রয়োজনীয় এজেন্ডা ছাড়াই এজিএসের সঙ্গে পরামর্শ না করে সভাপতি জরুরি সভা ডেকে কোষাধ্যক্ষ ও সিগনেটরি পরিবর্তন করেন। গত ৫ ও ১২ এপ্রিল দুটি সভা ডাকা হয়। এসব সভার খরচ হিসেবে ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। সভাপতির এমন আচরণ সিন্ডিকেট ও গ্রুপিংকে উৎসাহিত করছে। আর্চারি ফেডারেশনের সদস্য রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল সভাপতির বিরুদ্ধে সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে চান না। তিনি শুধু আমার দেশকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কাল কথা বলব। যা হয়েছে, মিটিংয়ের মাধ্যমেই হয়েছে। আমি সদস্য হলেও আমার কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই।’

আর্চারি ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলেছেন আর্চারি সভাপতি মোখলেসুর রহমান। বড় ধরনের অভিযোগ উঠলেও নিজের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন তিনি। কোষাধ্যক্ষ ও ব্যাংকের সিগনেটরি পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে হয়েছে। এটা ব্যক্তিগত নয়।’ অ্যাডহক কমিটির কাউকে সরানোর ব্যাপারে সম্পূর্ণ এখতিয়ার ক্রীড়া পরিষদের। এ প্রসঙ্গে আর্চারি সভাপতির বক্তব্য, ‘সেটি তাদের বিষয়। যেভাবে প্রসেস করে পাঠানো উচিত, সেভাবে আমরা পাঠিয়েছি। উনার কাছ থেকে আমরা বাকিটা জানতে পারব।’

এদিকে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান আমার দেশকে বলেন, ‘আর্চারি ফেডারেশন কোষাধ্যক্ষকে সরানোর কোনো এখতিয়ার রাখে না। এজন্য ক্রীড়া পরিষদের অনুমতি লাগবে। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ। কাউকে বাদ দিতে হলে ফেডারেশন সর্বোচ্চ সুপারিশ করতে পারে। সিদ্ধান্ত নেব আমরা।’ আর্চারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দেওয়া অভিযোগ প্রসঙ্গে আমিনুল এহসান বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: